দ্য ওয়াল ব্যুরো: চিকিৎসায় গাফিলতিতে রোগী মৃত্যু যেন শহর কলকাতার নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে গিয়েছে। এই তালিকায় এ বার নাম জড়ালো আলিপুরের এক নাম করা বেসরকারি হাসপাতালের। এবং একজন নন, দু'জন প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে ওই হাসপাতালে। দুই পরিবারেরই দাবি, সন্তানের জন্ম দেওয়ার পরে ভালোই ছিলেন নতুন মায়েরা। সুস্থ ভাবে পরিবারের সঙ্গে কথাও বলেছেন। কিন্তু আচমকা দু'জনকেই ভেন্টিলেশনে দিতে হয়। আর তারপরেই সব শেষ। প্রতি বারের মতোই এ বারও দায় এড়িয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শুধু তাই নয়, অভিযোগ হাসপাতালের তরফে অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করা হয়েছে ওই দুই পরিবারের সঙ্গে। এমনকী তাঁদের হুমকির জন্য একটি পরিবার মৃতার নাম-পরিচয় পর্যন্ত জানাতে ভয় পাচ্ছে। কারণ সদ্যোজাত যমজ সন্তানরা এখনও হাসপাতালে রয়েছে। তাদের আশঙ্কা হাসপাতালের বিরুদ্ধে এখন মুখ খুললে ক্ষতি হতে পারে নবজাতকদের।
প্রথম ঘটনা-
বছর ২৯-এর পৌলমী ভট্টাচার্য সান্যাল। শুক্রবার ভর্তি হয়েছিলেন আলিপুরের ওই বেসরকারি হাসপাতালে। সেদিন বিকেলেই জন্ম দেন ফুটফুটে এক কন্যা সন্তানের। পৌলমীর স্বামী জয়ন্ত সান্যাল জানিয়েছেন, তাঁর স্ত্রী একেবারেই সুস্থ-স্বাভাবিক ছিলেন। পরিবারের সকলের সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবে কথাও বলেছিলেন। এমনকী রাত ১১টা ৫০ পর্যন্ত হোয়াটসঅ্যাপেও অনলাইন ছিলেন পৌলমী। বন্ধুদের মেয়ে হওয়ার সুখবরও জানিয়েছিলেন তিনি। এরপর ভোরের দিকে হাসপাতাল থেকে ফোন যায় পরিবারের কাছে। জানানো হয়, ভোর চারটে নাগাদ ভেন্টিলেশনে দেওয়া হয়েছে পৌলমীকে। হাসপাতালের তরফে আরও বলা হয়, পৌলমীর অবস্থা আশঙ্কাজনক।
মৃতার স্বামী জয়ন্ত বলেন, "সকালে হাসপাতালে গেলে জানতে পারি আমার স্ত্রী মারা গিয়েছেন। অনেক ডাক্তার এসে আমাদের বোঝাতে শুরু করেন কেন ওঁর মৃত্যু হয়েছে। তখনই জানতে পারি রাত বারোটার পর একাধিকবার অপারেশন থিয়েটারেও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ওঁকে। এবং অস্ত্রোপচারও হয়। অথচ কেউ আমাদের কিছু জানালো না, অনুমতি নিল না। যে মেয়েটা রাত ১১টা ৫০ পর্যন্ত ফোন ঘেঁটেছে, রাত বারোটার পর কী এমন হলো তাঁর, যে পরিণতি একেবারে মৃত্যু!"
