শেষ আপডেট: 28 November 2019 15:12
গা গরমের ম্যাচ ছিল বাংলায়। অনুশীলন ম্যাচও বলতে পারেন। তাতে তিন-শূন্যের ব্যবধানে বিজেপির মতো প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেওয়ার মধ্যে অবশ্যই মহানাটকীয় ব্যাপার রয়েছে। বিশেষ করে এমন দুই আসনে জিতে যাওয়া, যে দু’টি ১৬ সালের ভোটে একা দু’শো পেরিয়েও ছুঁতে পারেননি দিদি। এমনকি এবারও খেলার আগে সেখানে জেতার ব্যাপারে কোনও রকমই আত্মবিশ্বাস ছিল না তৃণমূলের। শুধু আশা ছিল, লোকসভা ভোটের তুলনায় খড়্গপুর, কালিয়াগঞ্জে হারের ব্যবধান নিশ্চয়ই কমানো যাবে।
সুতরাং তৃণমূল আজ আবির খেলবে, আনন্দ করবে সেটাই স্বাভাবিক। লোকসভা ভোটে বিজেপির কাছে ১৮টি আসনে হেরে যাওয়ার পরে যাঁরা মনোবল হারিয়ে গর্তে ঢুকে গিয়েছিলেন, তাঁরাও বেরিয়ে আসার সাহস পাবেন— বলার অপেক্ষা রাখে না।
কিন্তু সমস্ত রকম ভনিতা ছেড়ে এখন মূল প্রশ্ন একটাই— একুশে কি ফিরে আসা পাকা তাহলে?
শুধু রাজনীতির লোকেরা কেন, গোটা বাংলার কাছেও কৌতূহল এখন সেটাই। জবাবে এক কথায় বলা যায়. না। তা বলা যাবে না। এই অনুশীলন ম্যাচ দিয়েই একুশের ফাইনালের বিচার করা যাবে না। কেন যাবে না তার অন্তত দশ রকম কারণ দেখানো যায়।
প্রথমত, রাজনীতিতে কোনওটাই নিত্য নয়। সবই অনিত্য। মাত্র ছ’মাসের ফারাকে কী রকম আসমান-জমিন ফারাক হতে পারে, বৃহস্পতিবারের ফলই তা হাতেনাতে দেখিয়ে দিয়েছে। কালিয়াগঞ্জে ৫৬ হাজারের লিড মুছে গিয়ে হেরেছে বিজেপি। আবার বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের খাসতালুক খড়্গপুরে ৪৫ হাজারের ব্যবধান মুছে দিয়ে ২০ হাজারে জিতেছে তৃণমূল। একুশের ভোট আসতে আসতে আরও প্রায় সওয়া বছর। তত দিনে কোথাকার জল কোথায় গড়াবে, তা গণৎ করে বলা এখনই কারও পক্ষে সম্ভব নয়।
এমনিতে উপনির্বাচনের সাধারণ শর্তই হল রাজ্যে শাসক দল সাধারণত হারে না। কারণ এ ধরনের উপনির্বাচনে একে তো সরকার বদলে দেওয়ার ব্যাপার থাকে না। তা ছাড়া রাজ্যে ক্ষমতায় থাকার সুবাদে পুলিশ প্রশাসনের থেকে কিছু সুবিধা পেয়েই থাকে শাসক দল।
তবে বিজেপি যেভাবে জেতা আসনে হেরেছে, তাতে এটাই একমাত্র কারণ নয়। বিজেপির নিজের ত্রুটিও রয়েছে। একে তো লোকসভা ভোটে ১৮টি আসন জিতে যাওয়ার পর বিজেপির অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যে বাংলায় আর তাঁদের কেউ আটকাতে পারবে না। অপ্রতিরোধ্য হয়ে গিয়েছে বিজেপি। ফলে কিছুটা দম্ভ কথায়বার্তায় বেরিয়েই পড়ছিল।
সমন্বয়েরও অভাব ছিল সংগঠনের মধ্যে। দিলীপ ঘোষ ও তাঁর অনুগামীরা ভাবতে শুরু করে দিয়েছিলেন, তাঁরাই দলকে জিতিয়ে দিতে পারেন। আর কারও প্রয়োজন নেই। পরিণামে প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল হয়েছে। কালিয়াগঞ্জে রাজবংশীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রতিনিধি টিকিট পাননি। খড়্গপুরে প্রেমচাঁদ ঝাকে প্রার্থী করা নিয়েও মতের ফারাক ছিল দলে।
সেই সঙ্গে এনআরসি নিয়ে বিভ্রান্তি তো রয়েইছে। তাতে গ্রামাঞ্চলে একাংশ হিন্দুর মধ্যেও ভীতি তৈরি হয়েছে। তা ছাড়া মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন, স্থানীয় স্তরে সমস্যার বিষয়আশয় ছেড়ে ‘গরুর দুধে সোনা’র মতো হাবিজাবি কথাও বিজেপির সম্ভাবনাকে ধাক্কা দিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এ সবের উপরে দিল্লির ব্যর্থতাও রয়েছে। কেন্দ্রে ফের ক্ষমতায় এসে গত ৬ মাসে মোদী সরকার এমন কিছু ইতিবাচক করতে পারেনি, যা বিজেপির জনভিত্তিকে ধরে রাখতে পারে। বরং অর্থনৈতিক অব্যবস্থা, বেকারত্বের হার বাড়া, পেঁয়াজের দাম ১২০ টাকা হওয়ার মতো বিষয়ও নেতিবাচক অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে।
রাজ্যস্তরের ভোটে বিজেপির হারের আর একটা বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। তা হল, লোকসভা ভোটে নরেন্দ্র মোদীর সামনে যেমন কেউ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারেননি, তেমনই বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো বিজেপির কেউ নেই। কেউ না।
