অমল সরকার
গত ৭ জুলাই, বুধবার, সন্ধ্যায় সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র একটি ফেসবুক লাইভে ‘নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি ও আমাদের কাজ’ বিষয়ে ঘণ্টা দু'য়েকের ভাষণে অনেক কথা বলেছেন। পরদিন সিপিএমের মুখপত্র গণশক্তির-র প্রথম পাতায় সূর্যবাবুর বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। সেখান থেকে কয়েকটি লাইন এখানে উল্লেখ করছি—‘বিজেপি ও তৃণমূল নিয়ে পার্টির অবস্থান, কিছু স্লোগান নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। পার্টির কর্মসূচিগত বোঝাপড়া হল, বিজেপি আর কোনও রাজনৈতিক দলই এক না। কারণ বিজেপিকে পরিচালনা করে ফ্যাসিবাদী আরএসএস। কিন্তু নির্বাচনের সময় কোথাও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে যে তৃণমূল ও বিজেপি সমান। বিজেমূল জাতীয় স্লোগান ব্যবহার, বিজেপি-তৃণমূল মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ’-এর মতো স্লোগান বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে। আমাদের পার্টির কর্মসূচিগত বোঝাপড়াতেই পরিষ্কার, বিজেপি আর তৃণমূল কখনোই সমান নয়।’
সূর্যবাবুর এই বক্তব্য খানিক ‘ধরি মাছ, না ছুঁই পানি’ গোছের। গণশক্তি-র রিপোর্ট অনুযায়ী বলতে হয়, পার্টির তরফে এই স্লোগানগুলি দেওয়া ভুল হয়েছিল, এমন কথা সূর্যবাবু বলেননি। স্বীকার করেননি পার্টি নেতৃত্ব কর্মী-সমর্থকদের সঠিক রাজনৈতিক পথ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। একের পর এক ভুল আর ভুল স্বীকারের দৃষ্টান্ত থেকে বলতেই হয়, ‘আমরা ভুল করি, ভুল স্বীকার করি’ সিপিএমের এটা ক্যাচ লাইন হতে পারে।
অবশ্য এ দেশে কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস জুড়ে ভুল আর ভুল স্বীকারের ছড়াছড়ি। একথা ঠিক, কমিউনিস্টদের মতো আর কোনও পার্টিতে এভাবে ভুল স্বীকারের সংস্কৃতি নেই। বাংলায় বিজেপি শেষ পর্যন্ত একশো পেরতে পারল না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রশান্ত কিশোরদের কথাই যে হুবহু মিলে গেল, তার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে গেরুয়া শিবিরের কেউ ভূল স্বীকার করেননি। কারণ, তা হলে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহদের কাঠগড়ায় তুলতে হয়। এবারের বিধানসভা ভোটে বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের অবস্থা ছিল অনেকটা ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেনের মতো। প্লেয়ার বদল, মাঠের কৌশল এসবে ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেনকে যত মাথা ঘামাতে হয়, ফুটবল ক্যাপ্টেনের সে ব্যাপারে কোনও ভূমিতা নেওয়ারই সুযোগ নেই। সবই কোচ কিংবা টেকনিক্যাল ডিরেক্টরদের হাতে। এমনকী ম্যাচ চলাকালীন মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁরা কার্যত দলকে পরিচালনা করেন। কিন্তু ফলাফলে সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া হয় সম্পূর্ণ বিপরীত। ম্যাচ জিতলে তারা ক্যাপ্টেনকে কাঁধে তুলে নেয়। হারলে