দ্য ওয়াল ব্যুরো: নরেন্দ্র মোদী ও তাঁর সরকারের মুখোশ খুলে দেওয়াই তাঁর লক্ষ্য। রাজ্যসভার জন্য মনোনীত হওয়ার পর তাঁর প্রতিক্রিয়ায় দ্য ওয়াল কে বললেন জহর সরকার। তিনি বলেন, রাজনীতির প্রতি আমার তেমন কোনো আগ্রহ ছিল ন। কিন্তু দীর্ঘ সময় সরকারি কাজে যুক্ত থাকার সুবাদে আমি জানি প্রশাসন কী এবং কীভাবে তা পরিচালনা করা উচিত। নাগরিকের প্রতি কী দায় আছে প্রশাসনের। আমি মনে করি দেশ সেভাবে চলছে না। তাই আমি ভারতের সংসদে গিয়ে সেই কথাই বলতে চাই। রাজনৈতিক দলের হয়ে সংসদে যাওয়ার সেটাই কারণ।
রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও জহর সরকারের সঙ্গে মমতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাদা-বোন সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সেই সম্পর্ক এতটাই আন্তরিক এবং ব্যক্তিগত স্তরের যে জহরবাবু সরকারি চাকরিতে থাকার সময়ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নাম ধরে ডাকতেন এবং তুই বলে সম্বোধন করতেন। মমতাও সর্বদা জহরদা বলে সম্বোধন করতেন এই পদস্থ আমলাকে।
২০১১- তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হন। মুখ্যসচিব তখন সমর ঘোষ। তাঁকে বামফ্রন্ট সরকার ওই পদে বসিয়েছিল। জহর সরকার তখন দিল্লিতে সংস্কৃতি মন্ত্রকের সচিব। মমতা গোড়ায় চেয়েছিলেন, তাঁর জহরদা রাজ্যে ফিরে এসে মুখ্য সচিবের দায়িত্ব নিন। কিন্তু জহরবাবুই তাতে আপত্তি করেন। তিনি বলেন, একজন একজন যোগ্য ব্যক্তি মুখ্যসচিবের দায়িত্বে আছেন। মমতা বরং মুখ্যসচিব পদে তাঁর চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে নিলে প্রশাসনের লাভ হবে। মুখ্যমন্ত্রী মুখ্যসচিব পদে সমর ঘোষের চাকরির মেয়াদ ছয় মাস বৃদ্ধি করেছিলেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অধীনে চাকরি করলে তাঁদের প্রশাসনিক সম্পর্কের সমীকরণ কেমন হতো তা বলা কঠিন। তবে ব্যক্তি জহর সরকার বরাবরই স্পষ্টবাদী একই সঙ্গে তাঁর যোগ্যতা এবং দক্ষতা প্রশ্নাতীত। তাঁর স্পষ্টবাদী কথাবার্তা অনেকেরই পছন্দ ছিল না। আবার সহকর্মীদের মধ্যে সেই কারণেই ছিলেন তুমুল জনপ্রিয়। তাঁর মুখের উপর স্পষ্ট কথা বলার স্বভাবের কারণেই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে এই আমলার তেমন বনবনা হয়নি। বুদ্ধদেববাবু রাজ্যে শিল্পায়নের অভিযান শুরুর মুখে শিল্পসচিবের পদ থেকে সরিয়ে জহর সরকারকে সল্টলেকে বিকাশ ভবনে উচ্চ শিক্ষা সচিব করে পাঠিয়ে দেন। যদিও শিল্প সচিব হিসেবে বাংলায় শিল্প আনা এবং শিল্প পরিবেশ তৈরিতে জহরবাবুর ভূমিকা তৎকালীন প্রশাসন এবং শাসক দলে তুমুল প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু ঋজু ব্যক্তিত্বের মানুষ জহর সরকারের সঙ্গে কাজ করা কঠিন হতে পারে বুঝতে পেরে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, নিরুপম সেনরা তাঁকে রাইটার্স বিল্ডিং থেকে সল্টলেকে পাঠিয়ে দেন। সেখান থেকে তিনি চলে যান দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরিতে। কারন জহর সরকার বুঝেছিলেন তাঁকে মুখ্যসচিব করার কোনও সম্ভাবনা নেই। যদিও ওই পদের জন্য তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে কারো কোনো সংশয় ছিল না।
চাকরি জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ সামলেছেন জহর সরকার। তারমধ্যে অল্প সময়ের জন্য ছিলেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী অফিসার। তার নেতৃত্বে ১৯৯৮ এবং ১৯৯৯ পরপর দু'বছর লোকসভার অকাল নির্বাচন হয়েছিল। অক্টোবর-নভেম্বরে হওয়া সেই ভোটের সময় রাজ্যের। বহু এলাকা বন্যার জলে ডুবে ছিল। সেই পরিস্থিতির মধ্যেও অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি নির্বাচন পরিচালনা করায় নির্বাচন সদনের প্রভূত প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। আবার নির্বাচন সদনের বহু নির্দেশ তিনি উপেক্ষা করেছেন অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে, যা কোনো অফিসার কল্পনাও করতে পারেন না।
দিল্লির চাকৃতেও পদস্থ আমলা এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে দল নির্বিশেষে তাঁর বিরোধ প্রশাসনিক মহলে তুমুল আলোচনার বিষয় ছিল। সংস্কৃতি সচিব থাকাকালে কংগ্রেসের মন্ত্রী মণীশ তেওয়ারির সঙ্গে পদে পদে সংঘাত হয়। মন্ত্রীর বহু নির্দেশ বেআইনি বলে উপেক্ষা করেছেন জহর। তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন কংগ্রেস নেতা মনিষ তিওয়ারি।
নরেন্দ্র মোদীর প্রথম মন্ত্রিসভায় তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী ছিলেন অরুণ জেটলি। প্রসার ভারতীয় সিইও হিসাবে মন্ত্রীর অফিস সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যান। মন্ত্রী সময় দিয়েছিলেন সকাল ১০'টায়। সাড়ে ১০' টা পর্যন্ত জেটলি দেখা না করায় জহরবাবু মন্ত্রীর প্রাইভেট সেক্রেটারিকে বলেন আমার কাজ আছে। আমি চললাম। মোদী সরকারের সঙ্গে পদে পদে বিরোধের কারণে ২০১৭-তে মেয়াদ শেষের একমাস আগে ইস্তফা দিয়ে কলকাতায় চলে আসেন তিনি।
এবারের নির্বাচনে সুশীল সমাজের যে গুটিকয় মুখ অত্যন্ত জোরালো ভাবে বিজেপি প্রসঙ্গ পরিবারের রাজনীতির বিরুদ্ধে সরব ছিলেন জহর সরকার তাদের মধ্যে অন্যতম। বাংলার এই নির্বাচন নিছকই একটি সরকার পরিবর্তনের বিষয়ে নয়, এটা বাংলা ও বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, সংবাদপত্রে, টিভিতে, সামাজিক মাধ্যমে এবং অসংখ্য আলোচলা চক্রে এ নিয়ে মুখর ছিলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য ছিল, বিজেপি সরকার গড়লে বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতি সবচেয়ে বড় বিপদের মুখে পড়বে।