তিয়াষ মুখোপাধ্যায়: “চূড়ান্ত কঠিন একটা খাড়া ওয়ালে রুট ওপেন করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটত ওর সঙ্গে, তা-ও মানা যেত। কিন্তু এভাবে ঘরের কাছে এসে যেটা হল, সেটা মানতে কষ্ট হচ্ছে খুব।”—বললেন সাসের কাংরি শৃঙ্গ অভিযানের দলনেতা বসন্ত সিংহরায়।
তাঁর নেতৃত্বেই মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন অফ কৃষ্ণনগর (ম্যাক)-এর তরফে, পুণের যৌথ উদ্যোগে একটি দল গিয়েছিল কারাকোরাম রেঞ্জের নুব্রা উপত্যকার সাসের কাংরি ফোর শৃঙ্গ অভিযানে। ফেরার পথে ক্যাম্প ওয়ানের খানিক আগে ক্রিভাসে তলিয়ে যান ওই দলের সদস্য পেমবা শেরপা। দু’বার খোঁজার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি তাঁকে।
অভিযান শেষে ফেরার পরে শুক্রবার কথা বলা যায় বসন্তবাবুর সঙ্গে। জানা যায়, ১০ তারিখে সকলে ক্যাম্প টু-এ ছিলেন। সেখানেই পেমবা শেরপা জানান, উপরের রাস্তা বিপজ্জনক। সকলকে নিয়ে আরোহণ করা মুশকিল। দলনেতা বসন্তবাবুর নির্দেশে দল ভাগ হয়। ম্যাকের বিশ্বনাথ এবং পুণের অনিলকে নিয়ে এগিয়ে যান পেমবা শেরপা, পেমবা শিরিং এবং লাকপা শেরপা। বাকিদের নিয়ে, পেমবা শেরপার দাদা পাসাং শেরপাকে নিয়ে নীচের দিকে নামতে শুরু করেন বসন্তবাবু। পৌঁছে যান বেসক্যাম্পে।
ওই দিনই সামিট ক্যাম্পে পৌঁছে, রাতে সামিটের উদ্দেশে বেরিয়ে, ১২ তারিখ সকালে সামিট হয়। সামিট ক্যাম্পে নেমে আসেন পাঁচ জন। ১৩ তারিখ সকালে নামতে শুরু করেন সকলে। ওয়াকিটকিতে খবরও যায় বেসক্যাম্পে। সামিট হয়েছে এবং সকলে ঠিক আছেন জেনে বেসক্যাম্প থেকে আরও নীচে নেমে রোডহেডে পৌঁছে যান বসন্তবাবুরা। পাসাং শেরপা ওঁদের খানিক এগিয়ে দিয়ে, ফিরে আসেন ক্যাম্প ওযানে। বাকি সকলে নামার পরে একসঙ্গে নামবেন বলে।
“কঠিন পথ পার করে ফেলেছিল ওরা। একদম ক্যাম্প ওয়ানের কাছে এসে গিয়েছিল। তার পরে কী করে যে এমনটা হল! রোপড আপ থাকলে হয়তো এমনটা ঘটত না!”—বিস্ময় আর আফশোস ঝরে পড়ে বসন্তবাবুর গলায়। তাঁর কথায়, “দুর্ঘটনার কথা যখন শুনলাম, সীতার পাতাল প্রবেশের কথা মনে হল। সকলের সামনে আস্তে আস্তে নামছিল পেমবা। পা দিয়ে দিয়ে আন্দাজ করে নিচ্ছিল, ক্রিভাস আছে কি না। ওই জায়গাটাতেও আন্দাজই করছিল। বাঁ পা রেখে, ডান পা-টা একটু এগিয়ে বরফ ঠুকে পরখ করছিল। হঠাৎ বাঁ পায়ের জায়গাটা ধসে গেল। ওরা চোখের সামনে দেখেও ওরা বুঝেই উঠতে পারেনি!”