কোচ, টেকনিক্যাল ডিরেক্টরদের বাপবাপান্ত করে। বাংলায় বিজেপির অভাবনীয় হারের জন্য দিলীপ ঘোষকে কোথাও দলীয় কর্মী-সমর্থকদের বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়নি। কারণ সবাই বুঝেছেন কী থেকে কী হয়েছে। কিন্তু দিলীপবাবুকেও মাথায় রাখতে হয়েছে কোচ, টেকনিক্যাল ডিরেক্টর অর্থাৎ মোদী অমিত শাহদের দিকে কেউ না আঙুল তুলে বসে। তাই আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট পর্যালোচনা বৈঠক টুকু পর্যন্ত হয়নি।
কংগ্রেসও একটা কমিটি গড়ে ফলাফল বিচার-বিশ্লেষন করছে বলে জানা গিয়েছে। কিন্তু সরকারিভাবে বলেনি, কোথায় হল। সেদিক থেকে সিপিএমের প্রশংসা প্রাপ্য। কিন্তু ভুল করে ভুল স্বীকারের মতো একটা ভালো কাজকেও কতটা বিরক্তিকর করে তোলা যায় ওই দলটিও তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পার্টির এই অসুখের মূলে আছে মৌলবাদী মানসিকতা। মাথায় যা একবার ঢোকে তা আর নামতে চায় না। বেশ মনে আছে জমি আন্দোলন পর্বে কৃষি ও শিল্প নিয়ে সিপিএম নেতাদের কথাগুলি। শিল্পের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে চাষআবাদকে একপ্রকার দূরছাই করা শুরু করেছিলেন নেতারা।
সূর্যবাবুদের কথা আপাতত থাক। একটু পিছনে ফেরা যাক।
২০০০ সালের মাঝামাঝি কোনও একটা দিন। অটল বিহারী বাজপেয়ী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, সেদিন কলকাতায়। উঠেছেন রাজভবনে। সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গিয়েছেন জ্যোতি বসু। ওই বছরই ৬ নভেম্বর মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন জ্যোতিবাবু। বাজপেয়ী ও বসু রাজনীতির দুই ভিন্ন মেরুর বাসিন্দা হলেও দু’জনের ব্যক্তিগত সখ্য ছিল দেখবার মতো। জ্যোতিবাবু দিল্লি গেলে শিল্পপতি, পরবর্তী কালে বিজেপির সর্ব-ভারতীয় সহ-সভাপতি বীরেন জে শাহ’র বাড়িতে বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আডবাণীদের সঙ্গে তাঁর নৈশভোজের আড্ডা রাজধানী-রাজনীতির আঙিনায় খুবই আলোচিত বিষয় ছিল একটা সময়। জ্যোতিবাবুর পছন্দের মানুষ বলেই শাহকে পরে বাংলার রাজ্যপাল করে পাঠান বাজপেয়ী।
সেদিন রাজভবনে বাজপেয়ীর সঙ্গে সাক্ষাৎ সেরে এসে জ্যোতিবাবু দলের একটি জনসভায় হাজির হন। ভাষণে বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কেন ওঁর পার্টিকে অসভ্য, বর্বর বলি। আমি ওঁকে বললাম, আপনাকে তো বলিনি। আপনার দলকে বলেছি। এছাড়া আর কী বলতে পারি বলুন? যারা একটা প্রাচীন ইমারত (বাবরি মসজিদ) ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে ইতিহাসকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা করে, তাদের আর কী বলা যায়।’
সংবাদমাধ্যমে বসুর ওই বক্তব্য ফলাও করে প্রচার হওয়ার পরও কারও কারও মনে সংশয় ছিল, জ্যোতিবাবু কি সত্যিই প্রধানমন্ত্রীর মুখের উপর কথাগুলি বলেছিলেন? ব্যক্তি বাজপেয়ী, প্রধানমন্ত্রীর অফিস কিংবা বিজেপির কেউ অন্তত বসু মিথ্যা বলেছেন, এমন দাবি করেননি। অর্থাৎ সাহস করে প্রধানমন্ত্রীর মুখের উপর তাঁর দল সম্পর্কে অমন কথা বলে এসেছিলেন জ্যোতিবাবু।