পরিবারের তরফে অভিযোগ করা হয়, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই মৃত্যু হয়েছে পৌলমীর। হাসপাতালের গাফিলতিতেই এ সব হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। হাসপাতাল অবশ্য এই অভিযোগ মানতে চায়নি। আর সেই জন্যেই প্রশ্ন তুলেছেন মৃতার স্বামী জয়ন্ত। তাঁর অভিযোগ, "আমি জানতে পারি রাতেই ওঁর সিজারের সেলাই থেকে রক্ত বেরচ্ছিল। রক্তক্ষরণের ফলেই হিমোগ্লোবিন অসম্ভব তাড়াতাড়ি নেমে যায়। শ্বাসকষ্ট শুরু হয় ওঁর। এরপরেই আমাদের কাউকে না জানিয়ে একাধিক অপারেশন করেন ডাক্তাররা।" কিন্তু কেন সিজারের সেলাই থেকে রক্ত বেরলো? তাহলে কি ঠিক ভাবে সেলাই করা হয়নি? পৌলমীর পেটের ভিতর কিছু রয়ে গিয়েছিল? এই প্রশ্নই এখন ঘুরছে জয়ন্ত এবং তাঁর পরিবারের মনে। এখানেই শেষ নয়। এরপর ডেথ সার্টিফিকেট নিতে গেলেও রোগীর পরিবারের সঙ্গে ঝামেলা বাঁধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। ১২ হাজার টাকার প্যাকেজ বেড়ে আচমকাই হয়ে যায় ১৯ হাজার।
গোটা ঘটনায় স্থানীয় থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন পৌলমীর পরিবার। এই নিয়ে রাজ্য হেলথ রেগুলেটরি কমিশন, মেডিক্যাল কাউন্সিল এবং মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ হবেন বলেও জানিয়েছেন পৌলমীর স্বামী জয়ন্ত সান্যাল। সকলের একটাই দাবি হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখুক পুলিশ। তাহলেই সব স্পষ্ট হবে। জানা যাবে পৌলমীর মৃত্যুর আসল কারণ। পুলিশ যেন আসল অপরাধীকে খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি দেয়, সেই দাবিই তুলেছে পৌলমীর পরিবার।
দ্বিতীয় ঘটনা-
পৌলমীর মৃত্যুর পরেই আরও এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে ওই হাসপাতালেই। শুক্রবারই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন চন্দননগরের বাসিন্দা ওই তরুণী। সেদিনই জন্ম দেন যমজ সন্তানের। আচমকাই শনিবার সকাল সাতটায় তরুণীর বাড়িতে ফোন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। ভেন্টিলেশনে দিতে হবে। পরিবারের তরফে যেন হাসপাতালে গিয়ে বন্ডে সই করে দেওয়া হয়। পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে পৌঁছে আমরা গিয়ে দেখি মেয়েকে ভেন্টিলেশনে দেওয়ার তোড়জোড় চলছে।
সেই সময় তরুণীর মা তাঁর গায়ে হাত দিয়েই আঁতকে ওঠেন। দেখেন মেয়ের সারা শরীর নিস্তেজ এবং বরফের মতো ঠাণ্ডা। বুঝতে পারেন সম্ভবত তরুণী মারা গিয়েছেন। পরিবারের দাবি, তরুণীর মা চিৎকার করে ওঠায় চিকিৎসকরাও একপ্রকার স্বীকার করে নেন যে রোগী মারা গিয়েছে। রোগীর পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ আনলে হাসপাতালের তরফে সাফ বলে দেওয়া হয়, "যান থানায় গিয়ে কমপ্লেন করুন। যা পারেন করে নিন।"
এই তরুণীর যমজ সন্তান এখনও ওই হাসপাতালেই ভর্তি। হাসপাতালের তরফে জানানো হয়েছে, দিন দশেক আরও রাখতে হবে বাচ্চাদের। এর মধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এমন রূপ দেখে যারপনাই হতবাক মৃতার পরিবার। ভয়ে তাঁরা নিজেদের পরিচয়টুকুও জানাতে পারছেন না কাউকে। সূত্রের খবর, এমনকী পুলিশেও অভিযোগ জানাননি তাঁরা।
একই হাসপাতালে পরপর মৃত্যু হয়েছে দুই প্রসূতির। দুই পরিবারেরই অভিযোগ, চিকিৎসায় গাফিলতির ফলেই মৃত্যু হয়েছে রোগীদের। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গোটা ঘটনার দায় এড়িয়ে গিয়েছে। বরং তাঁদের দাবি, চিকিৎসা ঠিকঠাকই হয়েছিল।