শক্তপোক্ত, ভারী চেহারা পেমবা শেরপার। তার ওপর পিঠে অনেক ভার, হাতে দড়ি। “ওর স্বভাব ছিল, মেম্বারদের ভারী জিনিসপত্র নিজের কাছে নিয়ে নেওয়া। অনেকটা লোড ছিল। সেই ভারেই কি এত দ্রুত হারিয়ে গেল?”—বসন্তবাবুর এই স্বগতোক্তির উত্তর হয়তো কোনও দিনই আর মিলবে না।
খবর পেয়ে পাসাং ছুটে যান দড়ি নিয়ে, প্রায় কুড়ি ফিট মতো নীচে নামেন ক্রিভাসের। “জলের শব্দ পাচ্ছিলাম, আর খুব অন্ধকার। এক বার মনে হয়েছিল যেন নীল মতো কিছু পড়ে রয়েছে, পেমবার রুকস্যাকের রং ওটাই ছিল। কিন্তু... আমি পৌঁছতে পারিনি।”—বলেন পাসাং।
পৌঁছনো কি অসম্ভব ছিল?
বসন্তবাবুর আক্ষেপ, অসম্ভবের কথা না ভেবে পৌঁছনোর চেষ্টা করা যেত। কাছেই ছিল আইটিবিপি-র প্ল্যাটো অভিযানের টিম। ওই টিমে ছ’জন শক্তিশালী শেরপা ছিলেন। সকলেই নেপালের মাকালু অঞ্চলের। কেউ নাঙ্গা পর্বত আরোহণ করেছেন, তো কেউ কে-টু। ওঁরা সকলেই সদ্য এসে পৌঁছেছিলেন। ফলে ওঁদের শারীরিক সক্ষমতা ও দক্ষতা অনেক গুণ বেশি ছিল, পাসাংদের থেকে।
“ভাইকে খুঁজে না পেয়ে নেমে এসে আমি ওদের পায়ে ধরেছিলাম, তোমরা এক বার ওপরে চলো। আমিই নামব ক্রিভাসে, তোমরা আমায় একটু সাহায্য করো শুধু।”—বললেন পাসাং। সাড়া মেলেনি। নীতির কাছে হার মানল মানবিকতা। ওই দলের সদস্য, আইটিবিপি-র সেনারা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, লিখিত বার্তা ছাড়া তাঁরা দলের কোনও সদস্যকে ছাড়তে পারবেন না। আইটিবিপি জানিয়ে দিল, বার্তা তারা পাঠিয়েছেন, না পৌঁছলে কিছু করার নেই। কাজ করল না শেরপাদের সহজাত ভ্রাতৃত্ববোধও।
আইএমএফ-এর তরফে অপূর্ব ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, আইটিবিপি-র ডিজি প্রেম সিং বলেন, “খবর পেয়ে আমরা আমাদের প্ল্যাটো অভিযাত্রী টিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। ফলে লে-র চৌকিতে মেসেজ পাঠাই।” সেখান থেকে যখন আটিবিপি-র অভিযাত্রী দল খবর পায়, তত ক্ষণে পেরিয়ে গিয়েছে দু’দিন। তাঁরা দুর্ঘটনাগ্রস্ত টিমের সঙ্গে যোগাযোগও করেন। কিন্তু তখন উদ্ধারের আশা আর নেই বলেই জানানো হয়। ফলে নিজেদের অভিযানেই এগিয়ে যায় ওই টিম। উদ্ধারে নয়।
ফলে ১৫ তারিখ ফের দ্বিতীয় দফার উদ্ধারকাজ চালাতে গেলেন পাসাং, পেমবা শিরিং আর লাকপাই। ফিরতে হল খালি হাতে। আর সেই আইটিবিপি দলের কাছে সেই কাঙ্ক্ষিত লিখিত বার্তা এসে পৌঁছল ১৫ তারিখ সকাল দশটায়। তিন দিন পরে। পাসাংরা জানিয়ে দিলেন, এর পরে আর খোঁজা-না-খোঁজা সমান। হতাশায়, বিরক্তিতে, যন্ত্রণায় ওই দলের সাহায্য ফিরিয়ে দিলেন তাঁরা। ইতিমধ্যে স্থানীয় পুলিশকে সব জানানো হয়েছে। কেন তাঁরা সেনাবীহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে কপ্টার পাঠানোর বা যন্ত্রপাতি পাঠানোর কোনও উদ্যোগ নেননি, সে কারণ অজ্ঞাত। উল্টে বসন্তবাবুর অভিযোগ, ফেরার সময়ে মিসিং সার্টিফিকেট দিতে গিয়ে তাঁদের কাছ থেকে ‘সুবিধা’ নিয়েছে পুলিশ।