Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তান

সান্দাকফু থেকে আড়াই টন মদের বোতল, এই অভিযান যতটা প্রশংসনীয়, ততটাই লজ্জার

তিয়াষ মুখোপাধ্যায় বাঁকটার মুখে দাঁড়াতেই বছর ১৮ আগের একটা দৃশ্য চকিতে মনে পড়ে গিয়েছিল দেবরাজের। বড় একটা বোল্ডার খাড়া দাঁড়িয়ে। কয়েক ফুট উঁচু। অতি-উৎসাহে চড়েছিলেন তার চ্যাপ্টা মাথায়। আর সেখানে চড়তেই গাছগাছালি পার করে চোখের সামনে খুলে গি

সান্দাকফু থেকে আড়াই টন মদের বোতল, এই অভিযান যতটা প্রশংসনীয়, ততটাই লজ্জার

শেষ আপডেট: 12 November 2018 12:58

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

বাঁকটার মুখে দাঁড়াতেই বছর ১৮ আগের একটা দৃশ্য চকিতে মনে পড়ে গিয়েছিল দেবরাজের। বড় একটা বোল্ডার খাড়া দাঁড়িয়ে। কয়েক ফুট উঁচু। অতি-উৎসাহে চড়েছিলেন তার চ্যাপ্টা মাথায়। আর সেখানে চড়তেই গাছগাছালি পার করে চোখের সামনে খুলে গিয়েছিল আদিগন্ত ও সদলবল কাঞ্চনজঙ্ঘার বাহার। কিন্তু এবার থমকে যেতে হল। বোল্ডারে চড়া দূরের কথা, তার নীচে পা রাখারই জায়গা নেই! পড়ে রয়েছে একগাদা কাচের বোতল, প্লাস্টিক ও নানা আবর্জনা। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ওখানে বসে খাওয়াদাওয়া করেছেন কেউ। এবং খাওয়াদাওয়ার পরে সমস্ত উচ্ছিষ্ট ও বর্জ্য ওখানেই ফেলে রেখেছেন। দেবরাজ দত্ত। বাংলার পর্বতারোহণ আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র। এভারেস্ট-সহ একাধিক সাত হাজারি শৃঙ্গে সফল অভিযানকারী। এই বার গিয়েছিলেন, সান্দাকফু। ১৮ বছর আগে যে ট্রেকিং-এর পথ ধরে পাহাড় প্রেম শুরু, সেই পথেই। মাঝেও গিয়েছেন অনেক বার। কিন্তু এই বারটা খুব স্পেশ্যাল। খুব প্রশংসনীয়। সেই সঙ্গেই খুব কষ্টেরও। [caption id="attachment_51281" align="aligncenter" width="1280"] সান্দাকফুর মাথায় জমে মদের বোতল।[/caption] কষ্ট কেন? দেবরাজ বললেন, "আমাদের যাদের পাহাড়া পায়ে-খড়ি হয়েছে এই সান্দাকফুর পথে, তাদের চোখে সান্দাকফুর এই চেহারা বেশ কষ্টের। প্রকৃতির রূপ যেখানে ভরে থাকার কথা, সেখানে যদি জঞ্জাল ভরে থাকে, তবে তা খুব একটা শুভ নয়।" গোটা সান্দাকফু রুট ফালুট পর্যন্ত সাফাই করার উদ্দেশ্য নিয়ে আইএমএফ (ইন্ডিয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ফাউন্ডেশন)-এর তরফে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন একটি বিশেষ দল। তবে এভাবে না গেলে জানতেও পারতেন না, যে পাহাড়-পথে পা রেখে বাংলার বেশির ভাগ পর্বতারোহী পাহাড় ভালবেসেছেন, প্রকৃতি চিনেছেন, তিনি নিজেও যার ব্যতিক্রম নন-- সেই পথই এমন আকণ্ঠ ডুবে রয়েছে প্লাস্টিক ও অন্যান্য জঞ্জালে! সেই পথের প্রতি বাঁকে কাচের বোতলের ক্ষত দগদগ করেছে! যার পরিমাণটা অভিযানের শেষে দাঁড়িয়েছে আড়াই টনে! [caption id="attachment_51277" align="aligncenter" width="662"] দেবরাজ দত্ত[/caption] সান্দাকফু সংস্কার করার এমন অভিযান সফল হওয়ার পরে প্রশংসা কুড়িয়েছে সব মহলেই। দেবরাজ জানিয়েছেন, পাঁচ তারিখে কলকাতা থেকে যাত্রা শুরু করেন তাঁরা। নিউ জলপাইগুড়ি হয়ে মানেভঞ্জন পৌঁছনোর পরে দলের একটি অংশ সান্দাকফুর দিকে এগোতে শুরু করে, সমস্ত আবর্জনা সাফাই করতে করতে। দলের অন্য অংশটি গাড়ি করে সান্দাকফু পেরিয়ে ফালুট চলে যায় এবং ফালুট থেকে ফিরতে শুরু করে সান্দাকফুর দিকে। মাঝামাঝি গৈরিবাস বলে একটি জায়গায় দু'টি দলের সাক্ষাৎ হয় এবং সেখান থেকে পিক আপ ভ্যানে করে সমস্ত আবর্জনা নামানো হয় মানেভঞ্জনে। তবে সেখানেই শেষ নয়। শিলিগুড়ি শহর পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হয় যাবতীয় আবর্জনা। [caption id="attachment_51257" align="aligncenter" width="848"] সাফাই অভিযানের মানচিত্র।