বাজপেয়ী ও জ্যোতিবাবুকে নিয়ে এই প্রসঙ্গটি বিধানসভা ভোটের আগে রাজনীতির এক আড্ডায় উত্থাপন করেছিলাম। জ্যোতিবাবু বিজেপি ও সংঘ পরিবারের প্রতি কেমন আক্রমণাত্মক ছিলেন সেটা বোঝাতেই ওই প্রসঙ্গ এসেছিল। ২০০৪-এর লোকসভা ভোটের প্রসঙ্গেও অনেক কথা হয়েছিল সেদিন। নানা কারণে সেবারের নির্বাচনটি আমার কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এবারের বিধানসভা ভোটের সঙ্গে বেশ মিল আছে ওই নির্বাচনের।
আমাদের দেশে, এ রাজ্যেও তখন ফেসবুক ইত্যাদি সোশ্যাল মিডিয়ার বলতে গেলে ভ্রুণাবস্থা চলছে। প্রচলিত উপায়ই ছিল প্রচারের মূল কৌশল। অর্থাৎ মিটিং, মিছিল, দেওয়াল লিখন ইত্যাদি। সেই সঙ্গে বামপন্থীরা, বিশেষ করে সিপিএম পাড়া বৈঠকে বেশ জোর দিয়েছিল। অথার্ৎ দশ-বিশ-পঁচিশজনকে নিয়ে আলোচনা। বাজপেয়ী সরকারের বিরুদ্ধে সবচয়ে সরব ছিল মধ্যবিত্ত অংশ। একদিকে ব্যাঙ্ক এবং ডাকঘরের স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পে সুদের হার ব্যাপক কমিয়ে দিয়েছিল এনডিএ সরকার। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা বন্ধ করে দেওয়া, সরকারি সংস্থায় কর্মী ছাঁটাই এসব তো ছিলই। তার উপর কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিঁটে দিয়েছিল সরকারি প্রচার ‘ইন্ডিয়া শাইনিং’।
সেবার দেখেছিলাম, কী নিষ্ঠা এবং নিপুণ দক্ষতার সঙ্গে বাম কর্মীরা খাতা-কলম নিয়ে ঘরোয়া সভায় অঙ্ক কষে মানুষকে বোঝাচ্ছেন ব্যাঙ্ক, পোস্ট অফিস থেকে মাস গেলে সুদ বাবদ প্রাপ্তি কীভাবে কমে গিয়েছে তার তুলনামূলক পরিসংখ্যান। এবার বিধানসভা ভোটের মুখে পেট্রল, ডিজেলের দাম বৃদ্ধি, স্বল্প সঞ্চয়ের সুদের হার কমিয়ে দেওয়ার মতো বেশ কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরে সেই আড্ডায় বলেছিলাম, পরিস্থিতিটা কিন্তু ২০০৪-এর মতো। কিন্তু বামপন্থীদের এবারের প্রচারে বিজেপি, নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহদের বিরুদ্ধে সেই ধার নেই।
আড্ডায় হাজির ছিলেন সিপিএমের দুই নিষ্ঠাবান নেতা-কর্মী। তাঁরা বলেছিলেন, সবই বুঝলাম, কিন্তু এটা বিধানসভার ভোট। রাজ্য সরকারের ভালমন্দ বিচারের নির্বাচন। একমত না হয়ে বলেছিলাম, মানুষের দৈনন্দিন জীবনযন্ত্রণার সঙ্গে বামপন্থীদের এমন বিচ্ছিন্নতা অভাবনীয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১-তে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। তিন বছরের মাথায়, ২০১৪-তে নরেন্দ্র মোদী দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন তাহলে মোদীর বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ভোট নয় কেন? বিজেপি তো মোদী সরকারের সাফল্য দাবি করেই সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন ফেরি করছে। তাহলে বামপন্থীরা কেন সেই সরকারের অপকীর্তিকে প্রচারে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে না? ব্যর্থতা মাপতে গিয়ে কেন নরেন্দ্র মোদীর থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আগে কাঠগড়ায় তুলছে?
