
শেষ আপডেট: 5 June 2023 11:25
দ্য ওয়াল ব্যুরো: (Ganges) (Abhijit Mukherjee) বছরপাঁচেক আগের কথা। ২০১৮ সালের শুরু। খুব অল্প হলেও খবর আসা শুরু হল, নজিরবিহীন জল-সংকট দেখা দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। এইরকম খবর এলে যা হয়, আলোচনা শুরু হয়, কিন্তু আবার সবাই ভুলেও যায়। কিন্তু এটায় দেখা গেল, আলোচনা থামার তো লক্ষণ নেই, উল্টে সংকট যেন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। মার্চ মাস নাগাদ দেখা গেল, কেপ টাউন কার্যত সারা পৃথিবীর সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে। কারণ? দক্ষিণ আফ্রিকার বৃহত্তম, সবচেয়ে জনবহুল ও সবচেয়ে পুরনো শহরে জারি করা হয়েছে 'ডে জিরো' সতর্কতা! অর্থাৎ, আর কিছুদিনের মধ্যেই এমন দিন আসবে, যেদিন শহরের কোনও কলে আর জল পড়বে না।
কতদিনের মধ্যে? সেও জানিয়েছিল কেপ টাউন প্রশাসন। মাত্র এক মাস!
কেপ টাউন অত্যন্ত উন্নত ও সমৃদ্ধ শহর। টেবিল পাহাড়ের নিচে, আটলান্টিকের তীর জুড়ে ছবির মত সুন্দর এই দক্ষিণ আফ্রিকার শহর ক্রিকেটের জন্য বাঙালির কাছেও বহুদিনের পরিচিত। এদিকে কয়েক বছরের অনাবৃষ্টিতে গোটা শহর জুড়ে দেখা দিয়েছে জলের জন্য হাহাকার! কেপ টাউন পৌরসভা নির্দিষ্ট করে দিল, বাড়ি বাড়ি আর জলের সাপ্লাই যাবে না। শহর জুড়ে থাকা দেড়শোর কাছাকাছি 'কালেকশন পয়েন্ট' থেকে মাথাপিছু ২৫ লিটার জল নেওয়া যাবে। তাও, দিনে একবার। হাত-মুখ ধোয়া জল ব্যবহার করতে হবে শৌচাগারে। চূড়ান্ত সতর্কতা, কড়াকড়ি, নিয়মকানুনের পর অবশেষে প্রায় এক বছর ধরে এগিয়ে যেতে থাকে 'ডে জিরো', পরে সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়।

জলের ওপর নাম 'জীবন'। আমরা পড়ে আসছি ছোটবেলা থেকে। কিন্তু স্রেফ এইটুকুতে বোঝা যায় না, বিষয়টি কতটা গভীর। পৃথিবীর তিন ভাগ জল। এই ভেবে অনেকেই বেশ নিশ্চিন্তে থাকে। কিন্তু সেই বিপুল জলভাণ্ডারের বেশিরভাগটাই তো সমুদ্রের নোনা জল। কোনও কাজেই লাগে না তা। মিষ্টি জল বা স্বাদু জল যেটুকু যা আছে, তারও বেশিরভাগ দুই মেরুতে জমাট বেঁধে আছে। গলে গেলে ডুবে যাবে আস্ত কেপ টাউন, নিউ ইয়র্ক বা মুম্বই শহরগুলোই। আমাদের হাতে রয়েছে গোটা পৃথিবীর মোট জলের ২ শতাংশেরও কম। যা আমরা রোজ ব্যবহার করি, অক্লেশে নষ্ট করি।
এই জলের সঠিক ব্যবহার, জল সংরক্ষণ ও জল-সম্পদের বিকাশের মত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে তুলে ধরতেই একটি বেসরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে চালু করা হল 'জল সেবক সম্মান' পুরস্কার। রবিবার মধ্য কলকাতার এক পাঁচতারা হোটেলে এই সম্মাননা প্রদান উপলক্ষ্যে উপস্থিত ছিলেন রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচারের সচিব স্বামী সুপর্ণানন্দ, জল সংরক্ষণে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত সমাজকর্মী উমাশংকর পাণ্ডে এবং কলকাতার মার্কিন দূতাবাসের উপ-রাষ্ট্রদূত (কনসাল জেনারেল) মেলিন্ডা পাভেক।