বিজেপির অতীতের কথাও মনে রাখা উচিত। লোকসভা ভোটে ১৮টি আসন জিতে যাওয়া মানেই বাংলা দখল করে নেওয়া নয়। ভুলে গেলে চলবে না ১৯৮৪ সালে লোকসভা ভোটে বাংলায় ৪২টি আসনের মধ্যে ১৬টিতে জিতেছিল কংগ্রেস। তখন প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সিরা ধরেই নিয়েছিলেন, বাংলায় পরিবর্তন হল বলে! কিন্তু ১৯৮৭ সালের বিধানসভা ভোটে দেখা যায় টেনেটুনে ৪০টি আসনে জিতেছে কংগ্রেস। ফলে তিন আসনের উপনির্বাচনের ফলাফল থেকে বিজেপির শিক্ষা নেওয়ার অনেক কিছুই রয়েছে।
একই ভাবে শিক্ষা নেওয়ার রয়েছে তৃণমূলেরও। এই তিন আসনে জিতে তৃণমূল যদি ফের আত্মতুষ্টিতে ভুগতে শুরু করে, তাহলেও হিতে বিপরীত হতে পারে। কারণ, তিন আসনে হেরেই নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ হতাশ হয়ে বাংলা থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেবেন এমনটা তাঁদের অভিধানে নেই। বরং একুশের ভোটের আগে এবার হয়তো বাংলায় আরও বেশি নজর দেবেন তাঁরা।
ভোট প্রচার পরের কথা, তার আগে অন্তত কয়েক বার সরকারি কর্মসূচি নিয়ে বাংলায় আসবেন। রাজ্যের মানুষকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবেন। এনআরসি নিয়ে যদি কোনও বিভ্রান্তি থেকে থাকে মানুষের মধ্যে, তা দূর করার জন্য যথাসাধ্য করবেন। সেই সঙ্গে দলীয় সংগঠনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও নিশ্চয়ই মেটানোর চেষ্টা করবেন।
তা ছাড়া কাকতালীয় ভাবে এর আগে বিভিন্ন রাজ্যে যেমন হয়েছে, তেমনই বাংলায় চিটফান্ড ও আয় বর্হিভূত সম্পত্তির হিসেব নিয়ে শাসক দলের এক শ্রেণির নেতা ও আমলার বিরুদ্ধে সিবিআই ও ইডির তদন্তের গতি দুম করে বেড়ে যাতে পারে।
দ্বিতীয়ত, উপনির্বাচনে তিন আসনে জিতে যাওয়া মানেই এলাকার মানুষের সঙ্গে স্থানীয় তৃণমূলের নেতাদের বিচ্ছিন্নতা দূর হয়ে গিয়েছে, তা নয়। কারণ, জেলায় জেলায় স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এলাকায় ভরপুর ক্ষোভ রয়েছে। তা ছাড়া একটানা ক্ষমতায় থাকার ফলে স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়াও রয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে। তা রাতারাতি উবে যাবে তাও হয়তো নয়।
আবার এই ফলাফল আলাদিনের প্রদীপের মতো পাড়ায় পাড়ায় তৃণমূলের কোন্দলও থামাতে পারবে না। উল্টে আরও এক বার ক্ষমতায় আসছিই ধরে নিয়ে তা বেড়ে যেতে পারে। আর সেই লম্ফঝম্প আস্ফালন দেখলে বীতশ্রদ্ধ হতে পারেন মানুষ। সম্ভবত সেই কারণেই দিদি এদিন পইপই করে বলেছেন, কোনও বিজয় মিছিল করার দরকার নেই। মানুষকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।
প্রশ্ন হল, তাহলে উপনির্বাচনের এই ফলাফল তৃণমূলকে কী দিল?
জবাবে যা বলা যেতে পারে তা হল— আত্মবিশ্বাস। লোকসভা ভোটের পর তৃণমূলের জেলা স্তরের নেতাদের মধ্যে যে গা-ছাড়া ভাব এসেছিল, অনেকে যেভাবে বিজেপির দাপটের জন্য ভয় পেয়েছিলেন, তাঁরা আবার মনোবল ফিরে পেলেন। এটুকু বুঝতে পারলেন, তাঁদের সঙ্গে এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ রয়েছে। বাংলার রাজনীতিতে তৃণমূলের কাছে সেটা সবচেয়ে বড় পুঁজি।
ফল প্রকাশের পরে আরও একটা ব্যাপার ঘটে গেল নিঃশব্দেই। তৃণমূলের যাঁরা ভেবেছিলেন দল আর ক্ষমতায় ফিরবে না, এবং তা ভেবে পাঁচিলের উপরে উঠে বসেছিলেন, সুযোগ বুঝে গেরুয়া পরিসরে ঝাঁপ দেবেন বলে, তাঁরা চুপচাপ পাঁচিল থেকে নেমে এলেন। ফলে লোকসভা ভোটে বিজেপি ১৮টা আসনে জিতুক বা ৮০টা— তিন আসনের উপনির্বাচনের ফলাফল তৃণমূলকে বুঝিয়ে দিল, হারের আগে না হেরে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সব রকম চেষ্টা করা যেতেই পারে।
ব্যস, প্রাপ্তি শুধু এইটুকুই। কিন্তু এই ফলাফল একুশের নিশ্চয়তা দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।