
শেষ আপডেট: 12 September 2019 08:48
বিস্ময় চেপে রেখেই সে দিন অনিন্দ্য বলেছিলেন, "আপনার ইচ্ছে থাকলে নিশ্চয় হবে।"
আর আজ, ছ'বছর পরে মুক্তিদেবী বলছেন, "আজকে আমি যা, তার সবটুকু কৃতিত্ব অনিন্দ্যর। ও আমায় তৈরি করেছে। আমার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু ও উৎসাহ না দিলে পারতাম না। আমার মনের জোরকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে অনিন্দ্য।"
ছাত্রী-শিক্ষক যেন পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠেছেন। অনিন্দ্যবাবুর তীব্র চেষ্টাকে যেমন মুক্তিদেবী কৃতিত্ব দিচ্ছেন, তেমনই অনিন্দ্যবাবু বলছেন, "উনি কোনও কিছুতে না বলেননি কখনও। যখন যেটা শেখাতে চেয়েছি, যা করতে বলেছি, তা যত কঠিনই হোক, চেষ্টা না করে হার মানেননি মুক্তিদেবী।"
আর এখানেই বোধ হয় জিতে গেছে মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা খেলোয়াড় সত্ত্বা। হার-না-মানার লড়াকু মনোভাব। বাধা তুচ্ছ করে এগিয়ে যাওয়ার জেদ। তাই তো ছ'-সাত বছরের টানা অনুশীলনে সামুরাই ঠাকুমা মুক্তিদেবী আজ ব্ল্যাকবেল্ট অর্জন করেছেন। আন্তর্জাতিক স্তরের প্রতিযোগিতায় নেমে সোনাও জিতে এনেছেন গত বছর!
হবে না-ই বা কেন। মুক্তিদেবী যে এই বয়সেও জোর গলায় বলতে পারেন, শারীরিক বা সামাজিক, কোনও রকম প্রতিবন্ধকতা নেই মুক্তিদেবীর। "আমার ছেলে আমায় সব সময়ে অনুপ্রেরণা জোগায়। আমার ট্রেনার অনিন্দ্য ভট্টাচার্যের কথা আর কী বলব। আমার শারীরিক কোনও সমস্যা নেই। সুগার, প্রেশার-- কিছু নেই। হাড়েরও কোনও সমস্যা হয় না। সামান্য কোনও অসুবিধা হলেই অনিন্দ্য ব্যায়াম দেখিয়ে দেয়। আমি ক্যারাটে করে একেবারে সুস্থ আছি, ভাল আছি।"-- তৃপ্তি চাপা থাকে না ৬৯ বছরের 'তরুণী'র কণ্ঠে।
অনিন্দ্য জানালেন, যখন মুক্তিদেবী তাঁর কাছে ভর্তি হয়েছিলেন, শরীরের ওজন ছিল ৮৭ কেজি। এখন সেটা কমে হয়েছে ৬০ কেজি। চিকিৎসকেরা বলেছেন, কোথাও কোনও অসুবিধা নেই ওঁর শরীরে। বার্ধক্যও থাবা বসাতে পারেনি।
এই বয়সে পৌঁছেও নিজেকে নতুন করে গড়েপিটে নিয়েছেন মুক্তিদেবী। হয়ে উঠেছেন, গোটা এলাকার সামুরাই ঠাকুমা। কিন্তু আজকের যুগের মেয়েদের নিয়ে কী ভাবেন তিনি? মুক্তিদেবী বললেন, "এখন তো মেয়েরা অনেক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছ, আমরা পাইনি। আমাদের বাড়ি থেকে বেরোনোই কঠিন ছিল। এখনকার মেয়েরা আগে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াও। ওরা যথেষ্ট স্বাধীনতা পেয়ে বড় হচ্ছে, সেটাকে কিন্তু ঠিকঠাক কাজে লাগাতে হবে। সমাজে কিছু দিতে হবে। মাথা উঁচু করে চলতে হবে ওদের।"
দেখুন ভিডিও।
https://www.youtube.com/watch?v=1MpWgHo4XnU&feature=youtu.be
আর এই সম্মান নিয়ে চলার জন্য ক্যারাটের প্রশিক্ষণ বেশ জরুরি বলেই মনে করেন তিনি। বললেন, "আজ থেকে কয়েক দশক আগে চার দিকে এত হিংসা ছিল না। মেয়েদের নিরাপত্তাও বোধ হয় আর একটু বেশি ছিল। তাই বলব, আজকাল আত্মবিশ্বাস বাড়ানো খুব জরুরি। সেটার জন্য ক্যারাটে শেখা যেতে পারে। দু'দিন শিখেই যে খারাপ লোকেদের মেরে উড়িয়ে দেওয়া যাবে এটা বলব না। কিন্তু কিছু সময় ঠেকিয়ে অন্তত রাখা যাবে, যাতে লোকজন জড়ো হওয়ার সময়টা পাওয়া যায়। আর এই শিক্ষা এক দিনে হবে না, নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে আয়ত্ত করতে হবে।"
আর সামুরাই ঠাকুমার দ্রোণাচার্য অনিন্দ্য বলছেন, "আমি শিক্ষক হিসেবে ১০০-য় ১০০ দেব ওঁকে। কারণ উনি কতটা কী শিখছেন-- তার থেকেও জরুরি হল, উনি অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পেরেছেন আর পাঁচটা মানুষের। উনি অনেককে বোঝাতে পেরেছেন, শুধু আত্মরক্ষার জন্য নয়, সুস্থতার জন্যও ক্যারাটে বেশ জরুরি। এই স্পোর্টসে অনেক মহিলা এসেছেন ওঁকে দেখে। আর পাঁচ জনকে উদ্বুদ্ধ করতে পারার এই গুণটাকেই আমি কুর্নিশ করি।"