এই সংস্থা, 'ইলেকট্রোস্টিল কাস্টিংস লিমিটেড', এই মুহূর্তে 'ডাক্টাইল আয়রন' পাইপ নির্মাণে সমগ্র উপমহাদেশে অন্যতম শীর্ষস্থানে রয়েছে। স্বাধীনতার পর, ১৯৫৫ সালে, তৎকালীন ভারতের প্রাচীন ও অন্যতম সমৃদ্ধ হুগলি শিল্পাঞ্চলে প্রথম পাইপ বানানোর কারখানা দিয়ে কাজ শুরু তাদের। পরে হুগলি দিয়ে বহু জল গড়িয়েছে, হুগলি শিল্পাঞ্চলের পাটশিল্প ক্রমশ পাততাড়ি গুটিয়েছে। কিন্তু যুগের সঙ্গে আধুনিকীকরণ করে এই সংস্থা আজ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ পাইপ-প্রস্তুতকারক। নবনির্মিত সংসদ ভবনের নিকাশিতেও তাদেরই পাইপ ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানালেন সংস্থার কর্তারা।
এবারের 'জল সেবক সম্মান' পুরস্কারের প্রাপক ছিলেন আইআইটি খড়্গপুরের ভূতত্ত্ববিভাগের অধ্যাপক অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় এবং কলকাতার একটি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) 'নেচার-মেটস'। পুরস্কারের নির্বাচক-মণ্ডলীতে ছিলেন শিল্পী শুভাপ্রসন্ন, সংস্থার অধিকর্তা এম কে জালান ও কলকাতার প্রাক্তন নগরপাল, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশকর্তা সৌমেন মিত্র।
শুভাপ্রসন্ন বলেন, 'জল নিয়ে নতুন করে তো কিছু বলার নেই। প্রতিটি জলের ফোঁটা আমাদের জীবন।' সৌমেন মিত্র বলেন, 'শুধু জল সংরক্ষণ করলেই হবে না, জলের যথাযথ নিকাশি ব্যবস্থাটাও থাকা দরকার। আমি চাই, এবার পরিচ্ছন্ন নিকাশি ব্যবস্থার জন্যও একটা পুরস্কার থাকুক।'
জলবিজ্ঞান বা 'হাইড্রোলজি', জল-সম্পদের যথাযথ ব্যবহার ও সংরক্ষণে অভিজিৎবাবু দীর্ঘদিন কাজ করে চলেছেন। বিশেষ করে জলদূষণ, পানীয় জলে আর্সেনিক ও ফ্লুওরাইডের আধিক্য, ভৌমজলে বিভিন্ন ক্ষতিকর কীটনাশক মিশে যাওয়া, ভৌমজলের সঙ্গে নদী ও পুকুরের জলের অযাচিত মিশ্রণ, নদী অববাহিকার পলিমাটিতে ভূগর্ভস্থ জলের রাসায়নিক চরিত্রের বিবর্তন ইত্যাদি বিষয়ের ওপর ভৌত ও রাসায়নিক গবেষণার জন্য দেশ বিদেশে খ্যাতি রয়েছে তাঁর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা 'এআই'-কে কাজে লাগিয়ে, কম্পিউটার মডেলের সাহায্যে জলের চরিত্র বিশ্লেষণে তিনি এই মুহূর্তে দেশের শীর্ষ বিশেষজ্ঞদের অন্যতম।

মার্কিন কেনটাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট, আড়াই দশকের বেশি কাজ করা, 'শান্তিস্বরূপ ভাটনগর' পুরস্কারে সম্মানিত এই বাঙালি বৈজ্ঞানিক পরে দ্য ওয়ালকে একান্ত সাক্ষাৎকারে বললেন, এই মুহূর্তে জল সংকট নিয়ে আমাদের সবার চিন্তা করা দরকার। দ্য ওয়ালের তরফে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, কলকাতার প্রাণভোমরা গঙ্গা, আমাদের হুগলি নদী, তার লাগামছাড়া দূষণ আমাদের জন্য কতটা ভয়ানক?
অভিজিৎবাবু বললেন, 'খুবই ভয়ের। কারণ নদীর জল আর ভূগর্ভস্থ জল আসলে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। যার ফলে যেটা হবে, যদি গঙ্গার জল দূষিত হয়, তাহলে কিন্তু পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ জলেও সেই দূষণ পৌঁছে যাবে। আবার যদি ভূগর্ভস্থ জল কমে যায়, তাহলে কিন্তু নদীর জলেও প্রভাব পড়বে। এই পুরো পদ্ধতিটার সরাসরি ফল হচ্ছে, গঙ্গা ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছে। আমাদের এস্টিমেট বলছে, শেষ পঞ্চাশ বছরে গঙ্গায় আসা ভৌমজলের ৫৯ শতাংশ শুকিয়ে গিয়েছে। এরকম চলতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জল শুকিয়ে যাবে।'
অভিজিৎবাবুর উদ্বেগেরই শরিক হলেন কলকাতার মার্কিন রাষ্ট্রদূত মেলিন্ডা পাভেক। জানালেন, জল নিয়ে আমেরিকার একটি শীর্ষমানের আলোচনাসভার ব্যাপারে। 'বেসরকারি সংস্থা, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ সবাইকে জল সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে হবে। জল শুধু আমাদের সম্পদ তো নয়, পরের প্রজন্মেরও একইরকম অধিকার আছে। আমেরিকাতেও এই নিয়ে একটি ইভেন্ট হয়, 'ওয়েফটেক', এই বছর সেপ্টেম্বরে হবে, যেখানে জল সংরক্ষণ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিশেষজ্ঞরা আলোচনায় বসবেন। আমি চাইব, আপনারাও সেইখানে যোগ দিন এবং নিজেদের মূল্যবান অভিজ্ঞতাকে ভাগ করে নেবেন।'
খনিজ তেলের চেয়েও আগে শেষ হয়ে যেতে পারে খাবার জল, সতর্ক করলেন আইআইটির বাঙালি বিজ্ঞানী