
শেষ আপডেট: 1 July 2020 11:50
কথিত আছে আষাঢ় মাসে অম্বুবাচীর পরের সপ্তাহে তিস্তানদীর পথ ধরে অধুনা বাংলাদেশ থেকে জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুরে বজরা নিয়ে আসতেন দেবী চৌধুরানী। এরপর তিনি নদীপথেই তিস্তা ধরে করতোয়া নদী পথ ধরে চলে আসতেন বৈকুণ্ঠপুরের খটখটিয়া ঘাটে। সেখানে নৌকা নোঙর করার পরে বৈকুণ্ঠপুরের গভীর বনপথ ধরে শিমুলগুড়ি, ভোটপাড়া প্রভৃতি গ্রামে এসে শিবের পুজো দিতেন। এরপরে গ্রামবাসীরা আমন ধান রোপন করতেন।
সেই রীতিকে সম্মান জানিয়ে আজও রাজগঞ্জের ভোটবাড়ি গ্রামের শিবস্থান ফালাকাটা, ঢেনাকাটা, তুলোকাটার মন্দিরে পুজো দেন ভক্তরা। তারপরে শুরু হয় ধান রোপন করা। পুজোর পাশাপাশি মেলাও হয়। এ বছর অবশ্য করোনার জন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে পুজো হয়েছে। মেলা বসেনি। মুক্তি মোহন্ত নামে এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, “এই পুজো আমাদের করতেই হবে। তাছাড়া আতঙ্ক নিয়ে ঘরে থাকতে আর ভাল লাগছে না। তাই মন্দিরে এসে পুজো দিয়ে গেলাম।”
মন্দির কমিটির সদস্য সুভাষ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “একশো বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসছে এই পুজো। স্থানীয় কৃষকরা এই পুজো না দিয়ে আমন ধান চাষ করা শুরু করেন না। এবারে মহামারীর কারণে আমরা কোনও প্রচার করিনি। তবুও মানুষ আতঙ্ক ভুলে এখানে এসেছেন। দুপুর থেকে শুরু হয়েছে পুজো। চলবে রাত পর্যন্ত। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই সকলেই পুজো দিচ্ছেন। আমরা মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে মাস্ক, স্যানিটাইজার প্রভৃতি বিতরণ করেছি।”
জলপাইগুড়ির গবেষক উমেশ শর্মা ব্যাখ্যা করলেন ফালাকাটা, তুলাকাটা ও ঢেনকাটার পুজো আসলে কী। তিনি বলেন, “এটি আসলে তরাই ও ডুয়ার্স অঞ্চলের শিবের পুজো। আষাঢ় মাসে অম্বুবাচী হয়ে যাওয়ার পরে এই পুজো করেন স্থানীয় কৃষকরা। এই পুজোর পরে তাঁরা আমন ধান চাষ করেন। পুজোর উপকরণ হিসাবে থাকে আটিয়া কলা, আতপচাল, আতপ চিঁড়ে, বিভিন্ন ফলমূল। কোথাও পায়রা বলি দেওয়া হয় আবার কোথাও পায়রা দিয়ে পুজো দেওয়া হয়।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, এই পুজোর সঙ্গে দেবী চৌধুরানীর সম্পর্ক। তিনি জানান, বৈকুণ্ঠপুরের বনাঞ্চল ও তিস্তাপারের বিভিন্ন এলাকায় দেবী চৌধুরানীর নিয়মিত যাতায়াত যে ছিল তার বিভিন্ন প্রমাণ পাওয়া গেছে। আসলে মানুষ যখন দেবতায় উন্নীত হয়ে যান তখন তাঁর প্রতি সম্মান জানাতে সাধারণ মানুষ বিয়ে, পৈতে-সহ বিভিন্ন শুভ কাজের আগে তাঁর পুজো করে থাকেন। দেবী চৌধুরানী তেমনই এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। পরবর্তী কালে তিনি দেবী হিসাবে পূজিতা হতে শুরু থাকেন। এখানকার খটখটিয়া ঘাটে বজরা নৌকা পাওয়া গেছে। তাই এই এলাকার মানুষ তাঁকে সম্মান জানিয়ে পুজো দিয়ে তারপরে চাষবাস শুরু করেন।