
শেষ আপডেট: 21 March 2022 14:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাজ্যের সব সরকারি স্কুলের এবার পোশাকের (School Uniform) রং হবে একই! অর্থাৎ নীল-সাদা, আর তাতে থাকবে বিশ্ব বাংলা লোগো। ছাত্রদের জন্য সাদা জামা নীল প্যান্ট ও ছাত্রীদের জন্য নীল-সাদা সালোয়ার কামিজ বা শাড়ি।
সূত্রের খবর, এমনই নির্দেশিকা জারি হয়েছে রাজ্য সরকারের তরফে। যা সামনে আসতেই তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে নানা মহলে।
আরও পড়ুন: CBSE 12 Term 1: স্কুলগুলিতে প্রথম টার্মের রেজাল্ট পাঠিয়ে দিয়েছে বোর্ড
কেউ বলছেন এই সিদ্ধান্ত সরকারের স্বৈরাচারিতা, কারও মতে, এই পোশাক দিয়ে বোঝা যাবে যে কারা সরকারি স্কুলের সঙ্গে যুক্ত আছে, আবার কারও মতে, সরকারি-বেসরকারি স্কুলের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা হচ্ছে, আবার কেউ কেউ মনে করছেন এমন না করলেই চলত!
সব সরকারি স্কুলের একই ইউনিফর্ম প্রথা চালু হলে স্কুলের বাচ্চাদের মধ্যে 'বন্ডিং' নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিলজলা বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা অভিনন্দা ঘোষ দস্তিদার। তাঁর কথায়, 'সমস্ত স্কুলের আলাদা আলাদা পোশাক থাকাই ভাল। এরফলে স্কুলের বাচ্চাদের নিজেদের মধ্যে একটা বন্ডিং তৈরি হয়। তারা মনে করে যে তারা একই পরিবারের। বাচ্চাদের মধ্যে ভালবাসা তৈরি হয়। প্রাক্তন-প্রাক্তনীরা সহজেই নিজের স্কুলের বাচ্চাদেরকে বিভিন্ন জায়গায় আলাদা করে চিনে নিতে পারেন। তাতে তাঁদের মধ্যে একটা ভালো লাগার জায়গা তৈরি হয়।
কিন্তু, সব স্কুলের একই ইউনিফর্ম হয়ে গেলে সেই জায়গাগুলো নষ্ট হতে পারে।' তিনি আরও মনে করেন, 'কোনও সরকারি অনুষ্ঠানে বা এই জাতীয় কোনও অনুষ্ঠানে গেলে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ক্ষেত্রে নিজের স্কুলের বাচ্চাদের আলাদা করে চিনে নিতে সুবিধা হয়।'
অভিনন্দাদেবীর সুরেই সুর মেলালেন মর্ডানল্যান্ড বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা অনন্যা রায়চৌধুরী। তিনি বলেন, 'স্কুলের বাইরে বাচ্চাদের আলাদা করে চেনার সুবিধা থাকে। ধরুন যদি দেখি বাইরে আমার স্কুলের কোনও বাচ্চা দুষ্টমি বা বাজে কাজ করছে, বা স্কুল ছুটির পরেও বাড়ি যায়নি তাহলে তাকে চিনে স্কুলে তাকে শাসন করার জায়গা থাকে, কিংবা অভিভাবককে জানাতে পারব। কিন্তু একই পোশাক হয়ে গেলে সেটা সম্ভব নয়।'
যোধপুর পার্ক বয়েজ স্কুলের সহ-প্রধান শিক্ষক উত্তম মণ্ডল যেমন তুলে ধরলেন এক ইউনিফর্মের একাধিক অসুবিধার কথা তেমনই বললেন কিছু সুবিধার কথাও। তিনিও পড়ুয়াদের মধ্যে 'বন্ডিং' নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন। পাশাপাশি উত্তমবাবু বলেন, 'লোগো বা পোশাকের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে স্কুলের ইতিহাস-ঐতিহ্য। সবার এক জাতীয় পোশাক হলে সেই চিন্তাধারা ক্ষুণ্ন হতে পারে বলে আমার মনে হয়। আবার সিংহভাগ পড়ুয়াদের মধ্যে প্ৰশ্ন জেগে যাবে আমাদের ইউনিফর্ম খারাপ কী ছিল? কেন পাল্টাতে হল।'
