দ্য ওয়াল ব্যুরো, পশ্চিম মেদিনীপুর: প্রশান্ত মাহাতো। শালবনী থানার ভীমপুর থেকে মধুপুর পর্যন্ত একদা তিনি ছিলেন সিপিআই মাওবাদীর মুখিয়া সংগঠক। প্রশাসনের বিরুদ্ধে গ্রামের মানুষকে সংগঠিত করা, এলাকার খবর মাওবাদীদের শীর্ষ নেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া—এই ছিল তাঁর কাজ। আর ১৫ অগস্ট আসা মানেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জেহাদ প্রদর্শনের দিন। গোটা মহল্লা ভরিয়ে দেওয়া হত কালো পতাকায়। ১০ বছর আগেও সেই কাজের মূল দায়িত্ব থাকত সুঠাম চেহাহারার প্রশান্তর উপর। কিন্তু বদলে যাওয়া জঙ্গলমহলে সেই একদা মাওবাদী নেতাই ২০২০-র স্বাধীনতা দিবসে তুললেন জাতীয় পতাকা। অকপটে স্বীকার করে নিলেন, "ওটা ভুল পথ ছিল"।
কিন্তু কেমন আছে জঙ্গলমহল? কেমন আছে শালবনীর ভীমপুর থেকে মধুপুর?
প্রশান্ত মাহাতো যেমন জানালেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে কিছু উন্নয়ন হয়েছে, তেমন এও বললেন, গোটা মহল্লায় একটা ছেলেরও চাকরি হয়নি। তাঁর কথায়, “কর্মসংস্থানের সংকটই জঙ্গলমহলে বিজেপির উত্থানের মূল কারণ।” এদিন তিনি বলেন, “এত ছেলে এখানে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, গ্র্যাজুয়েশন পাশ করে বসে আছে, এক জনও চাকরি পায়নি। এক জনও না। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ক্ষোভ জন্মাচ্ছে!”
বাম জমানার শেষ কটা বছর জঙ্গলমহল মানেই মৃত্যু মিছিল। শিক্ষক, পুলিশ, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এমনকি তৎকালীন শাসকদল সিপিএমের নেতাকর্মীদেরও খুন হতে হয়েছে। ’১১-র আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিশ্রুতি ছিল, সরকারে এলেই জঙ্গলমহলের মুখে হাসি ফোটাবেন। বন্ধ করবেন হিংসা।
সাংগঠনিক এবং প্রশাসনিক সমান্তরাল উদ্যোগ নিয়ে জঙ্গলমহলে শান্তি ফিরেছে ঠিকই কিন্তু মূল স্রোতে ফেরা মাওবাদী নেতার বক্তব্য, কর্মসংস্থানই এখন শাল-মহুয়ার জনপদে মূল সমস্যা। তাঁর সাফ কথা, “শুধু দু’টাকা কিলো চাল দিয়ে জঙ্গলমহলমহলের মানুষের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। চাই কাজ।"
কেন মাওবাদীদের অস্ত্রের রাজনীতির পথে গিয়েছিলেন তারও সোজাসাপ্টা জবাব দিলেন প্রশান্ত মাহাতো। তাঁর কথায়, “ও পথে না গিয়ে উপায় ছিল না। রাতে মাওবাদীদের হানা। দিনে পুলিশ আর হার্মাদদের হানা। একটা বলকে তিন জন মিলে লাথি মারার মতো অবস্থা। বাঁচার জন্যই যেতে হয়েছিল।” তবে মূল স্রোতে ফেরাতে পুলিশ প্রশাসন ও সিআরপিএফের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রশান্তবাবু এদিন বলেন, “বামফ্রন্টের আমলে কোনও উন্নয়ন হয়নি। মমতার আমলে তবু কিছু হয়েছে!” জঙ্গলমহলের দেহাতি উচ্চারণেই প্রশান্ত বলছেন, “কিন্তু ছেলেদের চাকরিবাকরি না হলে এই মমতার সরকারও আর থাকবেনি!”
গত লোকসভা ভোটে জঙ্গলমহলে কার্যত পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছে তৃণমূলের। পশ্চিমাঞ্চলের সবক’টি আসন দখল করেছে বিজেপি। একুশের ভোটের যখন আর কয়েক মাস বাকি, তখন একদা মাওবাদী নেতার এ হেন বক্তব্য তৃণমূলের জন্য খুব একটা সুখকর নয় বলেই মত রাজনৈতিক মহলের অনেকের। তবে ৭৪ তম স্বাধীনতা দিবসে এক সময়ের দাপুটে মাওবাদী নেতার বক্তব্য, “জঙ্গলমহলের বেকার ছেলেদের কর্মসংস্থান দরকার। যাতে তাঁরা আর আমাদের মতো ভুল পথে না যায়!”