
শেষ আপডেট: 14 July 2022 12:31
তিনি সিংহের সঙ্গে সংসার করতেন। তাঁর খাটের তলায় ঘুমতো ‘সম্রাট’। একদিন, দুদিন নয়— টানা ২৫ বছর। সেই তিনি, সম্ভবত সিংহ পোষা প্রথম বাঙালি জাদুকর পিসি সরকার জুনিয়র (P C Sorcar Jr) বৃহস্পতিবার বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন। নতুন সংসদ ভবনের ছাদে নির্মিত অশোক স্তম্ভ তথা জাতীয় প্রতীকে (National Emblem) সিংহের (Lion) মুখাবয়ব বিতর্কে অকপটে মুখ খুললেন দ্য ওয়ালের কাছে। জাদুকর সরকারের সাফ কথা, তিনি শিল্পীর স্বাধীনতার পক্ষে। আর যাঁরা সিংহের ‘হিংস্র মুখ’ নিয়ে সমালোচনা তাঁদের ‘শুয়োরের’ (PIG) সঙ্গে তুলনা করেছেন জাদুকর।
পিসি সরকারের এই মন্তব্যে যাদু নেই। বরং যেন বিতর্কের (Controversy) বারুদ রয়েছে। কারণ, যাঁরা সিংহের মুখকে হিংস্র বলছেন, তাঁদের যুক্তির জোরও কম নয়।
আরও পড়ুন: কলকাতা মিউজিয়ামে রাখা সারনাথের প্রতিরূপের সঙ্গে মিল নেই মোদীর সিংহদের, পর্যবেক্ষণ দর্শনার্থীদের
সারনাথের আসল অশোক স্তম্ভে সিংহের মুখের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) উন্মোচন করা প্রকাণ্ড ব্রোঞ্জের জাতীয় প্রতীকে সিংহের মুখের মিল নেই বলে অভিযোগ উঠছে। বিরোধীরা সমালোচনা করে বলেছেন, এটা আসলে ইতিহাসের বিকৃতি। লালুপ্রসাদ যাদবের দল আরজেডি বলেছে, এই সিংহ যেন নরখাদক। অতীত, বর্তমান সহ গোটা দেশটাকেই গিলে খেতে চাইছে। এই সিংহ দেখে বোঝা যাচ্ছে এর নির্মাতার প্রবৃত্তি কী।
এই প্রেক্ষাপটে পিসি সরকার জুনিয়র দ্য ওয়ালকে বলেছেন, “আমি শিল্পীর স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। শিল্প স্বীকৃতির মধ্যে রাজনীতি ঢোকানোটা বোকামো।”
এখানেই থামেননি ম্যাজিশিয়ান সরকার। পষ্টাপষ্টি জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি সিংহের আগ্রাসী, হিংস্র মুখের পক্ষে। এ ব্যাপারে ধর্মরক্ষার্থে সংস্কৃত শ্লোকও আওড়েছেন জাদুকর। । তাঁর কথায়, “চারটে মুখের মধ্যে সিংহটার একটা মুখ যদি অ্যাগ্রেসিভ হয়ে থাকে তাহলে আমি আনন্দিত। সংস্কৃত শ্লোকে রয়েছে, অহিংসা পরমধর্ম। তবে এটা অর্ধেক শ্লোক। তারপরে রয়েছে, ধর্ম রক্ষার্থে প্রয়োজনে হিংস্র হওয়া উচিত।”

সিংহের অভিব্যক্তি, রাগ, হাসি—এসব ব্যাপার তাঁর চেয়ে বেশি কোনও বাঙালি হয়তো পরখ করে দেখেননি! সেই অভিজ্ঞতা থেকেই পিসি সরকার জুনিয়র বলেন, “সিংহ কিন্তু কখনও ফালতু লোকের সঙ্গে ঝগড়া করে না। ওকে খোঁচাখুঁচি করলে তবেই আক্রমণ করে। রাজনীতির যে লোকজন এর সমালোচনা করছেন তাঁদের উদ্দেশে বলতে চাই, শুয়োর হয়ে, আই রিপিট শুয়োর হয়ে সিংহের সমালোচনা করা উচিত নয়।” অর্থাৎ যাঁরা আগ্রাসী হয়ে সিংহের সমালোচনা করছেন তাঁদের সরাসরি শুয়োরের সঙ্গে তুলনা করেছেন জাদুকর।
পিসি সরকার যে সিংহটি পুষতেন সেটি ছিল আফ্রিকান ভ্যালির সিংহ। তিনি জানালেন, ও গাছে চড়তে পারত। কষ্ট করে দৌড়ে শিকার করত না। গাছের উপর থেকে দেখত কোন কোন পশু যাচ্ছে, তারপর পছন্দ মতো শিকার ধরত। তিন মাস বয়সে স্পেন থেকে সম্রাটকে তাঁর কাছে এনেছিলেন ম্যাজিশিয়ান।
পিসি সরকার জুনিয়র এও জানালেন, “আমি ওর বিয়ে দেওয়ার জন্য পাত্রী খুঁজেছিলাম। একই প্রজাতির একটি সিংহী পেয়েছিলাম দক্ষিণ ভারতে। ওদের একসঙ্গে বসবাস করাই। ওদের একটা সন্তানও ছিল। সেটিও আমার কাছে ছিল। তারপর বৃদ্ধ হয়ে মারা যায়।”

একটা সময় রাজনৈতিক ভাবে বামেদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন পিসি সরকার জুনিয়র। এমনকি নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুর পর্বেও তাঁর কলম গর্জে উঠেছিল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকারের পক্ষে। পরে অবশ্য গেরুয়া ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েন জাদুকর। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপির হয়ে বারাসত আসনে প্রতিদ্বিন্দ্বিতা করেছিলেন পিসি সরকার জুনিয়র। সম্প্রতি বিধাননগর পুরনিগমের ভোটেও বিজেপি প্রার্থীর হয়ে প্রচারে দেখা গিয়েছিল তাঁকে।
এদিন সিংহ বিতর্কে কথা বলতে গিয়ে ফোনে ক্রমশ নস্টালজিক হয়ে যাচ্ছিলেন জাদুকর। তিনি বলেন, “এমনিতে জঙ্গলের সিংহ গড়ে ১৮ বছর বাঁচে। আর খাবারের জন্য যাঁদের তেমন লড়াই করতে হয় না, অসুখ করলে ওষুধ পায়—এমন সিংহদের গড় আয়ু ২৩ বছর। কিন্তু আমার সম্রাট ২৫ বছর বেঁচেছিল।”
পিসি সরকার জুনিয়র এও বলেন, সিংহের আবেগ রয়েছে। এমনও হয়েছে, তিনি এবং তাঁর স্ত্রী রাতে সিনেমা দেখে ফিরে শুয়ে পড়েছেন তখন খাটের নীচ থেকে বেরিয়ে তাঁদের ডেকে আদর খেয়ে তারপর শুতে দিয়েছে। কিন্তু ওই, পিসি সরকারের কথায়, 'খোঁচাখুঁচি করলে সিংহ ভীষণ রেগে যায়।' এটা কি সমালোচকদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি? কে জানে!