
শেষ আপডেট: 2 August 2018 08:36
তিয়াষ মুখোপাধ্যায়
ছোট-ছোট নত চোখ, ফাটা-ফাটা ভেজা গাল। অস্ফুট নেপালি উচ্চারণে ছিটকে আসা কিছু শব্দ। তিনটে ছোট ছোট মুখ। ঘর ভরা ধুনোর ধোঁয়া, শান্তির মন্ত্র। মৃত পেমবা ছুটি শেরপার শান্তি কামনায় এভাবেই থমথমে হয়ে রয়েছে ঘুমের বয়েজ় স্কুলের কাছে শেরপা বস্তির বাড়িটি।
দিন কুড়ি হয়ে গেল, কারাকোরামের সাসের কাংরি-৪ অভিযানে গিয়ে পেমবা শেরপার নিখোঁজ হওয়ার খবর এসেছে শহরে। খবর পৌঁছেছে ঘুমের বাড়িতেও। পেমবার স্ত্রী ও তিন ছেলেমেয়ের কাছে। ক্লাস সিক্সের ফুরতেমবা, নাইনের ফুলমা আর টুয়েলভের দোলমা সব বুঝলেও, ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না যে বাবা সত্যিই আর কোনও দিন ফিরবেন না। স্ত্রী ছোগপা শেরপা অবশ্য অনেকটাই দৃঢ়চেতা। কান্নাকাটির ছাপ তেমন নেই চোখেমুখে। বরং আছে সংশয় আর অনিশ্চয়তা মিলেমিশে এক গভীর শূন্যতা। শূন্যতা সন্তানদের ভবিষ্যতের প্রশ্নে, শূন্যতা নিজের আগামী দিনের প্রশ্নে। এই ব্যথাতুর শূন্যতায় কান্না-শোক-যন্ত্রণার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে একটাই কঠিন প্রশ্ন। এর পরে কী হবে?
ভাঙা হিন্দিতে ছোগপা বলছিলেন, তিন ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ মাসে সাত হাজার টাকা করে লাগে। খাওয়াদাওয়া না হয় ব্যবস্থা হবে এক রকম। আর থাকার জায়গাও আছে। কিন্তু বাকিটা? জিএনএলএফ মন ঘিসিং আশ্বাস দিয়েছেন, বাচ্চাদের পড়াশোনার খরচ যাতে কম হয়, সে বিষয়ে স্কুলে কথা বলবেন। কিন্তু তিনি কোনও প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব নন। প্রশাসন পাশে দাঁড়ায়নি?
আট বার এভারেস্ট-সহ আরও একাধিক আট হাজারি শৃঙ্গ ছোঁয়া মানুষটির জন্য প্রশাসনিক কোনও সাহায্যের আশ্বাস এখনও মেলেনি। পেমবার পরিবার অবশ্য ততটা আশাও করেননি। তাঁদের প্রশ্ন অন্য। এত বছর ধরে শেরপা হিসেবে যে কাজ করলেন মানুষটা, এত পর্বতারোহী যে তাঁর সহযোগিতায় এত উঁচু শৃঙ্গ ছুঁয়ে এত খ্যাত হল, তাঁরা কি কেউ একটা বার খোঁজও নিতে পারতেন না, মানুষটা চলে যাওয়ার পরে স্ত্রী-সন্তানরা কেমন আছেন? পাশে এসে দাঁড়ানো দূরের কথা, একটা ফোনও কি করতে পারতেন না কেউ?
উত্তর মেলে না, মাথা নিচু করে বসে থাকি। সত্যিই তো, এতই কি কঠিন ছিল একটু পাশে দাঁড়ানো? রাজ্যের পর্বতারোহণের ইতিহাসে যে মানুষটার অবদান নিয়ে কোনও মহলেই কোনও প্রশ্নের অবকাশ নেই, সেই মানুষটার জন্য কি সত্যিই কিছু করার ছিল না রাজ্য সরকারের, বা বাংলার পর্বতারোহী মহলের?
