
শেষ আপডেট: 17 November 2022 08:21
দ্য ওয়াল ব্যুরো, পুরুলিয়া: জঙ্গলমহলের প্রত্যন্ত গ্রাম। পাহাড়-জঙ্গলে সাজানো। কিন্তু শ্রীহীন। সেখানে সরকার থেকে দেওয়া আবাস যোজনার সারি সারি ঘর। কিন্তু সে ঘরগুলির সামনে গেলেই চমকে উঠতে হয়। কোনও বাড়ির দরজা নেই, কোনও বাড়ির আবার জানলা নেই। কোনও ঘরের ছাদের গোটা অ্যাসবেসটাসটাই উধাও। খোঁজ নিতেই উঠে এল অদ্ভুত এক তথ্য। নেশার (Purulia Village Suffer Drug Addiction) সামগ্রী জোগাড় করতে সে সব নাকি খুলে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
ছবিটা পুরুলিয়ার ১ নম্বর ব্লকের রমইগাড়া শবরটোলায় (Sabar Tribal)। অভিযোগ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সচেতনতা- সবকিছুতেই সে গ্রাম রয়ে গেছে সভ্যতার আলো থেকে শতযোজন দূরে।
পুরুলিয়ার শহর থেকে শবরটোলা রমইগাড়ার দূরত্ব ২৫ থেকে ২৬ কিলোমিটার। গ্রামে বাসিন্দার সংখ্যা প্রায় আড়াইশো। চূড়ান্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকা মানুষগুলোর ঘর দুয়ার জুড়ে রয়েছে সেই অপরিচ্ছন্ন জীবনের ছবি। দিন-রাতের খেয়াল নেই। ২৪ ঘণ্টাই নেশা করে চলে পারিবারিক কলহ। অপুষ্টিতে ভোগে শৈশব। বড়রাও তারই শিকার। সামান্য কিছু যা আয় হয়, তার বড় অংশই ব্যয় হয় নেশার পেছনে। নিজেদের কীভাবে ভালো রাখতে হয়, কীভাবে ভালো থাকতে হয় সে ব্যাপারে এক অদ্ভুত ঔদাসীন্য গ্রাস করে রেখেছে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে।
গ্রামে ঢোকার মুখে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও সেখানে পড়ুয়ার দেখা বিশেষ মেলে না। শিক্ষক আসেন নিয়মিত। কিন্তু ৩১ জন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন উপস্থিত থাকে। যারা আসে তারাও মিড ডে মিলের খাবার খেয়েই চলে যায় গরু নিয়ে মাঠে। যাদের এমন কোনও কাজ নেই, তারা খেলে বেড়ায়। বছরের পর বছর এভাবেই চলছে। অসহায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রভাস মণ্ডল। বুঝে উঠতে পারেন না কী করবেন। এই শিশুদের শাপমুক্তি ঘটানোর স্বপ্ন দেখতে দেখতেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে।
তৃণমূল কর্মীর হাত ওড়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২৫ টি তাজা বোমা উদ্ধার সেই কেশপুরে
প্রভাসবাবু বলেন, “শ্রম-বিমুখ মানুষগুলোর দিন থেকে রাত কেটে যায় নেশার পেছনে। নেশার টাকা জোগাড় করতে বাড়ির দরজা-জানলা পর্যন্ত খুলে বিক্রি করে দেয়। নেশাগ্রস্ত অভিভাবকদের উদাসীনতায় ধ্বংস হচ্ছে শবর শিশুদের শৈশবও।”
রমইগাড়া শবর টোলার ৭০ বছরের বৃদ্ধ পূর্ণচন্দ্র শবর। ব্যতিক্রমী এই বৃদ্ধ নেশা করেন না। তার সন্তানরাও নেশার জগত থেকে বেশ কিছুটা দূরে। তাঁর পরিবারের ছোটরা নিয়মিত স্কুলে যায়। সচেতনতার অভাবকেই কাঠগড়ায় তোলেন তিনি। তাঁর কথাতে উঠে আসে জীবন নিয়ে শবরদের চরম উদাসীনতার কথা। তিনি বলেন, “পাখি যেমন উড়তে উড়তেও নিজের বাসাকে আগলে রাখে, তেমনভাবে সরকারের দেওয়া ঘরে নিজের সংসার আগলে রাখার পরামর্শ দিয়ে যাই। কিন্তু কেউ শুনলে তো!”
শবর জনজাতির এই মানুষগুলোর উন্নতির জন্য সরকার করে দিয়েছে স্কুল। গ্রামে রয়েছে পানীয় জলের ব্যবস্থা। রয়েছে বিদ্যুৎ। কিন্তু যাদের জন্য করা, তাঁরাই তো মুখ ফিরিয়ে। আলো তাই দূর থেকে দূরবর্তী হয় প্রতিদিন।