তিয়াষ মুখোপাধ্যায়
একা গ্রীষ্মে রক্ষা নেই, করোনা দোসর! আর সে দোসর যে কতটা মারাত্মক তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বহু মানুষ ঘর বন্দি। সামাজিক জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা বসেছে। গণপরিবহণ যতটা সম্ভব কম ব্যবহার করতে বলা হয়েছে সরকারি ভাবে। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের জনজীবন কানিকটা হলেও ব্যাহত। আর এই পরিস্থিতিতে আয়োজন করা যাচ্ছে না কোনও রক্তদান শিবিরও। ফলে ব্লাডব্যাঙ্কগুলিতে রক্তসঙ্কট চরমে।
এমনিতেই গরম পড়তে শুরু করার পরে রক্তের সঙ্কট দেখা দেয় প্রতি বছরই। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। বস্তুত, গরম পড়তেই যে রক্তের সঙ্কট দেখা দিতে পারে, সে জন্য রক্তদান করার আহ্বান জানিয়ে বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই প্রচার করতে শুরু করেছিল একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। বিভিন্ন এলাকায় ক্যাম্প হওয়ারও কথা ছিল, ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে। যাতে খুব বেশি গরম পড়ার আগে কিছুটা রক্ত আগাম সংগ্রহ করা যায়।
গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় গরমের সময়ে বা তার পরপরই ডেঙ্গি, চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের প্রকোপ বাড়তে থাকে। তখন ভয়ঙ্কর রক্তসঙ্কটের সম্মুখীন হতে হয় রোগীর পরিবারগুলিকে। ব্লাডব্যাঙ্কে জোগান কম থাকায় তা সামাল দেওয়াই দায় হয়। এ বছর গরমের আগেই সঙ্কট আরও প্রখর হয়ে দাঁড়াল। করোনাভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কায় একের পর এক ক্যাম্প বাতিল করা হয়েছে। ব্লাডব্যাঙ্কগুলিতে ডোনার এসে রক্ত দেওয়ার পরিমাণও অনেক কমে গেছে।
এর ফলে চরম বিপদে পড়েছেন বহু রোগী পরিবার। বিশেষ করে ক্যানসার বা থ্যালাসেমিয়ার মতো অসুখে যাঁরা চিকিৎসাধীন, নিয়মিত রক্ত দিতে হয়, তাঁরা বিপদে পড়েছেন সবচেয়ে বেশি। আপৎকালীন অস্ত্রোপচারের রোগীদেরও একই সমস্যা।
মানিকতলা ব্লাডব্যাঙ্কের ডক্টর রবীন্দ্রনাথ মান্না বললেন, "আমাদের রক্তের স্টক এই মুহূর্তে থাকলেও, তা স্বস্তির নয়। কারণ নতুন রক্তের জোগান আসা কমে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে কী হবে, বুঝতে পারছি না।"
মৌলালির ব্লাডব্যাঙ্ক 'লাইফ কেয়ার'-এর এক কর্মী প্রশান্ত চক্রবর্তী জানালেন, সঙ্কট বাড়তে শুরু করেছে। আগামী দিনে আরও বাড়বে বই কমবে নয়। গত তিন দিনে পাঁচ-পাঁচটা ক্যাম্প হওয়ার কথা ছিল, হয়নি। এক একটা ক্যাম্প থেকে অন্তত ৩০-৩৫ ইউনিট রক্ত তো আসতই। তিনি বললেন, "আমার বি নেগেটিভ। আজ সকালে আমি নিজে রক্ত দিয়েছি একটি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত কিশোরীর জন্য।"