কথা হয় পেমবার দাদা, পাসাং শেরপার সঙ্গে। ভাইয়ের দুর্ঘটনার সময়ে ঘটনাস্থলে ছিলেন তিনি। আরও এক বার বলেন, কী হয়েছিল। কী ভাবে চেষ্টা করেছিলেন ভাইকে জীবিত না হোক, অন্তত মৃত অবস্থাতেও খুঁজে পাওয়ার... কী ভাবে অসহায় হয়ে হাতে-পায়ে ধরেছিলেন সহ অভিযাত্রী দলের শেরপা ভাইদের। ছিলেন পেমবা শিরিংও, দুর্ঘটনার আর এক প্রত্যক্ষদর্শী। ক্ষোভ চাপা থাকে না তাঁর গলাতেও। বলেন, “সঙ্গেই আইটিবিপি টিম সাহায্য করেনি বলে যতটা খারাপ লেগেছে, তার চেয়েও বেশি খারাপ লেগেছে ওরা সাহায্য করার ভুয়ো খবর প্রচার করেছে বলে।”
[caption id="attachment_23837" align="aligncenter" width="960"]
দেওয়াল ভরা স্মৃতি[/caption]
পাসাং শেরপা অনেকটাই সামলে উঠেছেন ট্রমা। মেনে নিয়েছেন ক্ষতি। বললেন, “নীচে জল ছিল। আমি জানি, ওতে পড়ার পরে বড়জোর দশ থেকে পনেরো মিনিট বাঁচতে পেরেছে ভাই। কিন্তু দেহটুকুও যদি আনতে পারতাম, তা হলে অন্তত...”
তা হলে অন্তত এই সময়ে বিমার টাকাপয়সা কিছু মিলত পেমবার পরিবারের। বস্তুত, এঁদের সকলেরই বিমা করানো থাকে। পর্বতারোণের মতো ঝুঁকির পেশায় জড়িত থাকলে সেটাই স্বাভাবিক। এবং এটার প্রতি গুরুত্বও রয়েছে আলাদা করে। কোথাও একটা হয়তো এঁদের পরিবারের মানুষগুলোর মধ্যে একটা আশঙ্কা তথা প্রস্তুতি থাকেই, বিপদ ঘটার। গত কয়েক বছরে তা বেড়েছে বই কমেনি।
তাই কোনও আরোহী যখন শৃঙ্গ অভিযানে যান, তখন যেমন আরেহীর পরিবারের মানুষগুলি ভেবে রাখেন, ফিরে এলে কেমন করে উদযাপন হবে, তেমনই শেরপার পরিবারের মানুষগুলি আর এক বার করে ঝালিয়ে নেন বিমার কাগজপত্র। কিন্তু সমস্যা হয়েছে দেহ না-মেলায়। দেহ না মিললে স্থানীয় পুলিশের তরফে ‘মিসিং সার্টিফিকেট’ পাওয়া গেলেও, পাওয়া যাবে না ডেথ সার্টিফিকেট। আর সেই ডেথ সার্টিফিকেট ছাড়া বিমার টাকা মিলবে না।
পাসাং বলছিলেন, এই সমস্যার জন্য এখন নেপালে অনেক সহজ হয়েছে ডেথ সার্টিফিকেট মেলার পদ্ধতি। কিন্তু পেমবার দুর্ঘটনা যে এলাকায় ঘটেছে, সেই অঞ্চলের নিয়ম অনুযায়ী ১২ বছরের আগে মিলবে না সার্টিফিকেট। ফলে তার আগে কোনও বিমার টাকা মেলাও দুষ্কর, বরং বয়ে যেতে হবে প্রিমিয়ামের বোঝা।
ওই একই অভিযানে ছিলেন পেমবার এই ছোট ভাই। কিন্তু আচমকা পক্স হওয়ায় অভিযান শুরুর আগেই ফিরে আসতে হয়েছে। তিনি থাকলে কি এড়ানো যেত বিপদ? এই প্রশ্নটাই যেন জমে রয়েছে খুদে চোখের কোণে জমে থাকা ভাঁজে।