দ্য ওয়াল ব্যুরো: দু’জনেরই ভোট করানোর পাঠ শেখা তৃণমূলে। আর সেই বিদ্যা দিয়েই এ বারের লোকসভায় তৃণমূলকে বধ করলেন দু’জন। নিজেদের মেশিনারি দিয়ে। নিজেদের দাপটে।
উত্তরবঙ্গে নিশীথ প্রামাণিক আর দক্ষিণবঙ্গে অর্জুন সিং।
ষোলর বিধানসভার পর থেকেই কোচবিহারে বিরোধী বলতে কিছু ছিল না। শুধুই তৃণমূল। কিন্তু সেই জেলাতেই রোজ লেগে থাকত সংঘর্ষ। তৃণমূল বনাম তৃণমূল। মাদার বনাম যুব। তৃণমূলের কোচবিহার জেলা সভাপতি তথা উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষের লোকজন ভয়ে সিঁটিয়ে থাকত, এই বুঝি নিশীথের লোক মারল। নিশীথ তখন তৃণমূলের যুব নেতা। জেলা সভাপতি নন। কিন্তু তাঁর কথাতেই চলত সংগঠন। তার উপর গোটা দল জানত নিশীথের মাথায় রয়েছে যুব তৃণমূল সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত। ফলে সমঝে চলতেন মাদারের নেতারাও। দিদি কত চেষ্টা করেছেন কোন্দল থামানোর! কিন্তু বারবার ফেল করেছেন।
সেই নিশীথকেই মাস চারেক আগে বহিষ্কার করে তৃণমূল। অনেকে বলেন, রবি ঘোষের কথাতেই শেষ পর্যন্ত নিশীথকে দল থেকে তাড়ানো হয়। কিন্তু বেশি সময় নষ্ট করেননি নিশীথ। ঠাণ্ডা মাথার, কম কথার নিশীথ পুরো টিম নিয়ে সোজা চলে যান দিল্লিতে। মুকুল রায়ের ঠিকানায়। তারপর একেবারে লোকসভার টিকিট নিয়ে জেলায় ফেরেন।
প্রথমে একটু বিক্ষোভ হয়েছিল। কিন্তু তা সাময়িক। নিশীথ জেলায় পা রাখতেই সব উবে যায়। তারপর শুরু অপারেশন লোকসভা। মহল্লায় মহল্লায় যাঁরা এতদিন ভোট করাতো, নিশীথ কার্যত চুম্বক হয়ে টেনে নেন নিজের দিকে। শীতলখুচি থেকে মাথাভাঙা, দিনহাটা থেকে নাটাবাড়ি- সর্বত্র নিজের মতো করে ঘুঁটি সাজান নিশীথ। ভোটের দিন তৃণমূলকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়ে দেন। যে রবি ঘোষ অন্য ভোটে সকাল দশটায় মার্জিন বলে দিতেন, তাঁকেই এ বার দেখা যায় দিদিকে ফোন করে নালিশ করছেন, ‘দিদি, বিএসএফ খুব ডিস্টার্ব করতাসে!” রবি ঘোষ যখন হন্যে হয়ে জেলার এ প্রান্ত ও প্রান্ত দৌড়চ্ছেন, নিশীথ তখন বিজেপি জেলা দফতরে বসে কন্ট্রোল করছেন বাকিটা। মাঝে মাঝে বেরিয়েছেন, তারপর আবার ফিরে এসেছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, সে দিনই বোঝা গিয়েছিল তৃণমূলের হাত থেকে খেলা বেরিয়ে গিয়েছে। যে জেলায় এই ক’দিন আগেও তৃণমূল ছাড়া অন্য কিছু দেখা যেত না, এখন সেখানে তৃণমূলকেই ঠিক মতো দেখা যাচ্ছে না। বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কোচবিহারের প্রচারে গিয়ে একাধিক তোপ দেগেছিলেন নিশীথের বিরুদ্ধে। অভিযোগ করেছিলেন, নিশীথ নাকি স্মাগলার, বাংলাদেশ থেকে সোনা এনে অন্যত্র পাচারের সঙ্গে যুক্ত, ইত্যাদি প্রভৃতি। কিন্তু কোচবিহারে জিতল বিজেপি। উড়ল গেরুয়া ঝাণ্ডা। মাইলের পর মাইল এলাকায় নাম নিশান চুকে গেল তৃণমূলের। সৌজন্যে নিশীথের ব্লুপ্রিন্ট। একেবারে ঠান্ডা মাথায় ছকা ব্লুপ্রিন্ট।
অন্যদিকে অর্জুন। প্রবল বাম জমানাতেও যিনি তৎকালীন দাপুটে সিপিএম নেতা তড়িৎবরণ তোপদারকে ৯৯-এর ভোটে নাকের জলে চোখের জলে করে দিয়েছিলেন। তারপর ২০০৬ থেকে টানা ভাটপাড়া বিধানসভা জেতা। সেই অর্জুন এ বার বিজেপি-তে। গত দশ বছর নিজের কাঁধে করে জিতিয়ে দীনেশ ত্রিবেদীকে সংসদেন পাঠিয়েছেন। ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চল যেন তাঁর হাতের তেলো। সব ঘাঁতঘোত নখের ডগায়। শিল্পাঞ্চলের সেই ভোট সেনাপতিই এ বার মমতার বিরুদ্ধে। বিজেপি-র প্রার্থী।
ভোটের দিন তাঁর দৌড়ঝাঁপ, ঠোঁট ফেটে যাওয়া, উত্তেজিত হয়ে পড়া—এ সব দেখে অনেকেই বলেছিলেন, অর্জুন বোধহয় ভোটটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। কিন্তু ফল বেরোতেই বোঝা গেল। অন্য খেলা খেলে দিয়েছিলেন অর্জুন।
কী খেলা?
পর্যবেক্ষকদের মতে, অর্জুন ভোটের দিন শুধু দুটো জায়গায় ঘুরেছেন। এক আমডাঙা এবং দুই নৈহাটির একটা অংশ। বাকি ভাটপাড়া, জগদ্দল, নোয়াপাড়া, বীজপুর, ব্যারাকপুর—এই সব বিধানসভায় যানইনি। তাঁদের মতে অধিকাংশ এলাকায় নিজের ছক সাজিয়ে রেখেছিলেন অর্জুন। নিজের মতো করে। যেখানে অন্যদের দিয়ে হবে না, সেখানে নিজে দৌড়ে গিয়েছেন। আড়াই লক্ষ ভোটে জেতা কেন্দ্র ছিনিয়ে নিয়েছেন অর্জুন। মমতা থেকে অভিষেক, জ্যোতিপ্রিয়দের হুঙ্কার উড়িয়ে।
নিশীথ আর অর্জুনের জয়ের পর অনেকেই বলছেন, মেসি, রোনাল্ডোরা ক্লাব বদলালেও তাঁদের জাত বদলায় না।