দ্য ওয়াল ব্যুরো: "শব্দ বাজি (Crackers) বন্ধ করা অবশ্যই ভালো সিদ্ধান্ত, তবে ছোটদের আমরা যে তারা বাজি, রঙ মশাল কিনে দিই সেটা থাকলে ভালো হত", নিউ মার্কেট চত্বরে বসে এমনই মন্তব্য করলেন বছর পঁয়তাল্লিশের ডোনা দত্ত। শুধু তাই নয়, দীপাবলি বা দিওয়ালির সঙ্গে জুড়ে আছে আলোর বাজির দীর্ঘ সম্পর্ক। হটাৎ করে সব বাজি নিষিদ্ধ করে দেওয়ায় কিছুটা আফসোসের সুরই শোনা গেল ডোনাদেবীর গলায়।
অনেকটা একই সুরে কথা বললেন এলাকার এক দোকানের সিকিউরিটির কাজে যুক্ত সুজয় মিত্র। পরিবেশের কারণে বাজি নিষিদ্ধকে এক কথায় যেমন সাধুবাদ জানালেন, তেমনই পুরোপুরি বাজি নিষিদ্ধ হওয়ায় খানিক হতাশাই ধরা পড়ল সুজয়বাবুর গলাতেও। পাশাপাশি বাজি নিষিদ্ধ করার হটাৎ সিদ্ধান্তকে আপত্তিও জানান তিনি।
তাঁর কথায়, "শেষ মুহূর্তে এসে এই রকম সিদ্ধান্তের কোনও মানে হয় না। যদি নিষিদ্ধ করারই ছিল তাহলে অনেক আগেই করতে পারত। তাহলে যাঁরা পুঁজি জমিয়ে মাল তুলেছে তাঁদের ক্ষতি হত না। এমনকি লকডাউনের মতো সময়ে যেখানে আর্থিক মন্দা, সেখানে যাঁরা এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তাঁদের পেটে লাথি মারা হল।"
সকলের জন্য লোকাল ট্রেনের চাকা গড়াল ৬ মাস পর, খুশি হকাররা
পাঁচ বছরের ছেলের জন্য ফুলঝুড়ি, রঙ মশাল, তুবড়ি কিনে নিয়ে যেতেন সঞ্জয় দত্ত। আগের বছর পর্যন্তও এইসব বাজি পেয়ে খুশি হত ছেলে। কিন্তু হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার কারণে এবছর সেইটুকুও কিনতে পারবেন না। অথচ বাজির জন্য বায়না ধরেছে ছেলে। সঞ্জয়বাবুর কথায়, "ছোটবেলা থেকেই কম-বেশি বাজি ফাটাতাম। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটা কমে গেলেও ছেলের জন্য আবার কেনা হয়। আগের বারেও ছেলের জন্য কিনেছিলাম। এবার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একটু খারাপই লাগছে।"
করোনা পরিস্থিতিতে আতশবাজি নিষিদ্ধ করা হলেও, পরিবেশ বান্ধব বাজি ফাটানোর কথা বলেছিল রাজ্যের দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ। এমনকি বাজি ফাটানোর সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। গত বুধবার বিজ্ঞপ্তি জারি করে পর্ষদের বিধি নিষেধ জারি করার ২৪ ঘন্টা যেতে না যেতেই হাইকোর্টের তরফে সবরকম বাজির ক্ষেত্রেই নিষেধাজ্ঞা জারি করে দেওয়া হয়। শুধু ফাটানো নয়, বিক্রির ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা জারি করে হাইকোর্ট। সেই মত নির্দেশিকা জারি করেছে রাজ্য সরকারও।
ফলে চোরাগোপ্তা কিছু বিক্রি হচ্ছে বটে। কিন্তু সার্বিকভাবে বিক্রি বন্ধ বাজির। বাজি ফাটানোয় যেমন পরিবেশের ক্ষতি হয়, তেমনই শব্দের দাপটে বিশেষত বয়স্ক মানুষের অসুবিধারও সৃষ্টি হয়। তাই বাজি নিষিদ্ধ করায় খুশিই তরুণ প্রজন্ম। বছর পঁচিশের প্রতীক বাগচীর কথায়, "আমি খুশি এই সিদ্ধান্তে। কালীপুজোর সময় যে পরিমাণে বাজি ফাটানো হয় তাতে দূষণ খুব বেড়ে যায়। বিশেষত যাঁরা স্বাসকষ্টে বা হৃদরোগে ভোগেন তাঁদের জন্য মারাত্মক হয়ে যায়। তাই আমার মনে হয় ভালোই হয়েছে।"
একই সুরে সুর মিলিয়েছেন মাধুর্য, সাত্যকিরা। বাজি পুরোপুরি বন্ধকে এক কথায় সমর্থন জানান তাঁরা। মানুষের পাশাপাশি পশু-পাখির জন্যও এই বাজির ধোঁয়া যে ক্ষতিকর সেটাই মনে করেন তাঁরা। তবে মাধুর্য ভুঁইয়ার কথায় কোথাও গিয়ে ফুটে উঠল কিছু বাজি ফাটানোর অনুমতি থাকলে ভালোই হত। তিনি বলেন, "মনে হয় ফুলঝুড়ি জাতীয় বাজি যদি চলত তাহলে ভালো হত, তবে ঠিক আছে পরিবেশের জন্য ভালোই হয়েছে।"
অন্যদিকে সাত্যকি মজুমদার একেবারে কোনরকম বাজি ফাটানোরই পক্ষপাতী নন। তাঁর কথায়, "সব বাজিতেই কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাস কম বেশি তৈরি হয়। এমনিতেই গাড়ির জন্য দূষণ বাড়ছেই সেখানে আবার বাজি ফাটিয়ে আলাদা করে দূষণ না বাড়ানোই ভালো।"
তবে বাজি ফাটানো নিয়ে শিশুদের মধ্যেই উন্মাদনা বেশি দেখা যায়। সব রকম বাজি নিষিদ্ধ হওয়ায় মন খারাপ তাঁদের। সপ্তম শ্রেণির ছাত্র স্বার্নিক বৈদ্যের বাজি কেনা ও ফাটানো নিয়ে পরিকল্পনা ছিল অনেক। কিন্তু হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার পর সেই পরিকল্পনা বাতিল করতে হচ্ছে বলে দুঃখিত সে। তার কথায়, "বাজি ফাটাতে পারব না, মন খারাপ করছে। প্রত্যেক বছরও বাজি কিনি ফাটাই। বন্ধুরা মিলে আনন্দ করি। এবার কিছুই হবে না।" ক্লাস ইলেভেনের ছাত্র শুভ সর্দারেরও বাজি ফাটাতে পারবে না ভেবে খারাপ লাগছে ঠিকই, তবে পরিবেশের কারণে বাজি বন্ধ হওয়াকে মেনে নিচ্ছে সে।
বাজিতে নিষেধাজ্ঞা আসার পরেই কলকাতার মানুষের মধ্যে দেখা গেল যেন কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া। মোটের ওপর বাজি বন্ধ হওয়ায় খুশিই শহরবাসী। দূষণ যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়াকে আশীর্বাদই মনে করছেন। কিন্তু তারপরেও কোথাও গিয়ে মনের কোণে আফসোস রয়েই যাচ্ছে।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'