
শেষ আপডেট: 5 September 2018 13:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রবি ঠাকুর লিখেছিলেন ‘হিংটিংছট।’ কিন্তু ২০১৮ সালের বাংলায় রাজনৈতিক দলগুলির ভিতর ঢুকে পড়ল স্টিং নিয়ে ছটফটানি। তৃণমূল, বিজেপি সহ প্রায় সব দলগুলির ভিতরেই ঢুকে পড়েছে স্টিং আতঙ্ক। আর তা থেকেই সংযত হচ্ছেন রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা।
সম্প্রতি একটি জাতীয় স্তরের টিভি চ্যানেল স্টিং অপারেশন করে বিধাননগর কর্পোরেশনের কাউন্সিলর স্বাতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বামী সোমেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের। যেখানে বিধাননগরের মেয়র ঘনিষ্ঠ ওই কাউন্সিলরের স্বামী খুললাম খুল্লা বাতলে দিচ্ছেন তাঁর এলাকায় ব্যবসা করতে গেলে কোথা থেকে জিনিস পত্র কিনতে হবে এবং কাকে কত টাকা দিতে হবে। কখনও আরাম কেদারায় হেলেন দিয়ে সিগারেটে সুখ টান দিতে দিতে তৃণমূল কাউন্সিলারের স্বামী অভয় দিচ্ছেন, ‘কোনও পুলিশের ঝামেলা হবে না।’ আবার কখনও পোষ্য গোল্ডেন রিট্রিভারের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বলছেন, ‘ওকে (যিনি সোমেনবাবুর কাছে ব্যবসায়ীর পরিচয়ে যাওয়া সাংবাদিককে নিয়ে গিয়েছেন) ২৫ হাজার দিয়ে দেবেন। আমাকে চার লাখ।’
শুধু তো এই ফুটেজ নয়, গত রবিবার অনুব্রত মণ্ডলের ‘গাঁজা কেসে ঢুকিয়ে’ দেওয়ার ফুটেজ নিয়েও বিব্রত শাসক দল। ওইদিন ছিল বীরভূমে জেলা কমিটির সভা। স্বাভাবিকভাবেই এই ধরনের সভায় সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার থাকে না। তাহলে কে তুলল ওই ফুটেজ? অনুব্রত মণ্ডলের যতগুলি অ্যাঙ্গেল থেকে ফুটেজ বেরিয়েছে তার সবকটি মোবাইল ক্যামেরায় তোলা এটা স্পষ্ট। তাহলে কি দলের ভিতরেই বসে আছে স্টিং-এর জুজু?
শুধু তো শাসকদল নয়, এই আতঙ্ক ঢুকে পড়েছে গেরুয়া শিবিরেও। দলীয়সভায় দিলীপ ঘোষ কী বলছেন তাও কয়েকদিন আগে ভাইরাল হয়ে যায়। বিজেপি এখন দলের ভিতর তদন্ত করে দেখছে, যেখান থেকে ওই ক্লিপিংটি তোলা, সেখানে ওই দিনের সভায় কে বা কারা বসেছিল। তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছেন, “অনুব্রত যদি দোষী হয় তাহলে দিলীপ ঘোষ কী?” এক স্টিংকে ঢাকতে আরেক স্টিংকে অস্ত্র করছে দলগুলি।
এরমধ্যে আবার সোমবারের একটি সিসিটিভি ফুটেজকে কেন্দ্র করে দোলা লেগে গিয়েছে ঘাসফুলে। একটি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। যেখানে দেখা যাচ্ছে সদ্য তৃণমূল ছাত্রপরিষদ রাজ্য সভাপতির চেয়ার খোয়ানো জয়া দত্ত চারচাকা গাড়ীর চালকের আসন থেকে নেমে পাশের গাড়িকে দাঁড় করিয়ে ধমক দিচ্ছেন। ফুটেজটি আদৌ সিসিটিভি থেকে নেওয়া নাকি তোলানো সে বিষয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
১৬-র ভোটের আগে আগেই নারদা স্টিং অপারেশনের ফুটেজ প্রকাশ্যে এসেছিল। শাসক দলের বিরুদ্ধে খড়্গহস্তে নেমে পড়েছিল বিরোধীরা। জায়গায় প্রোজেক্টার ভাড়া করে পর্দা টাঙিয়ে দেখানো হয়েছিল ফিরহাদ হাকিম, শোভন চট্টোপাধ্যায়, সৌগত রায়দের টাকা নেওয়ার ফুটেজ। যদিও ভোটে তার খুব একটা প্রভাব পড়েনি। কিন্তু সাময়িকভাবে নড়ে গিয়েছিল শাসকদল। ওই ভোটের সময় চিটফান্ড মামলায় জেলের ভিতর ছিলেন মদন মিত্র। তাঁকেও কামারহাটি থেকে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। নারদার ফুটেজে দেখা গিয়েছিল মদন মিত্রও বিছানায় শুয়ে একেবারে জমিদারি কায়দায় টাকা নিচ্ছেন। তারপরই বৌ বাজারের একটি প্রচার সভা থেকে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, “আগে জানলে আমি প্রার্থী করতাম না।” সেই স্টিং থেকে শিক্ষা নিয়ে কলকাতা কর্পোরেশনে মেয়রের ঘরে ফোন নিয়ে ঢোকায় নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে গিয়েছিল।
শুধু তৃণমূল,বিজেপি নয়, এই আতঙ্ক থেকে বাদ নেই সর্বহারার পেটেন্ট নিয়ে ফেলা সিপিএম-ও। বছর খানেক আগেই রাজ্য স্তরের এক ছাত্র নেতার মদ্যপ অবস্থায় ভিডিও সামনে চলে আসে। দীঘার হোটেলে মদ খেতে খেতে ‘আন্তঃ পার্টি সংগ্রাম’ নিয়ে আলোচনা করছেন। আর পাশে থাকা ‘কমরেড’দের বলছেন, তিনি নাকি প্রস্রাব করলে দল ভেসে যাবে। তা নিয়ে বাম কর্মেদের মহলে হইচইও কম হয়নি। দলে থাকার সময়তেই প্রকাশ্যে চলে এসেছিল কোনও এক তরুণীর সঙ্গে রাজ্যসভার সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভিডিও চ্যাট।
সামনের বছর লোকসভার ভোট। এর মধ্যে যেমন শুরু হয়ে গিয়েছে তৃণমূল-বিজেপির ঘর গোছানোর পালা, তেমনই শুরু হয়ে গিয়েছে সংযত থাকার অতিরিক্ত সতর্কতা। সকলেই বুঝতে পারছেন ভিতর থেকেই এই জিনিস বাইরে যাচ্ছে। যত দিন এগোবে তত বারবে স্টিং-এর বহর। তাই সব দলের নেতারাই প্রায় নিয়ম করে রিহার্সাল করা শুরু করে দিয়েছেন, কী ভাবে স্টিং থেকে রক্ষা পাওয়া যায়!