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফেও উদ্ধারকাজ আয়োজন করার কোনও চেষ্টা বা উদ্যোগ দেখা যায়নি দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরেও। বরং অদ্ভুত এক নিরুত্তাপ, নিরুদ্বিগ্ন গলায় যুবকল্যাণ দফতরের কর্তারা জানিয়ে দেন, কিছুই করার নেই তাঁদের। ‘ডেডবডি’ খুঁজে পেলে তা তুলে আনার জন্য কপ্টার পাঠাতে পারেন তাঁরা। অর্থাৎ ধরেই নেওয়া হয়েছে, মানুষটি বেঁচে নেই।
“মিরাকেল তো পাহাড়েই হয়। হোক না হোক, অন্তত একটু চেষ্টাও কি করা যেত না? সঙ্গে সঙ্গে যদি ওই শেরপাদের পাওয়া যেত... কিংবা খবর পেয়ে সে দিনই যদি আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে এসে পৌঁছত সেনার কপ্টার!”—বসন্তবাবুর কথার এই সব যদিরা হারিয়ে যায় দীর্ঘশ্বাসের আড়ালে।
[caption id="attachment_20419" align="aligncenter" width="984"]

এভারেস্টের চুড়োয় পেমবা ও বসন্ত।[/caption]
বছর পঁয়তাল্লিশের পেমবা শেরপা বসন্তবাবুর ১৫টি অভিযানের সঙ্গী। তাঁর ২৫ বছর বয়সের প্রথম অভিযান, ভৃগুপন্থে হয়েছিল এই বসন্তবাবুর সঙ্গেই। তার পর থেকে ২০ বছরের সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, অভিযান। মেনে নেওয়া সহজ নয় মোটেই। তাই শেষের দিকে গলা ধরে আসে বসন্তবাবুর। বলেন “বাংলার পর্বতারোহণে এই ক্ষতি যে কত বড়, বলার নয়! পেমবার পরিবার আছে, ওর তিনটে ছেলেমেয়ের দায়িত্ব আমাদেরই।”
তবে এমনটাই যদি নেপালে ঘটত, তা হলে হয়তো দুর্ঘটনা-পরবর্তী পর্ব অন্য রকম হতো। সেখানে বিভিন্ন এজেন্সিগুলির উদ্ধারকাজের দল আছে, ব্যবস্থা আছে। কিন্তু কারাকোরামো সবই ধু ধু। “আমার এত দিনের পাহাড় জীবনে এমনটা কখনও ঘটেনি। দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমি নিজে ফিরেছি মৃত্যুর মুখ থেকে। কিন্তু এ ভাবে বেঘোরে মৃত্যু...”—বললেন বসন্তবাবু।
পর্বতারোহণে ঝুঁকি আছে। দুর্ঘটনাও নতুন নয়। তাই কোনও ক্ষোভ নেই, অভিযোগ নেই বসন্তবাবুর। কিন্তু আক্ষেপ আছে একরাশ। আছে আফশোস। পেমবা শেরপার অবদান বাংলার পর্বতারোহণ ইতিহাসে অনস্বীকার্য। এই মানুষটার এমন মৃত্যু কাম্য ছিল না মোটেই। শেরপাদের প্রতি স্বভাবগত তাচ্ছিল্যই কি এমনটা ঘটাল? সে কারণেই কি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপে এত গড়িমসি থেকে গেল? বসন্তবাবু নিজেই বলছেন, পেমবা শেরপার জায়গায় তিনি নিজে পড়ে গেলে, অনেক ত্রস্ত হতো উদ্ধার কাজ। সমস্ত ‘না’গুলোকে হ্যাঁ করানোর চেষ্টা চলত সব মহল থেকে। কিন্তু এই গুরুত্বটুকু পেমবা পেলেন না।
“খুব দামি এক জন মানুষকে হারালাম আমরা। একটা সুন্দর উপহার হারিয়ে ফেললাম পাহাড়ের।”—ভেঙে আসে বসন্তবাবুর গলা। তবু মেনে নিতে হয়, সয়ে নিতে হয়। শিখে নিতে হয়, পর্বতারোহণের প্রতিটি পদক্ষেপে ‘জীবন-মত্যু পায়ের ভৃত্য’।
আর জেনে যেতে হয়, সমস্ত দুর্ঘটনার ক্ষত সমান হলেও, তার প্রভাব সমান হয় না সকলের কাছে, সকল সময়ে।