প্রশ্ন করেছিলাম, বামপন্থীরা কি তৃণমূলের বিকল্প সরকার প্রতিষ্ঠা করার মতো শক্তি ধরে? নিজের মত বলেছিলাম, বামপন্থীদের কাছে এবারের নির্বাচন সরকার গড়ার নয়, বরং নিজেদের রাজনীতিকে রক্ষার লড়াই। ভোট মানে কি সর্বদা সরকার গড়ার সংগ্রাম? যদি সেটাই একমাত্র উদ্দেশ্য হত তাহলে এসইউসি, সিপিআই (এমএল) লিবারেশন কি সরকার গড়ার লক্ষ্যে ভোটে অংশ নেয়। বামপন্থীরাই বা কেন বলে, নির্বাচন একটি রাজনৈতিক সংগ্রাম?
অন্য প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে এবারের বিধানসভা ভোটের সঙ্গে ২০০৪-এর লোকসভা নির্বাচনের মিলগুলি নিয়ে খানিক আলোচনা করে নেওয়া যাক। সেবারই প্রথম বাংলায় তো বটেই, দেশেও প্রথমবার ভোটে বিশেষ পর্যবেক্ষক হিসাবে একজন অফিসারকে নিয়োগ করেছিল নির্বাচন কমিশন। বিহারের পদস্থ আমলা আফজল আমানুল্লা কলকাতায় পা দিয়েই মন্তব্য করেছিলেন, বাংলার অবস্থা বিহারের থেকেও খারাপ। কমিশন সব টাইট করে দেবে। সেবার পর্যবেক্ষকদের সম্পর্কে একটি আপত্তিজনক মন্তব্যের জন্য সিপিএম নেতা বিমান বসুর বিরুদ্ধে রাজ্যের তৎকালীন মুখ নির্বাচনী অফিসার বাসুদেব বন্দ্যোপাধ্যায় এফআইআর করেছিলেন। বাসুদেববাবু পরবর্তীকালে রাজ্যের মুখ্যসচিব হন।
সেবারই প্রথম রাজ্যের তিনজন পুলিশ সুপারকে ভোটের দিন কয়েক আগে সরিয়ে দেয় কমিশন। আর রাজ্য সরকারের কর্মচারীদের প্রতি কমিশন এতটাই অনাস্থা জ্ঞাপন করেছিল যে আমানুল্লার পরামর্শে তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার টিএস কৃষ্ণমূর্তি অসম ও ঝাড়খণ্ড থেকে কিছু বাঙালি কর্মচারীকে বাংলার বুথে বুথে নিয়োগ করেছিলেন। আমার বেশ মনে আছে, দলমত নির্বিশেষে রাজ্যের মানুষ কমিশনের ভূমিকায় অসম্মানিত বোধ করেছিলেন তখন। ভোটের বাক্সে তার প্রতিফলন ছিল। বামপন্থীরা সেবার বাংলা থেকে রেকর্ড সংখ্যক, ৩৫টি আসনে জয়ী হয়েছিল। গোটা দেশে জয়ী হয় ৬৫ আসনে। এ রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের আসনটি ধরে রাখতে পেরেছিলেন। কংগ্রেস পেয়েছিল ছয়টি আসন।
অথচ, সেবার বামপন্থীদের ফল কেমন হবে তা নিয়ে অনেকেই সংশয়ে ছিলেন। কারণ, জ্যোতিবাবু, হরকিষেন সিং সুরজিতের পরামর্শে সিপিএম ভোটের আগেই ঘোষণা করেছিল নির্বাচনের পর তারা কেন্দ্রে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ধর্মনিরপক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাবে। দেখা গেল, বিপর্যয় নয়, মানুষ বিপুল ভোটে জয়ী করেছেন বামপন্থীদের। কারণ, মানুষ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে বুঝতে পেরেছিল তাদের কী করনীয়।
আর নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন, মানুষ কী চাইছে। এই মেলানোটা রাজনীতির আসল কথা। সিপিএমের রাজ্য কমিটির সদস্য, প্রাক্তন মন্ত্রী কান্তি গঙ্গোপাধ্যায় হয়তো এমনই সব বৈপরীত্য, বিভ্রান্তি দেখে তাঁর সদ্য প্রকাশিত বইয়ে খানিক খেদের সঙ্গে বর্তমান নেতাদের সেই কাজের কথাটি আর একবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘পার্টির নেতা হওয়া সহজ, জনগণের নেতা হওয়া কঠিন।’
