
শেষ আপডেট: 19 July 2023 08:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বাংলায় (West Bengal) একশ দিনের কাজের টাকা একদম বন্ধ করে দিয়েছে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী সরকার। এই খাতে বাংলার বকেয়া পাওনা প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার ব্যাপারে কোনও উচ্চবাচ্য করছে না। নতুন করে ১টাকাও দিচ্ছে না। সেই সঙ্গে আবাস যোজনায় প্রাপ্য ৮২০০ কোটি টাকা আটকে রেখেছে দিল্লি। বিপরীতে রাজ্যে ভয়ঙ্কর আর্থিক দৈন্য সত্ত্বেও লক্ষ্ণীর ভাণ্ডার প্রকল্প চালিয়ে যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এহেন পরিস্থিতিতে পঞ্চায়েত ভোটের পর বিজেপির মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে যে, এতে কি দলের ভাল হল? গ্রামের মানুষের টাকা আটকে তৃণমূলের হাতেই অস্ত্র তুলে দেওয়া হল না কি? দিলীপ ঘোষ দলের বৈঠকেই পষ্টাপষ্টি প্রশ্ন তুলেছেন, ৬০ শতাংশ বুথে কোনও অশান্তি হয়নি। তাও বিজেপির খারাপ ফল হল কেন?
এরই মধ্যে নতুন বিড়ম্বনা বিজেপির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তা হল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জমানায় বাংলায় দারিদ্র ধারাবাহিক ভাবে কমছে। পূর্বতন যোজনা কমিশনের নাম পরিবর্তন করে নীতি আয়োগ (Niti Aayog) বানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেই নীতি আয়োগের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল—এই পাঁচ বছরে বহুমুখী দারিদ্র সূচকে (Multidimensional Poverty Index) বাংলায় গরিব মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে।
কতটা দারিদ্র (Poverty) কমেছে বাংলায়?
নীতি আয়োগের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৫-১৬ সালে ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেল্থ সার্ভেতে (NFHS) দেখা গিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে বহুমুখী দারিদ্র সূচকে ২১.২৯ শতাংশ মানুষ ছিলেন দারিদ্র সীমার নিচে।

বড় কথা হল, শুধু ক্রয় ক্ষমতার ভিত্তিতে দারিদ্র কমেছে এমন নয়। এই সূচক হল বহুমুখী। অর্থাৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, প্রসূতির স্বাস্থ্যর মতো বিষয়ও এখানে গণনার মধ্যে ধরা হয়।
জেলাভিত্তিক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, বাংলায় দারিদ্র সবচেয়ে কমেছে পুরুলিয়া জেলায়। সেই সঙ্গে রয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুর। পুরুলিয়া বাদে এই চার জেলায় সংখ্যালঘু জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
এ ব্যাপারে বুধবার তৃণমূল সাংসদ তথা প্রাক্তন আমলা জহর সরকার বলেছেন, “একটা ব্যাপার এখানে লক্ষণীয়। তা হল, পশ্চিমবঙ্গে জনঘনত্ব দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। প্রতি বর্গমাইলে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ বাস করেন। অথচ দারিদ্র সূচকে এই রাজ্য এখন গুজরাতের সমতুল। যে গুজরাত হল তথাকথিত ধনীদের রাজ্য এবং বিনিয়োগের জন্য নাকি সেরা গন্তব্য”। নীতি আয়োগের হিসাবে গুজরাতে ১১.৬৬ শতাংশ মানুষ গরিব।

নীতি আয়োগের সমীক্ষা বলছে, দারিদ্র সবচেয়ে বেশি কমেছে গ্রামে। বস্তুত গ্রামের মানুষকে বছরে অন্তত ১০০ দিন কাজ সুনিশ্চিত কাজ দেওয়ার লক্ষ্যে রোজগার গ্যারান্টি প্রকল্প চালু হয়েছিল। শুভেন্দু অধিকারীদের দাবি মেনে বাংলায় সেই একশ দিনের কাজ প্রকল্পের টাকা বন্ধ করেছে মোদী সরকার। তাদের বক্তব্য, প্রকল্প খাতে পুরনো দুর্নীতির হিসাব দিতে হবে। কিন্তু তার পাল্টা প্রশ্নও উঠেছে। পুরনো দুর্নীতির কারণে গরিব মানুষকে নতুন কাজ দেওয়া কেন বন্ধ থাকবে? শাসক দলের কেউ দুর্নীতি করে থাকলে নিরপরাধ সাধারণ মানুষ কেন তার জন্য কাজ পাবে না? তৃণমূলের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও বাংলায় এই প্রশ্নটা সিপিএমও জোরালো ভাবে তুলেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, যে সময়ে বহুমুখী দারিদ্র নিয়ে সমীক্ষা চালিয়েছিল নীতি আয়োগ তখনও অর্থাৎ ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলা একশ দিনের কাজ প্রকল্পে টাকা পেয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ এত নাট-বল্টু বোঝেন না। তাঁদের সামনে দুটো ছবি এখন রয়েছে। এক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লক্ষ্মী ভাণ্ডারের মাধ্যমে টাকা দিচ্ছেন। দুই নরেন্দ্র মোদী সরকার একশ দিনের কাজ ও আবাস যোজনা খাতে টাকা দিচ্ছে না। সার্বিক এই পরিস্থিতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজনৈতিক ভাবে অক্সিজেন দিতে পারে। তিনি বলতে পারেন যে কেন্দ্র আর্থিক অসহযোগ করলেও বাংলায় দারিদ্র কমাতে সফল হয়েছে তাঁর সরকার। খাদ্য সাথী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্য সাথীর মতো প্রকল্প মানুষকে দারিদ্র থেকে বের করে এনে বহুমুখী আর্থ সামাজিক উন্নয়নে পথে আনতে পেরেছেন তিনি।

রাজ্যের পঞ্চায়েত মন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার কার্যত এদিন সেটাই বলেছেন। তাঁর কথায়, “বাংলার মানুষের ভাতে মারার চেষ্টা করেছেন শুভেন্দু অধিকারী, নরেন্দ্র মোদীরা। ওঁরা জানেন না এখানে মুখ্যমন্ত্রীর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রের 'অর্থনৈতিক' অবরোধ থাকা সত্ত্বেও লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, আনন্দধারা থেকে কৃষক বন্ধু কিংবা একাধিক সামাজিক প্রকল্প চালিয়ে যাচ্ছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। তারই সুফল আজ নীতি আয়োগের রিপোর্টে জলের মত পরিস্কার হয়ে গিয়েছে।"
আরও পড়ুন: মমতার মেয়াদে প্রথম পাঁচ বছরে বাংলায় দারিদ্র কমেছে ৬ শতাংশ