[/caption] [caption id="attachment_51259" align="aligncenter" width="622"] চিরঞ্জয় চক্রবর্তী[/caption] কথা হচ্ছিল দলের কনিষ্ঠতম সদস্য চিরঞ্জয়ের সঙ্গে। ১৮ বছরের চিরঞ্জয় চক্রবর্তী সবে পা রেখেছে কলেজের চৌকাঠে। এটাই তার প্রথম পাহাড় দেখা, প্রথম পাহাড়ে হাঁটা। অনেকটা উদ্দীপনা নিয়ে পাহাড় দেখতে গিয়েছিল সে। সান্দাকফুর সৌন্দর্যের কথা অনেক বার শুনেছে এর আগে। "ভাল তো খুবই লেগেছে আমার। কিন্তু বিস্মিত হয়েছি অনেক বেশি। এত অসচেতন মানুষ! এত ভীষণ রকমের স্বার্থপর! আমরা যারা ছোট, যারা পাহাড় যাওয়া শুরু করছি, তারা কি আর একটু পরিচ্ছন্নতা আশা করতে পারি না!"-- প্রশ্ন চিরঞ্জয়ের। চিরঞ্জয়ের পরিবার সূত্রের খবর, সে ছোটবেলা থেকেই অন্য রকম। প্রকৃতির ব্যাপারে একটু বেশিই সংবেদী। তেমন আলাদা করে কখনও তাকে কিছু না শেখানো হলেও, প্রায়ই দেখা  যেত রাস্তা থেকে চকলেটের প্যাকেট বা প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখছে। প্রথম প্রথম শিশুমনের খেয়াল বলে মনে হলেও, একটু বড় হলে বোঝা যায়, এটা সে বুঝেশুনেই করে। সেই শুরু। পরে শিলিগুড়ির প্রকৃতিপ্রেমী সংগঠন ন্যাফ (হিমালয়ান নেচার অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার ফাউন্ডেশন)-এ যোগ দেওয়ার পরে আরও বেশি করে বোঝে প্রকৃতির গুরুত্ব, বোঝে প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করা কতটা জরুরি! "আমার প্রথম পাহাড় শুরু অন্য পাঁচ জন ট্রেকারের মতো হল না ঠিকই, কিন্তু আমি মনে করি, আমি যে ভাবে পাহাড় শুরু করার সুযোগ পেলাম, তা আর পাঁচ জন মোটেই পায় না। আমি এত দিন নিজে নিজে অনেক চেষ্টা করেছি নানা জায়গায়। বেশির ভাগ জায়গাতেই মানুষকে বোঝাতে গিয়ে শুনতে হয়েছে, 'আরও তো সবাই নোংরা করছে'। এবার আমি তাদের বলতে চাই, 'আরও সবাই তো পরিষ্কার করছে'। আর এমনটা বলার জন্য উদাহরণ জরুরি। এই কাজটা তেমনই একটা উদাহরণ"-- বললেন তরুণ চিরঞ্জয়। বস্তুত, পরিবর্তন শুধু চাইলেই হয় না, তা করেও দেখাতে হয়। ইংরেজি প্রবাদই রয়েছে, 'ইফ ইউ ওয়ান্ট দ্য চেঞ্জ, বি দ্য চেঞ্জ'। আর এই চেঞ্জ নিজে হতে পারলে যে আশপাশটাও চেঞ্জ হয়, তার প্রমাণও হাতেনাতেই পেয়েছেন দেবরাজরা। পথের মধ্যে বহু ট্রেকার হাত লাগিয়েছেন জঞ্জাল সাফাইয়ের কাজে। বর্জ্য ফেলতে গিয়ে থমকেছেন। বিভিন্ন জায়গায় এগিয়ে এসেছেন স্থানীয় মানুষেরাও। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাঁরা তো সচেতন হবেনই, অন্যদেরও সচেতন করবেন। মানেভঞ্জনে নেমে আসার পরেও স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে হাত লাগান স্থানীয় মানুষজন। গোটা এলাকা সাফ করেন দেবরাজদের সঙ্গে হাত লাগিয়ে। [caption id="attachment_51282" align="aligncenter" width="1280"] সাফাই কাজে হাত লাগিয়েছেন ইতালিয়ান ট্রেকার দম্পতিও।[/caption] চিরঞ্জয় বলছেন, "আমি ভবিষ্যতে এরকম কাজ আরও করতে চাই। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও ঠিক, এরকম বিচ্ছিন্ন কিছু কাজ যথেষ্ট নয়। আদতে প্রয়োজন মানুষের সচেতনতা, মানসিকতার বদল। নইলে পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব হবে না। দু'টো-পাঁচটা অভিযান দিয়ে গোটা প্রকৃতিকে পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব নয় কখনওই।" বস্তুত, কয়েক বছর আগে সান্দাকফু পর্যন্ত পিচের রাস্তা তৈরি হয়ে যাওয়ার পরে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে ট্রেকার ও ট্যুরিস্টের সংস্থা। মাত্র এক রাতের জার্নিতেই পৌঁছে যাওয়া যায় পাহাড়ের দোরগোড়ায়। অনিন্দ্যসুন্দর প্রকৃতির ক্যালেন্ডার খুলে যায় সামনে। গাড়ি করেই চলে যাওয়া যায় পুরোটা। হাতের কাছে পাওয়াও যায় সব কিছু। সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল রিজ়ার্ভ ফরেস্টের ভিতরের এই পাহাড়কোলে এখন আর নির্জনতা নেই বললেই চলে। প্রচুর পরিমাণে মানুষের আনাগোনা যে প্রকৃতিকে নষ্ট করবেই, এতে আর আশ্চর্য কী! দলের জ্যেষ্ঠতম সদস্য কৌশিক মজুমদার আবার বলছেন, প্রায় বছর ২৫ ধরে পাহাড়ে ট্রেকিং ও ভ্রমণ করার সুবাদে তিনি পাহাড়ের কাছে ঋণী। তাঁর সেই ঋণেরই একটি ছোট অংশ হয়তো শোধ হল, এই উদ্যোগে হাত লাগাতে পেরে। তাঁর প্রশ্ন, "পাহাড় তো আমাদের সব সময় ভরিয়ে দেয়। কী আনন্দে, কী সৌন্দর্যে। তা হলে আমরা তার ন্যূনতম পরিচ্ছন্নতাটুকু রক্ষা করতে পারব না? আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কথাও ভাবব না?" [caption id="attachment_51260" align="aligncenter" width="1280"] কৌশিক মজুমদার[/caption] এই অভিযানে গিয়ে সান্দাকফুর অবস্থা দেখে রীতিমতো মুষড়ে পড়েছেন ৫০ বছর বয়সি ট্রেকার কৌশিক। তিনি জানালেন, এত মদের বোতল মিলবে, ভাবতেও পারেননি তিনি। তাঁর কথায়, "পাহাড়ে গিয়ে মদ প্রায় সকলেই খান আজকাল। কিন্তু মদের বোতল ভর্তি অবস্থায় বয়ে নিয়ে যেতে পারলে, খালি বোতলগুলো ফিরিয়ো আনতে পারবেন না কেন!" চিরঞ্জয়ের সঙ্গে বয়সের ও অভিজ্ঞতার অনেকটা তফাত থাকলেও, তাঁদের মতের বিরোধ নেই। সচেতনতা না বাড়লে কিছুই বদলানোর নয়, মানছেন দু'জনেই। দেখে নিন অভিযানের কয়েক ঝলক। https://www.youtube.com/watch?v=rb-YfNdxoik&feature=youtu.be দলনেতা দেবরাজ ফেরার পরেই প্রশংসার বন্যার ভেসে গিয়েছেন। অভিনন্দন এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। কিন্তু দেবরাজ বলছেন, "এমন অভিযানের যে প্রয়োজন পড়ল, এটাই পর্বতারোহণের জন্যযথেষ্ট লজ্জার। যাঁরা পাহাড় ভালবাসেন, পাহাড়প্রেমী বলে পরিচয় দেন নিজেদের, তাঁরাই তো যান ট্রেকিংয়ে। তাঁরাই যদি এমন করে নোংরা করে আসেন পাহাড়কে, তা হলে তা খুবই দুঃখের। আমরা হয়তো এরকম অভিযান আরও করব। কিন্তু মানুষ যদি এমন লাগামছাড়া ভাবে জঞ্জাল ফেলে আসে পাহাড়ে, তবে ভারসাম্য রক্ষা সম্ভব নয়।" [caption id="attachment_51276" align="aligncenter" width="300"] অনিমেষ বসু[/caption] হিমালয়ান নেচার অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার ফাউন্ডেশন বা ন্যাফের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর অনিমেষ বসু জানাচ্ছেন, প্রকৃতির কন্দরে, পাহাড়ের কোলে মানুষের গতিবিধি কাম্য নয়। মানুষকে মনে রাখতে হবে, প্রকৃতির কোলে মানে সে অন্যের জায়গায় প্রবেশ করছে। "আমরা তো অন্যের জায়গায় গিয়ে নোংরা করি না। করে ফেললেও সেটা সাফ করে আসি। পাহাড়ও তেমনই। পাহাড় আমাদের বাড়ি নয়। পাহাড় আমাদের তার কাছে যাওয়ার অনুমতি দেয় মানে এটা নয়, যে সেখানে গিয়ে আমরা নোংরা করে আসতে পারি!"-- বলেন তিনি।

```