সেদিন সূর্যবাবু প্রকাশ্যে তৃণমূল কংগ্রেস সম্পর্কে তাঁর দলের অবস্থান তুলে ধরেছেন। ব্যাখ্যা করেছেন। সিপিএমের কোনও প্রথমসারির নেতার মুখে এসব কথা এর আগে কেউ শুনেছেন কি না জানি না। আমার সে সৌভাগ্য হয়নি। কংগ্রেস সম্পর্কে সিপিমের দলীয় অবস্থানের অতীত ও বর্তমান নিয়ে হাজার হাজার শব্দের গবেষণাপত্র তৈরি করে ফেলা যায়। মন্দির-মসজিদ রাজনীতি, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের আগে-পরে সিপিএম নেতারা সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে বলতেন, কংগ্রেস বিজেপির মতো সাম্প্রদায়িক শক্তি নয়। কিন্তু তারা সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে আপস করে। এই অবস্থানে কোনও ভুল নেই। হাজার হাজার উন্মত্ত করসেবক প্রকাশ্যে, দিনের বেলায় কোদাল, হাতুড়ি দিতে কয়েক ঘণ্টা ধরে যেদিন বাবরি মসজিদ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়, দেশের প্রধানমন্ত্রী তখন নরসিংহ রাও। একই সঙ্গে তিনি তখন কংগ্রেস সভাপতি। অভাবনীয় কিছু সেদিন হয়নি। ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২, অযোধ্যায় কী হতে পারে, গোয়েন্দা রিপোর্ট ছিল। কিন্তু নরসিংহ রাও কোনও ব্যবস্থা নেননি। অযোধ্যার অদূরে ফৈজাবাদ থেকে প্রকাশিত হয় হিন্দি দৈনিক জনমোর্চা। সেই কাগজের সম্পাদক শীতলা প্রসাদ সিং বলেছিলেন, ঘটনার সময় তিনি আধ ঘণ্টা পর পর প্রধানমন্ত্রীর অফিসে ফোন করে জানিয়েছিলেন অযোধ্যার পরিস্থিতি। কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্বাধীনতার পর রাজ্যে রাজ্যে বহু অকংগ্রেসি সরকারকে কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার ক্ষমতাচ্যুত করে সংবিধানের ৩৫৬ অনুচ্ছেদের অপপ্রয়োগ করেছে। সেদিন উত্তরপ্রদেশে কল্যাণ সিংয়ের সরকারকে নরসিংহ রাও বরখাস্ত করলে হয়তো ৩৫৬ অনুচ্ছেদের একটা অন্তত সঠিক প্রয়োগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যেত।
তারপরও বিজেপির বিপদের কথা মাথায় রেখে সংখ্যালঘু রাও সরকারকে সংসদে নানাভাবে রক্ষা করে গিয়েছে সিপিএম-সহ বাম দলগুলি। তা নিয়ে দলে বিবাদ কম হয়নি। দফায় দফায় আলোচনার পর সিপিএম দলের রাজনৈতির লাইন চূড়ান্ত করে সেই নয়ের দশকের শেষ প্রান্তে কলকাতার পার্টি কংগ্রেসে। কংগ্রেস ও বিজেপির থেকে সমদূরত্ব রক্ষা, প্রকাশ কারাট প্রমুখের এই লাইনকে নস্যাৎ করে জ্যোতি বসু, সুরজিৎদের লাইনে সিলমোহর দেয় পার্টি—বিজেপিই রাজনীতিতে পয়লা নন্বর প্রতিপক্ষ। বসু, সুরজিৎদের পক্ষ নিয়েছিলেন সিপিএমের আজকের সাধারণ সম্পাদত সীতারাম ইয়েচুরি।