আসানসোল জেলা হাসপাতালের ব্লাডব্যাঙ্কের ইনচার্জ ডক্টর সঞ্জিত চট্টোপাধ্যায় বললেন, "সঙ্কট আসতে চলেছে, এটা স্পষ্ট। এখনও ছোট ছোট করে ক্যাম্প করছি আমরা, সমস্ত নিয়ম মেনে, স্ক্রিনিং করে রক্ত নিচ্ছি, কিন্তু আর কতদিন চালানো যাবে জানি না। সকলকেই বলছি, আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।"
তাঁর মতে, সতর্ক হয়ে সবরকম নিয়ম মানাটাই জরুরি। সর্বোচ্চ বিধিনিষেধ মেনেই রক্ত সংগ্রহ করা হয়, এখন তা আরও আঁটোাঁটো। করোনাভাইরাস সংক্রমণের কোনও রকম ঝুঁকি নেওয়া এই মুহূর্তে কাম্য নয়। কিন্তু রক্তের অভাবে কোনও রোগী যেন বিপদে না পড়েন, সেটাও কম জরুরি নয়। "তাই যাঁরা সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন, করোনার সন্দেহভাজন কোনও রোগীর সংস্পর্শে আসেননি, তাঁদের আমরা অনুরোধ করছি, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে এসে রক্ত দিতে। ভবিষ্যতে আরও খারাপ পরিস্থিতি হতে পারে।"-- বললেন তিনি।
রক্তের এই সঙ্কট নিয়ে বহু দিন ধরেই কাজ করছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন লাইটহাউস। তার সভাপতি মালিনী বসু বললেন, "এই মুহূর্তে রক্তদান শিবিরের আয়োজন করাটা ঠিক হবে কিনা, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ হিসেবে আমি নিজেও ধন্দে রয়েছি। কিন্তু সকল সুস্থ মানুষ যদি নিজে থেকে গিয়ে নির্দিষ্ট সময় অন্তর রক্ত দিয়ে আসেন হাসপাতালে বা ব্লাডব্যাঙ্কে, তাহলে সঙ্কট একটু হলেও মিটবে। বিভিন্ন ব্লাডব্যাঙ্কগুলো থেকেই রোগীরা ফিরে আসছেন, খবর পাচ্ছি। এই সময়ে সকলকেই অনুরোধ, যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করে রক্ত দিয়ে আসতে পারেন।"
রক্তদান আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত সংগঠন ব্লাডমেটসের তরফে প্রিয়ম সেনগুপ্তও বললেন সেই একই বিভ্রান্তি ও অসহায়তার কথা। তাঁর কথায়, "ব্লাডব্যাঙ্কগুলো যে খালি হয়ে আসছে, তা বুঝতেই পারছি। কিন্তু এই সময়ে হাসপাতালের মতো জনবহুল জায়গায় যাওয়াটা আদৌ কতটা নিরাপদ, বুঝতে পারছি না। এমনকি কেউ যদি একাও যান, তাহলেও তো তিনি বাসে-ট্রেনেই যাবেন। সেটাও কি উচিত? এই অবস্থার সমাধান নেই আমাদের কাছে।"
শ্রীরামপুর শ্রমজীবী হাসপাতালের ব্লাডব্যাঙ্কের ইনচার্জ গৌতম সরকার বললেন, "সচেতনতা যত, আতঙ্কের পরিবেশ তার চেয়ে বেশি তৈরি হচ্ছে। এর জেরে কুসংস্কারও ছড়াচ্ছে নানারকম। কেউ বলছেন রক্ত দিলে ইমিউনিটি কমে যাবে, কেউ বলছেন দুর্বল হয়ে পড়বেন। রক্ত দিতে গিয়ে নাকি করোনাভাইরাস চলে আসবে শরীরে, এমন আতঙ্কও প্রকাশ করছেন কেউ কেউ। বিচিত্র সব কারণে রক্তদান বন্ধ করে দিচ্ছেন বহু ডোনার। আমাদের দু'জন ডাক্তারবাবু আজ রক্ত দিলেন আপৎকালীন পরিস্থিতিতে। যে সব রোগীদের রক্ত প্রয়োজন, তাঁরা চরম বিপদে পড়ছেন, পড়তে চলেছেন।"