দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিপদের দিনে ফের ডাক পড়ল শুভেন্দু অধিকারীর। গোটা জঙ্গলমহলের দায়িত্ব দেওয়া হল তাঁর কাঁধে। উল্টোদিকে যুব তৃণমূল সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়িত্ব কমালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হল বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার দায়িত্ব থেকে। হাতে রইল ভোটার লিস্ট। শনিবার সাংবাদিক বৈঠকে মমতা জানিয়েছেন, অভিষেক এ বার থেকে ভোটার লিস্টের কাজ দেখবেন। সঙ্গে অন্যান্য দায়িত্ব।
পঞ্চায়েত নির্বাচনে সারা জঙ্গলমহলে তৃণমূলের পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়ার পর শুভেন্দুকেই দায়িত্ব দিতে চেয়েছিলেন দিদি। কিন্তু রাজি হননি শুভেন্দু। বলেছিলেন, চারটি জেলা ও আটটা আসনের দায়িত্ব তাঁর উপর। তাঁর পক্ষে জঙ্গলমহলের দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এ বার কোনও কথা শুনলেন না তৃণমূলনেত্রী। লোকসভায় জঙ্গলমহল তৃণমূল শূন্য হয়ে যাওয়ার পরে ফের শুভেন্দুর উপরেই দায়িত্ব চাপালেন তিনি।
জঙ্গলমহলে তৃণমূলের সংগঠন করার মূলে শুভেন্দুই। পশ্চিমাঞ্চলের পাড়া-পাড়া, গ্রাম-গ্রাম, জঙ্গল-জঙ্গল হাতের তেলোর মতো চেনেন নন্দীগ্রামের বিধায়ক। একটা সময় তিনিই ছিলেন এই অঞ্চলের দায়িত্বে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পরই শুভেন্দুকে সরিয়ে দেওয়া হয় জঙ্গলমহল থেকে। তৃণমূলের অনেকে বলেন, সেই সময় দলের সেকেন্ড ইন কম্যান্ড মুকুল রায়ের পরামর্শেই শুভেন্দুর হাত থেকে জঙ্গলমহল নিয়ে নিয়েছিলেন মমতা। ভারতী ঘোষকে পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার করে পাঠানোর পর কার্যত তিনিই ছিলেন জঙ্গলমহলে তৃণমূলের শেষ কথা। কোথায় কে ব্লক সভাপতি হবেন, কার জায়গায় কাকে বসানো হবে সবই ঠিক করতেন তিনি। মেদিনীপুরে ভারতীকে দায়িত্ব দিয়ে বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় অভিষেককে। ঝাড়গ্রাম ও মেদিনীপুরের পর্যবেক্ষক করা হয় সুব্রত বক্সিকে। পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভরাডুবির পর ঝাড়গ্রামে বিশেষ পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয় পার্থ চট্টোপাধ্যায়কেও। কিন্তু এই নির্বাচনে দেখা গেল তাঁরা সবাই ডাহা ফেল। তাই ফের শুভেন্দুর শরনাপন্ন হতে হল মমতাকে। কারণ দিদি জানেন, পারলে শুভেন্দুই পারবেন। অন্য কেউ নন।
একাধিক জেলার সংগঠনে দায়িত্ব বদলেছেন মমতা। ঝাড়্গ্রামের জেলা সভাপতি করা হয়েছে ওই কেন্দ্রের পরাজিত প্রার্থী বীরবাহা সরেনকে। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার সভাপতি বিপ্লব মৈত্রকে। তাঁর জায়গায় বসানো হয়েছে বালুরঘাটের পরাজিত প্রার্থী তথা নাট্যকার অর্পিতা ঘোষকে। হুগলিতে চেয়ারম্যান করা হয়েছে রত্না দে নাগকে। হুগলি কেন্দ্রে প্রার্থী ছিলেন বর্ষীয়ান রত্না। বিজেপি প্রার্থী লকেট চট্টোপাধ্যায়ের কাছে হারতে হয়েছে তাঁকে। এ বার তাঁকে সংগঠনের দায়িত্ব দিলেন নেত্রী। সেই সঙ্গে দিলীপ যাদব এবং প্রবীর ঘোষালকে কনভেনর করা হয়েছে হুগলিতে। বিষ্ণুপুর লোকসভা এলাকার সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন পরাজিত প্রার্থী শ্যামল সাঁতরা এবং বাঁকুড়া কেন্দ্রের সভাপতি করা হয়েছে শুভাশিস বটব্যালকে।
নদিয়া জেলার দুটো কেন্দ্রকে ভাগ করে দু’জনকে সভাপতির দায়িত্ব দিয়েছেন মমতা। রাণাঘাটে শঙ্কর সিং এবং কৃষ্ণনগরে মহুয়া মৈত্রকে। মলয় ঘটককে সরিয়ে পশ্চিম বর্ধমানের সভাপতি করা হয়েছে আসানসোলের মেয়র জিতেন তিওয়ারিকে। বদল করা হয়েছে উত্তর দিনাজপুর জেলার সভাপতিও। রায়গঞ্জের পরাজিত প্রার্থী কানহাইয়ালাল আগরওয়ালকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ওই জেলায়। মালদহ উত্তর ও দক্ষিণের সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন দুই পরাজিত প্রার্থী মৌসম বেনজির নুর এবং মোয়াজ্জেম হোসেন। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলার সভাপতি সুব্রত সাহাকেও। তাঁর জায়গায় দায়িত্ব পেয়েছেন মুর্শিদাবাদের জয়ী প্রার্থী আবু তাহের।
অনেকে মনে করেছিলেন অরূপ বিশ্বাসকে উত্তরবঙ্গের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে পারেন দিদি। কিন্তু তাঁকে রেখে দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে রাজ্য তৃণমূলের পক্ষে হাওড়া, হুগলি ও দুই বর্ধমানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ফিরহাদ হাকিমকে। এ ছাড়াও তিন পরাজিত প্রার্থী দীনেশ ত্রিবেদী, বিজয় চন্দ্র বর্মন ও অমর সিংরাইকে বিভিন্ন স্বাশাসিত সংস্থার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এ দিনের বৈঠক থেকে। উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন পর্ষদের দায়িত্বে অমর রাই, শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান বিজয় চন্দ্র বর্মন এবং এইচআরবিসি-র চেয়ারম্যান দীনেশ ত্রিবেদী।
এখন দেখার এই সাংগঠনিক ঝাঁকুনিতে তৃণমূলের হারানো জমি কতটা শক্ত হয়।