দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনা আবহে দুর্গা পুজো এবার একদম অন্যরকম। শহর থেকে শহরতলি, সেই সাজো সাজো রবটাই ছিল না কোথায়। করোনার প্রভাবে আড়ম্বরে খামতি ছিল রায়গঞ্জের রাজবংশী সম্প্রদায়ের পুজোতেও।
রায়গঞ্জের খাদিমপুর এলাকার দুর্গা পুজো এমনিতেই সব জায়গার থেকে আলাদা। নবমীর দিন প্রতি বছর এখানে ঘটা করে মেলা বসে। এলাহি তার আয়োজন। সঙ্গে উপচে পড়া ভিড়। তবে এবার করোনার সংক্রমণ রুখতে বন্ধ সবকিছু। বসেনি মেলা। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার খাতিরে সতর্ক সকলে। ভিড় জমাননি স্থানীয়রাও।
রায়গঞ্জ থানার কমলাবাডড়ি ২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের খাদিমপুর এলাকায় নিয়ম মেনে প্রতি বছর দুর্গা পুজোর দশমীর দিন থেকে শুরু হয় রাজবংশী সম্প্রদায়ের দুর্গা পুজো। তিন দিন ধরে সেই পুজো চলে। এখানে দেবী দুর্গা পূজিত হন বলাই চন্ডী রূপে। তবে মায়ের সঙ্গে থাকে না অসুর। দশ হাতের বদলে এখানে মৃন্ময়ী মায়ের চারটি হাত। আর মায়ের আশেপাশেই থাকেন তাঁর চার সন্তান, কার্তিক-গণেশ-লক্ষ্মী এবং সরস্বতী। অসুর না থাকলেও থাকে সব ঠাকুরের বাহন।
দশমীর রাতে এখানে পুজো শুরু হয়। কেবলমাত্র প্রথম দিনই পুজো হয়। পরের দিন হয় বলাই চণ্ডীর পালা গান। নানা জেলার মানুষ ভিড় করেন এই পালা গান শোনার জন্য। তৃতীয় দিন এলাকা জুড়ে বসে বিশাল মেলা। সেখানে আয়োজন থাকে বিশেষ যাত্রাপালার। থাকে নাগরদোলা। মেলায় বসে নানা রকমের দোকানপাট। এর মধ্যে অন্যতম লক্ষ্মী ঠাকুরের দোকান। ছোট ছোট দোকানে লক্ষ্মী প্রতিমা আর পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। মায়ের পুজো সম্পন্ন করে এই মেলা থেকেই রাজবংশী সম্প্রদায়ের মহিলারা নিজেদের বাড়ির জন্য লক্ষ্মী প্রতিমা কিনে নিয়ে ফেরেন।
দীর্ঘদিন ধরেই এই ছিল রাজবংশী সম্প্রদায়ের দুর্গা পুজোর রীতিনীতি। তবে এবার করোনার গ্রাসে বদল হয়েছে সবকিছুর।এদিকে এই বছরেই চন্ডী মন্দিরটি অনেক বড় এবং পাকা করে তৈরি করেছেন স্থানীয় গ্রামবাসীরা। সোমবার সেখানেই পুজো হয়েছে নিয়ম-নিষ্ঠার সঙ্গে। তবে প্রশাসনের অনুরোধে রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষরা মন্দির চত্বরে ভিড় করেননি। সেই সঙ্গে কোভিড সংক্রমণ যাতে আর না ছড়ায় তার জন্য সতর্ক ছিলেন সকলেই। সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স বজায় রাখার জন্য গত মঙ্গলবার হয়নি বলাই চণ্ডীর পালাগান। বুধবার মেলার মাঠও ছিল ফাঁকা।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, দেবী বলাই চণ্ডীর পুজো হয়েছে প্রতিদিনই। নিয়ম-নিষ্ঠা, আচার-অনুষ্ঠান এবং রীতিনীতি পালনে কোনও খামতি ছিল না। খালি সব আয়োজনে হাজির ছিলেন হাতেগোনা কয়েকজন। রায়গঞ্জ ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রাম খাদিমপুরের রাজবংশী সম্প্রদায় মানুষজন আত্মনিয়ন্ত্রণ করে, সংযত থেকে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে পুজো করেছেন।
খাদিমপুর পুজো কমিটির সম্পাদক সুরেন্দ্রনাথ বর্মণ বলেছেন, "পুজোর আগেই আমরা গ্রামবাসীরা শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে মাঠে বসে মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিই, মহামারী থেকে সমাজকে বাঁচানোর জন্য আমাদের সরকারি নিষেধ মানা উচিত। তাই এবার মায়ের পুজোয় পুজো প্রাঙ্গণে বেশি ভিড় না করার জন্য এলাকাবাসীর কাছে আহ্বান জানিয়েছিলাম। কথা শুনেছেন গ্রামবাসীরা। মেনেছেন কোভিড গাইডলাইন। পাশাপাশি মানুষের মুখে মুখেও প্রচার হয়েছে। দূর-দূরান্তের রাজবংশী সম্প্রদায়ের লোকেরা এবার পুজোর মাঠে আসেননি। কয়েকশো বছরের পুরনো ঐতিহ্যশালী এই পুজোর ইতিহাসে এরকম আড়ম্বরহীন উৎসবের কথা কেউ কোনওদিন শোনেননি। তবে আমরা আশা করছি আবার মায়ের পুজো জাঁকজমক করেই হবে।"