কংগ্রেস ভেঙে তৈরি তৃণমূল সম্পর্কে সিপিএমের পার্টি লাইনটা কী? বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্প্রদায়িকার প্রশ্নে? পার্টির কোনও দলিলে উল্লেখ আছে কি না জানি না, যতটুকু নেতাদের কথাবার্তা থেকে অনুমান করা গিয়েছে, তা হল, তৃণমূলও সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আপসকামী একটি দল। তৃণমূলের অতীত টেনে একথা হয়তো বলাই যায়। অতীত দেখলে বামপন্থীদের সম্পর্কেও একই অভিযোগ তোলা যায়। কিন্তু লড়াইয়ের ময়দানে যখন তৃণমূল ও বিজেপি মুখোমুখি তখন বিজেপির বিরুদ্ধে বামপন্থীদের রাজনৈতিক অবস্থানটি আরও স্পষ্ট হওয়া জরুরি ছিল। সে পথে না হেঁটে বরং সংখ্যালঘু ভোট ফেরৎ পাওয়ার আশায় সদ্য গজিয়ে ওঠা একটি দলের সঙ্গে হাত মেলানোর ফলে বামপন্থীদের সম্পর্কে এমন ধারণা বহু মানুষের মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছে, তারা যে কোনও মূল্যে তৃণমূল সরকারের পতন চেয়েছিল। সেই উদ্দেশ্যকে আড়ালে রেখে সংখ্যালঘু ভোটে ভাঙন ধরিয়ে তারা বিজেপিকে ক্ষমতা দখলের রাস্তা করে দিচ্ছিল। অন্তত সংখ্যালঘুদের বড় অংশের মনে এমন ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছে। বিজেপিকে ঠেকাতে তারা দলে দলে তৃণমূলের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা বিজেপিকে ঠেকাতে চাইছিলেন তাদের জন্য ফলাফল যেমন স্বস্তির সন্দেহ নেই। একইসঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য একটি দুশ্চিন্তার উপাদানও আছে। তাহল, তৃণমূল, বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি একদিকে যেমন সংখ্যালঘুদের আরও একবার ভোট বাক্সের পুঁজি করে তোলা হল, অন্যদিকে বামপন্থীদের সঙ্গে সংখ্যালঘু সমাজের দীর্ঘকালীন, দীর্ঘলালিত সম্পর্ক ভেঙে পড়ল। দেড় দশক আগে সাচার কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের পর জানা গিয়েছিল, বাংলায় মুসলিম সমাজ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পথঘাট, বাসস্থান, চাকরি, ব্যবসার মত মানবোন্নয়নের সব মাপকাঠিতে বাংলা গোটা দেশের মধ্যে পিছিয়ে। সে সব দিনেও সংখ্যালঘুরা একবাক্যে মানতেন, সাম্প্রদায়িক শক্তির মোকাবিলায় এ রাজ্যে বামপন্থীরা তাদের পাশে ঢাল হয়ে আছেন। এই নির্বাচন বামপন্থীদের প্রতি সংখ্যালঘুদের সেই আস্থাও ভেঙেচুরে গেল। আসলে, এবারের নির্বাচনে সিপিএমের রাজনৈতিক লড়াইটি সীমাবদ্ধ ছিল শুধুই তৃণমূল সরকারের পতন নিশ্চিত করাতে। তারা বলেছিল, তৃনমূলকে নির্মূল করতে না পারলে বিজেপির মোকাবিলা সম্ভব নয়।
আসলে, সিপিএম হয়তো কিছুতেই ভুলতে পারছে না দশ বছর আগে তৃণমূল নেত্রীর হাতেই তাদের ক্ষমতার ৩৪ বছরের ইমারতটি ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে। এই নির্বাচনে বিধানসভায় সিপিএম-সহ বামপন্থীরা শূন্য হয়ে গিয়েছে। আমি মনে করি সেটা আসল ক্ষতি নয়। এই নির্বাচনে বামপন্থীদের আসল ক্ষতি তাদের নিজেদের রাজনীতি হাতছাড়া হয়েছে। সেই শূন্যতা ভরাট করা অনেক কঠিন।