দিব্যেন্দু ভৌমিক, কোচবিহার
“করোনা! বাজার আমার রোজের গন্তব্য।”
‘করোনা!’ -- ভাবটা এমন যেন ওই রোগটি আর যারই হোক আমার কোনও দিন হবে না। এই দৃশ্য কোচবিহারের তবে সারা রাজ্যের সর্বত্রই এমন ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
“বাক্স বাক্স হ্যান্ড স্যানিটাইজার – সেই কবে তুলে নিয়েছি! চাল-ডাল-তেল? সে তো এখন চার-ছ’মাসের মজুত আছে। কিন্তু ফ্রিজের মাছ! নাহ্। ঠিক ভাল লাগে না! তাই আর কি! আমি রোজ বাজার করি নিয়ম করে।” তাও যে সে মাছ হলে চলবে না। বোরলি, কাজরি, ট্যাংরা - এসব পেলে একদমই ছাড়েন না। এর জন্য তাঁরা একটু বেশি খরচ করতে রাজি আছেন। ভাল জিনিসের জন্য তো ভাল দাম দিতেই হবে। অনেকে আবার বিদ্রুপ করে বলছেন ‘ইমিউনিটি’ মানে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেই রোজ নাকি বাজার করতে বেরোচ্ছেন।
আগে যাঁরা ছুটি না পেলে বিরক্ত হতেন এবং বাড়িতে থাকার ছুতো খুঁজতেন এখন তাঁরা বলছেন বাড়িতে বেশিক্ষণ থাকা চলে না কারণ থাকলেই ঝগড়া-অশান্তি। আর বাড়িতে থাকতেই যদি হয় তা হলে ভাল-মন্দ খেতে হবে। তাঁদের যত রাগ গিয়ে পড়ছে পুলিশের উপরে। কারণ ‘গুছিয়ে’ বাজার করার ব্যাপারে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন তাঁরাই। ভিড় দেখলে তেড়ে আসছেন আবার মাইকিংও করছেন! ওঁরা রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দিচ্ছেন। পাড়ার ছেলেরা ত্রাণ দিতে পথে নেমেছে। কী যে করবেন সেকথা তাঁরা ভেবেই পাচ্ছেন না।
লকডাউন কার্যকর করতে সকালের বাজারে বেয়াড়া ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কোচবিহারের পুলিশ-প্রশাসনকে। মাইক হাতে বাজারে প্রায় প্রতিদিনই বের হতে হচ্ছে মাথাভাঙার এসডিও জিতীন যাদব, দিনহাটার আইসি সঞ্জয় দত্ত, কোচবিহারের সদর মহকুমা শাসক সঞ্জয় পাল, কোতোয়ালির আইসি সৌম্যজিৎ রায়দের। বারবার ঘোষণার পরেও বাজারে ভিড় কমছে না।
জেলা সদর-সহ পাঁচটি মহকুমার সমস্ত বাজার বিভিন্ন মাঠে স্থানান্তরিত হয়েছে ভিড় এড়াতে ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে। করা হয়েছে মার্কিংও। কিন্তু অসচেতন লোকজন সেসব মানছেন না।
নাট্যব্যক্তিত্ব কল্যাণময় দাসের কথায়, “আগে অনেককেই দেখতাম সপ্তাহে দু’দিন বাজারে যেতেন। এখন তাঁদেরই দেখছি সকাল সকাল ফিটফাট হয়ে বাজারের পথে।” শিক্ষাবিদ দিগ্বিজয় দে সরকার ও ইতিহাসবিদ নৃপেন্দ্রনাথ পাল বলেন, “লোকে যে আর কবে সচেতন হবে!” কবি মাধবী দাস বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় রাতে ঝড় তুলে সকালে দুশো গ্রাম পেঁয়াজ কিনতে বাজারে বেরতে দেখা যাচ্ছে অনেককেই।”
পঁচিশ কিলোমিটার দূরে আলিপুরদুয়ার জেলায় বৃহস্পতিবার রাতে চার জনের করোনা সংক্রমণ ধরা পড়েছে। গ্রিন জোনে থাবা বসিয়েছে করোনা। ফলে চিন্তায় কোচবিহার জেলাও। তবে সেকথা জেনেও লোকে বাজারমুখী। তাই আরও কড়া হতে হতে হয়েছে প্রশাসনকে। নতুন করে মাইকিং শুরু হয়েছে কোচবিহারের নতুন বাজারে। মাস্ক ছাড়া যাঁরা বাজারে যাচ্ছেন তাঁদের অ্যাম্বুল্যান্সে তুলে নিয়েছেন সদর মহকুমা শাসক। পুলিশকে ধোঁকা দিতে গিয়ে নিজের জীবনকে সঙ্কটে না ফেলতে অনুরোধ করছেন পুলিশ।
কোচবিহারের জেলাশাসক পবন কাদিয়ান শুক্রবার বলেন, “মদনমোহন দেবের কোচবিহার জেলা এখনও নিরাপদ। আমি সকলের সহযোগিতা চাইছি। পুলিশ-প্রশাসন জেলাবাসীর জন্য সব সময় তৈরি।”