দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঠগ বাছতে কী এবার গাঁ উজাড় হবে! শুরুটা হয়েছিল দেবাঞ্জব দেবকে নিয়ে। এখন পর্যন্ত ৪ জন এরকম জালিয়াত ধরা পড়েছে রাজ্যে। গ্রেপ্তারের আগে যাদের কেউ কোনও সন্দেহই করতে পারেনি।
সোমবার দিল্লিতে ধরা হয়েছে জগাছার শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সে সিবিআই পরিচয় দিয়ে ভাড়ায় নেওয়া নীলবাতি গাড়ি নিয়ে বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াত। সবটাই নাকি স্ত্রীকে খুশি করতে।
সাধারণত মানুষ মিথ্যে বলতে গেলে ঘাবড়ে যায়। উৎকণ্ঠা শুরু হয়। কিন্তু গুণধরদের ধাত আলাদা। স্নায়ু অত্যন্ত শক্তিশালী। যেকারণেই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মিথ্যে বলে মানুষকে বোকা বানাতে সিদ্ধহস্ত এরা। মনোবিদদের ভাষায় এরা প্রত্যেই কম–বেশি ‘ডিজসোশ্যাল পার্সোনালিটি’–র ব্যক্তি। মনোবিদ প্রশান্ত রায় বিষয়টিতে বললেন, ‘এরা প্রত্যেকেই ‘প্যাথলজিক্যাল লায়ার’ এবং ‘মাইথোম্যানিয়াক’। এরা সবসময়ই স্বার্থসিদ্ধির জন্য মিথ্যে বলে থাকে। অ্যান্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি যাদের, তারা বেশিরভাগ সময়েই এই মানসিকতার হয়। এই বিহেভিয়ারটাই যখন গ্রহণযোগ্যতা পেতে থাকে, তখনই অ্যান্টিসোশ্যাল প্রবণতা তৈরি হয়। যদিও এই লায়ারদের মধ্যে ক্রুয়েলিটি বা নৃশংসতা থাকে না। তবে এটা কোনও ডিসঅর্ডার নয়।
ক্রিমিনাল অ্যাক্ট। এরা খুবই ক্রিয়েটিভ এবং কুইক থিংঙ্কার হয়। এটা স্রেফ বদমায়েসি। এরমধ্যে কোনও অবচেতন নেই।’
প্রশান্তবাবু আরও জানান, একটা চমক তৈরি করতে চেয়েই ধীরে ধীরে এই ব্যাপারটা হয়। এটা বাচ্চাদের মধ্যেও দেখা যায়। তাঁর কথায়, ‘এরা জ্যোতিষীদের মতো। মানুষের মনস্তত্ব নিয়ে খেলে। এটা ক্যারিশম্যাটিক একটা ভার্সন এবং মারাত্মক একটা নার্সিসিজম রয়েছে। এরা প্রচুর মানুষকে সাহায্যও করে। সবটাই সেল্ফ লাভ থেকে।’
মানুষ এদের বিশ্বাস করেন কেন? উত্তরে প্রশান্তবাবু জানালেন, এই বিশ্বাসটা স্বাভাবিক। মানুষের মধ্যে বিশ্বাস থাকাটাই সুস্থতার লক্ষণ। বিশ্বাস ভঙ্গের বিষয়টা প্রশাসনের দেখা উচিত।
তবে কারও কারও মতে কিছু মানুষ লোভী এবং সহজে সুবিধা পেতে চায়। এই ধরনের লোকজন সমাজে আছে বলেই ঠগবাজদের জাল বিস্তারে সুবিধা হয়।
মনোবিদ সুজিত সরখেল বিষয়টিতে বললেন, ‘এটা একধরণের স্বভাবদোষ। আমাদের ভাষায় ‘ডিজসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার।’
সাধারণত মানুষের মধ্যে অনেক অপরাধ করার লোভ হয়। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সাধারণ মানুষ ধরা পড়ার ভয়ে করে না। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এদের ভয়ের ব্যাপারটা সেরকম থাকে না। মস্তিস্কের ওই অংশটা তাঁদের খুব একটা কাজ করে না। তবে এটা স্বভাবগত দোষ। আইনের কাছ থেকে ছাড় পাওয়ার কোনও পথ নেই এই প্রতারকদের।’
এই ধরণের লোকজনকে কীভাবে চেনা যায়? সুজিতবাবু বললেন, ‘এটা খুব মুশকিল। এদের ব্যবহার বা চলাফেরা দেখে বোঝা খুব মুশকিল। তবে এরা একটু বেশি জাহির করার চেষ্টা করে। খোঁজখবর নিয়ে তারপরই এদের বিশ্বাস করা উচিত। অন্যায় করতে এদের বুক কাঁপে না। কাজগুলো এজন্য এরা খুব অনায়াসে করতে পারে। যে কারণে মানুষ সহজেই বেকুব বনে যায়।’
তবে মনোবিদদের একাংশের বক্তব্য, ঠাণ্ডা মাথার খুনিও যেমন প্রমাণ রেখে যায়, এই ধরণের প্রতারক, জালিয়াতদেরও কিছু দুর্বল আছে। তারা সর্বদা নিজের ক্ষমতা দেখাতে চায়। যেমন কেউ যদি নিজেকে সিবিআই অফিসার বলে পরিচয় দিয়ে থাকে তো বারে বারেই সে ওই পরিচয়টা বলে থাকে। শুধু তাই নয়, ফোনে কথা বলার সময়ও নিজের প্রভাবশালী পরিচয় বারে বারে শোনাতে থাকে। ফোনের অপরপ্রান্তে লোকটিকেও প্রভাবশালী কেউ বলে বাকিদের সামনে বলার চেষ্টা করে। এই সব আচরণ থেকে বোঝা যায় কিছু গোলমাল আছে। সন্দেহ দুর করার জন্য খোঁজখবর নিয়ে নিলেই আর ঠকতে হয় না।