দ্য ওয়াল ব্যুরো: দিদি কাটমানি ফেরত দেওয়ার কথা বলতেই গ্রাম-মফস্বলে জনরোষ শুরু হয়ে গিয়েছে তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু সে সবটাই গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি কিংবা পুরসভা স্তরের নেতাদের। এ বার খোদ কলকাতা শহরের বুকে বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন সিঁথির এক ব্যবসায়ী। সুমন্ত্র চৌধুরী ওরফে নান্তিবাবু। ওই প্রোমোটারের অভিযোগ, তিনি গত সাত-আট বছরে কলকাতার দু’নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলর তথা রাজ্যসভার সাংসদ শান্তনু সেনকে ৪০-৪২ লক্ষ টাকা তোলা দিয়েছেন।
সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে ব্যবসায়ী নান্তিবাবু বলেছেন, “২৫ হাজার টাকা দিয়ে শান্তনু সেনের তোলাবাজির হাতেখড়ি।” তিনি আরও বলেন, দিদির অভয়বাণী পেয়েই মুখ খুলছেন। এতদিন খানিকটা ভয়েই কুলুপ এঁটেছিলেন মুখে। তিনি আরও বলেন, “প্রথম যখন ২৫ হাজার টাকা নিলেন, তখন বলেছিলেন গাড়ি, মাইক ভাড়ার জন্য টাকা লাগে তো! তাই! তারপর ওঁর সিস্টেম হয়ে গেল কাঠা পিছু দু’লক্ষ টাকা।”
গোটা প্রক্রিয়াটার বর্ণনা দিতে গিয়ে ওই প্রমোটার বলেন, “কাজ হোক চাই না হোক, টাকা দিতেই হতো। চার কাঠা জমি হলে আট লক্ষ টাকা। এবং সেটা নিজের মোবাইলে সুন্দর করে হিসেব রাখতেন ডাক্তার শান্তনু সেন। দু’লক্ষ জমা হলে বাকি থাকত ছয়। তারপর আবার দুই জমা করলে পড়ে থাকত চার। এ ভাবে আস্তে আস্তে শূন্য হয়ে যেত!”
শুধু তো তোলার অভিযোগ নয়। রাজ্যসভার সাংসদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট রাজ চালানোর অভিযোগও তুলেছেন এই ব্যবসায়ী। তাঁর দাবি, “সিঁথির বুকে সিন্ডিকেট শুরু করেছিলেন শান্তনু সেনই। আমার পরিবারের ৭৫ বছরের ইট-বালির ব্যবসা। তবু কোনও কাজ করতে গেলে ওই সিন্ডিকেটের থেকেই মাল নিতে হতো।” সেই সিন্ডিকেট কেমন? ব্যবসায়ীর অভিযোগ, “দাম বেশি, কোয়ালিটি খারাপ, মাপ কম। সব দিক থেকেই মারত।”
https://www.youtube.com/watch?v=WruzyhYz_d8&feature=youtu.be
শান্তনু সেন শুধু রাজ্যসভার সাংসদ নন। প্রখ্যাত চিকিৎসকও বটে। একই সঙ্গে তিনি সর্বভারতীয় মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতিও। তাঁর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ নিঃসন্দেহে বড় অভিযোগ। এ ব্যাপারে কী বলছেন ডাক্তারবাবু? দ্য ওয়াল-এর পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি একজন চিকিৎসক। আইএমএ-এর সভাপতি। সমাজে আমার একটা সম্মান আছে। যিনি এই অভিযোগ করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করব।” শান্তনুবাবুকে প্রশ্ন করা হয়, নান্তিবাবু তো হিসেব দিয়ে বলছেন কোন সালে আপনাকে কত টাকা দিয়েছেন! জবাবে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ বলেন, “আমি আবার বলছি। ওঁর সঙ্গে আদালতে দেখা হবে। এর বেশি আর কিছু বলব না।”
শুধু তো শান্তনু নয়। ব্যবসায়ীর অভিযোগ, এখন যিনি ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পুষ্পালী সিনহা, তাঁর বিরুদ্ধেও। ওই প্রমোটার বলেছেন, তিনি নিজে হাতে করে কোনও টাকা পুষ্পালীদেবীকে না দিলেও তাঁর ভাই এবং ভাইপো লাখ তিনেক টাকা দিয়ে ফেলেছেন। একই সঙ্গে তাঁর অভিযোগ, উত্তর কলকাতার কালীচরণ ঘোষ লেনে তাঁদের একটি পুরনো বাড়ি ভাঙা হচ্ছিল অক্ষয়তৃতীয়ার সময়ে। তখন বর্তমান কাউন্সিলর ফোন করে হুমকি দেন। তিনি বলেন, “আমায় ফোনে বললেন, কার অনুমতি নিয়ে ভাঙছেন? আমি তাঁকে বললাম, ফণী ঝড়ের সময়ে থানা থেকে বলেছিল বাড়ি ভাঙতে। পুরসভার চিঠি আছে বিপজ্জনক বাড়ি বলে। আর ভাড়াটেদের সঙ্গে সব মিটমাট করে নিয়েই বাড়ি ভাঙা হচ্ছে। তখন উনি টাকা চান। বলেন, ছ’কাঠা জমির জন্য কাঠা প্রতি দু’লক্ষ টাকা হিসেবে মোট ১২ লক্ষ টাকা দিতে হবে। আমি বলি দেব না।”
যোগাযোগ করা হয়েছিল পুষ্পালীদেবীর সঙ্গেও। সাংবাদিক পরিচয় দিতেই কাউন্সিলর স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “আমি মিডিয়ার সঙ্গে কোনও ব্যাপারে কোনও কথা বলব না।”
কাটমানি খাওয়া নিয়ে তোলপাড় শাসক দল। তোলপাড় রাজ্যের রাজনীতি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে নদিয়ার সাংগঠনিক সভাতেও এ নিয়ে নেতাদের ধমক দিয়েছেন। কিন্তু যত সময় গড়াচ্ছে, যা যা অভিযোগ সামনে আসছে, পর্যবেক্ষকদের মতে তাতে ঘুম ছুটতে পারে তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের। আর বিরোধীরা বলছেন, এ তো দুর্নীতির পাহাড়ের চূড়া মাত্র।