দ্য ওয়াল ব্যুরো: কলকাতা ফুটবল ময়দানেও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অবাধ যাতায়াত ছিল। সত্তর দশকে তিনি যখন অভিনেতা হিসেবে মধ্যগগনে সেইসময়ও তিনি মাঠে খেলা দেখতে যেতেন। মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল নিয়ে কোনও ভেদাভেদ করতেন না। বলতেন, আমি তো বাঙালার লোক, দুটি দলই আমার কাছে প্রাণের।
নিজে একসময় কলকাতা মাঠে খেলতেনও, গ্রিয়ার ক্লাবের সেন্টার হাফ ছিলেন। তবে ফুটবলের পাশে ক্রিকেটের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। প্রায়ই ক্রিকেট খেলা নিয়ে তাঁর নানা বিশ্লেষণ শোনা যেত। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় নিয়ে আলাদা আবেগ ছিল তাঁর।
কিংবদন্তি অভিনেতার জীবনাবসানের খবর পেয়েই টুইট করেছেন সৌরভও। দাদাগিরির সেটের একটি ছবি ব্যবহার করে ক্যাপশন লিখেছেন, ‘‘আপনার অবদান বিশাল, আপনি চিরশান্তিতে ঘুমোন।’’
সৌরভের প্রতি সৌমিত্রর ভালবাসা নানাভাবে ফুটে উঠত। প্রায়ই বলতেন, ‘‘সৌরভকে নিয়ে আমাদের অনেক গর্ব, ও দারুণ ব্যক্তিত্ব। আমাদের বাঙালিদের হৃদয় জিতেছে সৌরভও।’’ দাদাগিরির সেটে সৌরভের সঙ্গে সাক্ষাৎপর্বও দারুণ ছিল। সৌরভ প্রশ্ন করেছিলেন, সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর প্রথম আলাপের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল। কোন চরিত্রটি করে তিনি নিজে বেশি তৃপ্তি পেয়েছেন?
সৌরভের এই প্রশ্নের জবাবে বাংলা চলচ্চিত্রের প্রবাদপ্রতীম ব্যক্তিত্ব জানিয়েছিলেন, তিনি অপুর সংসার করে বেশি তৃপ্ত হয়েছিলেন। আর সত্যজিৎ রায় তাঁকে প্রথম দেখে বলেছিলেন, ‘‘আপনি এত লম্বা কেন? আমার এতটা লম্বা দরকার নেই!’’ তার মানে অপুর চরিত্র করতে গেলে দীর্ঘকায় হওয়ার প্রয়োজন ছিল না, সেটাই সত্যজিৎ রায় বোঝাতে চেয়েছিলেন।
সৌরভকে বিশেষ স্নেহ করতেন সৌমিত্র, কিন্তু তাঁর পছন্দের ক্রিকেটার ছিল গ্যারফিল্ড সোবার্স। এই ক্যারিবিয়ান তারকার প্রতি তাঁর বিশেষ শ্রদ্ধা ছিল। ইডেনে ভারত ও ওয়েস্টইন্ডিজ টেস্ট ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন শুধুমাত্র সোবার্সের খেলা দেখার জন্য। ভারতের বুধি কুন্দরনের একটা ক্যাচ ধরেছিলেন সোবার্স, সেদিন গ্যালারিতে সোবার্সের হয়ে গলা ফাটান বিখ্যাত অভিনেতা।
তিনি ক্রিকেট নিয়ে কথা বলতে গেলে সোবার্স ও সৌরভের কথা বলতেনই। তবে সুনীল গাভাসকারের কথাও বলতেন। সৌমিত্র অবশ্য সৌরভের খেলা দেখতে কোনওদিন ইডেনে যাননি। তবে ক্রিকেট নিয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতেন। আর ফুটবলের প্রতি ভালবাসা এসেছিল প্রয়াত কোচ প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (পিকে) জন্যই। পিকে-র সঙ্গে দারুণ সখ্য ছিল সৌমিত্রর সম্পর্ক। চলতি বছরে পিকের মতোই সৌমিত্রও বিলীন হয়ে গেলেন আমাদের কাছ থেকে। কিন্তু রেখে গেলেন তাঁর সমুদ্রসম কাজের ভান্ডার।
মোহনবাগানের ঘরের ছেলে সুব্রত ভট্টাচার্য্যও সৌমিত্র বিদায়ে চরম ব্যথিত। তাঁরা দুইজনই গলফগ্রিনে থাকতেন, সেক্ষেত্রে বিখ্যাত প্রতিবেশীর জীবনাবসানে সুব্রত জানিয়েছেন, ‘‘একজন দক্ষ অভিনেতা চলে গেলেন। আমরা আমাদের জীবনে উত্তম-সৌমিত্রকেই নায়ক হিসেবে দেখেছি, তাই ওঁর বিদায় অপূরণীয় ক্ষতি। কারণ এই বিখ্যাত অভিনেতারা সমাজেরও সেবক ছিলেন।’’