তবে তিনি এই একই ইউনিফর্মের পজিটিভ দিক হিসেবে তুলে ধরেন, 'অনেক ক্ষেত্রেই পোশাক দিয়ে স্কুল ও ছাত্রের পরিচয় নির্ধারণ করা হয়ে থাকে, যা বিশেষ ক্ষেত্রে পড়ুয়াদের আঘাত করে, একই পোশাক হলে সেই পৃথকীকরণ বিষয়টা থাকবে না যা অবশ্যই একটি ভাল দিক। এতে পড়ুয়াদের মধ্যে একটা সমতা থাকবে।' আর বিশ্ববাংলা লোগো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'এই লোগো ভবিষ্যতে রাজ্যের বাইরে বাংলার পড়ুয়া হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ থাকবে। বাংলার পড়ুয়া বলে আলাদা করে চেনার উপায় থাকবে।'
একই পোশাক হলে স্কুলের আবেগ-ঐতিহ্য ক্ষুণ্ন হওয়ার প্ৰশ্নটি একইভাবে উত্থাপন করেন কৃষ্ণচন্দ্রপুরের প্রধান শিক্ষক চন্দন মাইতি। তিনি বলেন, 'বিদ্যালয়ের পোশাকের সঙ্গে আবেগ এবং ঐতিহ্য জড়িয়ে থাকে। স্কুলগুলির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যকে তুলে ধরে। ওই পোশাকের মাধ্যমে স্কুলকে চিহ্নিত করা যায়। বহিরাগত কোন ছাত্র-ছাত্রী অন্য বিদ্যালয় ঢুকে পড়লে চিহ্নিতকরণের কোন ব্যবস্থা রাখা সম্ভব নয়।'
তবে অন্যদিকে জগবন্ধু স্কুলের প্রধান শিক্ষক অভিজিৎ ভট্টাচার্য মনে করেন, একই রঙের ইউনিফর্ম হলে স্কুলের ঐতিহ্য ধাক্কা খাবে এমন দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখাই ভাল। তিনি বলেন, 'বিশ্ববাংলার লোগোর পাশাপাশি যদি স্কুলের লোগো থাকে তাহলে নিজের স্কুলের বাচ্চাকে আলাদা করে চেনার ক্ষেত্রে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।'
স্কুলের নিজস্ব ব্যাজ দিয়েই বাচ্চাদের পৃথকীকরণ করা সম্ভব বলে মনে করেন যাদবপুর বিদ্যাপীঠের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক তথা শিক্ষাবিদ ড: পরিমল ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, 'স্কুলের জন্য ব্যাজ বা নিজস্ব লোগো থাকাটা খুব প্রয়োজন। এই লোগো বা ব্যাজ দিয়েই বাচ্চাদের আলাদা করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, তিনিও এও মনে করেন যে, এর মধ্যে দিয়ে সরকারি ও বেসরকারি স্কুলের মধ্যে একটা পৃথকীকরণ সৃষ্টি হবে, তবে সেটা খুব একটা অসুবিধা সৃষ্টি করবে না।
সরকারি-বেসরকারি স্কুলের মধ্যে পৃথকীকরণের বিষয়টি তুলে ধরেছেন শিক্ষাবিদ মীরাতুন নায়ারও। তিনি বলেন, 'সরকার মনে হয় চাইছে যে সরকারি স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা বেসরকারি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের থেকে আলাদাভাবে চিহ্নিত হোক। পাশাপাশি স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষকাদেরও নিজেদের স্কুলের পড়ুয়াদের আলাদা করে চেনার সমস্যার মধ্যে পড়তে হতে পারে।'
অন্যদিকে, শিক্ষাবিদ তথা রবীন্দ্রভারতীর প্রাক্তন উপাচার্য পবিত্র সরকার এক কথায় জানান যে সরকারের এই সিদ্ধান্তের মধ্যে স্বৈরাচারী মনোভাব কাজ করছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত পৌঁছে গেছে আদালতের দরজাতেও। স্কুলের ইউনিফর্মে 'বিশ্ববাংলা'র লোগো লাগানো নিয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা করেন সৌমেন হালদার। তাঁর তরফে আইনজীবী রাজনীল মুখোপাধ্যায় জানান, 'নীল-সাদা পোশাক নিয়ে আমাদের কোনও আপত্তি নেই। তবে বিশ্ববাংলার লোগো নিয়ে আছে। চলতি সপ্তাহেই এই মামলার শুনানি হতে পারে।