দ্য ওয়াল ব্যুরো: একচিলতে কুঁড়েঘরে কোনও রকম দিন গুজরান করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পেয়েছিলেন লড়াকু ববিতা। এ মেয়ে যে কিছুতেই হার মানবে না, কোনও কিছু করব বলে ঠিক করলে করেই ছাড়বে, তা যেন সকলেই জানত। তাই বলে একা হাতে আস্ত এতটা কুয়ো খুঁড়ে ফেলা! হ্যাঁ, তেমনটাই পণ করেছেন ২৪ বছরের ববিতা। এই কুয়োটাই তাঁর মাকে দেওয়া মাডার্স ডে-র উপহার!
পশ্চিম বর্ধমানের রানিগঞ্জের বক্তারনগর রেলগেটের বাসিন্দা ববিতা সরেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি পেয়েছেন। তিনি কয়েক মাস আগে হঠাৎই খেয়াল করেন, তাঁর মায়ের পানীয় জল আনতে যাওয়া বড় কষ্টকর। পাড়ায় তিনটে পানীয় জলের কল আছে, কিন্তু তাঁদের বাড়ি থেকে তা প্রায় পাড়ার অন্য প্রান্তে। সেখান থেকে বয়স্ক মায়ের পক্ষে জল বয়ে আনা খুব কষ্টকর। তাছাড়াও সেসব কলে অন্যদের অধিকার বেশি এক অলিখিত কারণে। মাকে অনেকক্ষণ লাইন দিতে হয় একটু জলের জন্য। কী করা যায় মায়ের কষ্ট লাঘবের জন্য, তা ভেবে পান না ববিতা।
ববিতার বাবা সামান্য কাজ করেন একটি প্রাইভেট সংস্থায়। সেখান থেকে স্বল্প আয় হয় পরিবারের, মেপে চালাতে হয় সংসার। বাড়িতে ব্যক্তিগত নলকূপ বসানো অসম্ভব। পঞ্চায়েতে জানিয়েও কোনও কাজ হয়নি। তাই শেষমেশ ববিতা ঠিক করেন, নিজের বাড়ির উঠোনেই হবে কুয়ো।
২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস। মাকে উপহার দেওয়ার জন্য এক শীতের দিনে কুয়ো খোঁড়া শুরু করেন ববিতা। কিন্তু সেই সময়ে পড়াশোনার চাপ থাকায়, শুরু করার পরেও কয়েক দিন বন্ধ থাকে খনন। যখন বাড়িতে আসতেন ছুটির দিনে তখনই অবশ্য তিনি এই কাজ করতেন। এর পরে চলে আসে লকডাউন। কলেজ থেকে বাড়ি চলে আসতে হয় ববিতাকে। দিদির সাহায্যে আবার কুয়ো খোঁড়া শুরু করেন তিনি।
শক্ত কাঁকুরে মাটি সরিয়ে, পাথর ভেঙে, শাবল-গাঁইতি দিয়ে মাটি কাটতে গিয়ে আর দিচ্ছে না শরীর। গায়ে-হাতের ব্যথায় অস্থির ববিতা। কিন্তু কয়েক দিন বিশ্রাম নিয়েই ফের চলে মাটি কাটার কাজ। থামতে জানেন না ববিতা। ইতিমধ্যেই ১৯ ফুট গর্ত খুঁড়ে ফেলেছেন তরুণী। পরিশ্রম বৃথা যায়নি, জলের দেখা মিলেছে। তবে জলটা এখন ঘোলাটে। ২৫ ফুটের কুয়ো কাটার পণ নিয়ে কাজ চলছে ববিতার। আশা, সেই গভীরতায় জল পরিষ্কার মিলবে।
ববিতার এই কীর্তির কথা অবশ্য এতদিনে তেমন কেউ জানত না। কয়েক দিন আগেই হোয়াটসঅ্যাপের প্রোফাইল পিকচারে তিনি নিজের কুয়ো কাটার ছবি দিলে, তা দেখে বন্ধুরা কৌতূহলী হন। এর পরেই কোনও এক বন্ধু সেই ছবি ফেসবুকে পোস্ট করলে তা ছড়িয়ে পড়ে অনেকের মধ্যে।
সাঁওতাল পরিবারের মেধাবী মেয়ে ববিতার এমন কার্যকলাপে এলাকায় সাড়া পড়ে গেছে এখন। ববিতার মাও খুব খুশি মেয়ের এমন কীর্তিতে। তিনি জানান, শিক্ষিত মেয়ে সম্পূর্ণ নিজে পরিশ্রম করে কূপ তৈরি করে মায়ের প্রতি যে ভালবাসা দেখিয়েছে, তা সকলের কাছে উদাহরণ। অভাবের সংসারে এমন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সমস্যার সমাধান করা গেলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পথ দেখাবে।