তিয়াষ মুখোপাধ্য়ায়
আতঙ্ক নয়। সচেতনতা। নিজেকে এবং আশপাশের মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে যেন আতঙ্ক না ছড়িয়ে পড়ে, গুজব না ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের জনবহুল সমাজে এমনটা হলে, তা হিতে বিপরীত হতে পারে।-- এমনটাই বারবার করে বললেন বেলেঘাটা আইডি হাসপাতালের সুপারিন্টেন্ডেন্ট আশিস মান্না। মনে করিয়ে দিলেন, আতঙ্কিত হয়ে পড়লে একাধিক তথ্য বা গুজবের ভিড়ে আসল প্রয়োজনীয় তথ্য বা সতর্কবার্তা অনেক সময়েই চাপা পড়ে যায়।
আশিসবাবু আরও জানালেন, পশ্চিমবঙ্গে প্রথম করোনা রোগীর খবর মেলাটা ছিল সময়ের অপেক্ষা। সংক্রমণ যখন ছড়াতে শুরু করেছে, তখন তা এমনই হয়। এ নিয়ে সতর্ক হওয়া জরুরি। কিন্তু আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। যে পজ়িটিভ রোগীকে মঙ্গলবার ভর্তি করা হয়েছে, তাঁকে বিশেষ আইসোলেশনে রাখা হয়েছে হাসপাতালে। এমনই ভাবে রাখা হয়েছে, হাসপাতালের কারও বা আশপাশের কারও ভয় নেই।
একইসঙ্গে মনে করিয়ে দিলেন, এখন মাস্ক পরারও প্রয়োজন নেই। অনেকেই দামি এন ৯৫ মাস্ক পরে আছেন। বা এমনি মাস্কও ব্যবহার করছেন অনেকে। তার কোনও দরকার নেই বলেই মনে করেন ডক্টর মান্না। তাঁর কথায়, "আমরা যারা চিকিৎসা কর্মীরা, তারাও তো মাস্ক ছাড়াই আছি, ঠিকই থাকব। করোনা-রোগীর ড্রপলেটের মাধ্যমেই একমাত্র এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে, হাওয়ায় ভেসে ছড়াচ্ছে না। তাই অকারণে অপ্রয়োজনীয় মাস্ক পরার কোনও দরকার নেই।"
কিন্তু অতি-সাবধানতা অবলম্বন করতে গিয়ে মানুষ অনেক সময়েই বুঝতে পারছেন না, ঠিক কখন করোনাভাইরাস টেস্ট করাতে হবে? ঠান্ডা লাগলে বা জ্বর হলেই কি তিনি নিজেকে সম্ভাব্য করোনা রোগী ভেবে টেস্ট করাবেন?
ডক্টর জানালেন, হাসপাতালে যা নির্দেশ এসেছে এখনও পর্যন্ত, তাতে পরিষ্কার বলা আছে, কোনও ব্যক্তি যদি কোনও না কোনও ভাবে করোনা-সংক্রামিত এলাকায় যানন বা রোগীর সংস্পর্শে যান, এবং সেই যাওয়ার পরে যদি তাঁর কোনও উপসর্গ দেখা দেয়, তবেই তিনি করোনা-পরীক্ষা করাতে আসবেন। তা নাহলে, কেউ যদি নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে চান শুধু সন্দেহের বশে, সেটা নিজের বাড়িতে হতে পারে কিংবা রাজারহাটের কোয়ারেন্টাইন সেন্টারেও গিয়ে থাকতে পারেন।
তাঁর কথায়, "শুধু সন্দেহের বশে এখানে ভিড় করলে, সত্যিই যাঁদের জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন, যাঁদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাঁদের পরিচর্যা ও চিকিৎসার ক্ষতি হবে।"
যেহেতু এই অসুখ সংক্রামক, তাই অপ্রয়োজনীয় কারণে ঘর থেকে বেরোনো, বা ভিড়ের মধ্যে মেলামেশা বা বাইরে যাওয়া অবশ্যই এড়াতে হবে। তাই বলে আতঙ্কে সিঁটিয়ে থাকা জরুরি নয়। ঘর থেকে বেরোনো যেতেই পারে, তবে ফিরে এসে ভাল করে হাতমুখ ধুয়ে পোশাক বদল করা জরুরি। "কলকাতায় এক জনকে পজ়িটিভ পাওয়া গিয়েছে। ফলে তাঁর সঙ্গে গত কয়েক দিনে যাঁরা মিশেছিলেন তাঁদের পরীক্ষা করা হচ্ছে। কিছু পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে, আরও কিছু বাকি। নিয়ম মেনেই সব করা হচ্ছে, অযথা আতঙ্কের কারণ নেই।"-- বললেন তিনি।
দেখুন, কী বলছেন সুপার।
https://www.youtube.com/watch?v=FeFQh40UnpM
শুধু তাই নয়, করোনাভাইরাস সংক্রমণের জেরে হওয়া অসুখ কোভিড ১৯ নিয়েও খুব বেশি ভয় পাওয়ার কারণ নেই বলেই জানালেন তিনি। তাঁর কথায় "যেমন সর্দি-কাশি-জ্বর হয়, তারই একটু বড় ভাই কোভিড ১৯। তরুণ বয়সের রোগীরা সহজেই সামলে নেবেন। বয়স্কদের বেশি করে সাবধানে থাকতে হবে।"
এ দেশে সংক্রমণের তীব্রতা নিয়ে আশার কথাও শোনালেন তিনি। জানালেন, এ দেশের সূর্যালোকে যেহেতু অতিবেগুনি রশ্মির পরিমাণ বেশি, তা ভাইরাস নষ্ট করতে পারে। এটার পক্ষে কোনও বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ এখনও ঘোষিত না হলেও, যে কোনও ভাইরাসের ক্ষেত্রে সাধারণত এমনটাই ঘটে বলে জানালেন তিনি। যে ড্রপলেটের মাধ্যমে ভাইরাসটির সংক্রমণ হয়, সেই ড্রপলেটও মাটিতে পড়ার পরে খুব বেশি ক্ষণ বাঁচে না। তাঁর কথায়, "আশা করতে পারি, ভারতে অতটা ছড়াবে না এই সংক্রমণ।"
কিন্তু একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দিলেন, কোনও রকম সুযোগই দেওয়া উচিত নয় এই রোগকে। সাবধানতা অবলম্বনে যেন কোনও ভুল না হয়। সর্বোচ্চ সতর্কতা পালন করতেই হবে। ইতিমধ্যেই বিশ্বজোড়া মহামারীর আকার নিয়েছে এই ভাইরাসের সংক্রমণ। এতটুকু গা-এলানোর কোনও সুযোগ নেই। আতঙ্ক সরিয়ে রেখে, সচেতনতা ও সতর্কতা পালন করতে হবে হু-এর গাইডলাইন মেনেই।