দ্য ওয়াল ব্যুরো: একুশে জুলাইয়ের সভার ঠিক এক মাস আগে কলকাতার নেতাজি ইন্ডোরে দলের কোর কমিটির বর্ধিত বৈঠক ডেকেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সভা থেকেই কোচবিহারের নেতাদের গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব এড়িয়ে সমঝে চলতে বলেছিলেন দিদিমণি। কিন্তু কলকাতা থেকে কোচবিহারে যেতেই নেত্রীর সব নির্দেশ উড়িয়ে জেলার নেতারা ফিরেছিলেন নিজেদের ফর্মে। সোমবার কোচবিহারে প্রশাসনিক সভার আগেই জেলা সভাপতি তথা উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী সহ জেলার সমস্ত নেতাদের দাবড়ে দিলেন মমতা। পষ্টাপষ্টি বলে দিলেন, এরপরও না শুধরোলে বড়-মেজো-সেজো কোনও নেতাকেই রেয়াত করা হবে না।
সোমবার দুপুরের বিমানেই চার দিনের উত্তরবঙ্গ সফরে গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। যার মধ্যে দু’দিনই কোচবিহারে কর্মসূচি করবেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রথম দিনে কোচবিহার শহরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অডিটোরিয়াম উদ্বোধন করেন মমতা। প্রসঙ্গত, কোচবিহার শহরে এত দিন কোনও শীততাপ নিয়ন্ত্রিত অডিটোরিয়াম ছিল না। ‘উৎসব’ নামের এই অডিটোরিয়ামেই হয় প্রশাসনিক সভা। এ দিনের সভায় পিতৃবিয়োগ হওয়ার কারণে উপস্থিত থাকতে পারেননি কোচবিহারের জেলা শাসক কৌশিক সাহা। কিন্তু অন্য সরকারি আধিকারিক, জনপ্রতিনিধিদের ধরে ধরে কাজের হিসেব নেন মুখ্যমন্ত্রী। ছিটমহল, সরকারি নানান প্রকল্প, জেলা পরিষদের কাজ সমেত একাধিক বিষয়ে আমলা এবং জনপ্রতিনিধিদের ধমকও দেন। দলীয় নেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘কাজ করলে লোক ছুটে আসবে। লবি করলে নয়।’ আমলাদের উদ্দেশে বলেন, “অ্যাভয়েড, ব্লক, কনফিউশন আর ডেস্ট্রাকশন, এই এ-বি-সি-ডি ফর্মুলা দিয়ে প্রশাসনের কাজ করলে চলবে না।’ সবাইকে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে কাজ করার পরামর্শ দেন মমতা। কোচবিহার বিমানবন্দর চালু না হওয়ার জন্য কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন এ দিন। এ দিনের প্রশাসনিক সভায় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন পর্যটনমন্ত্রী গৌতম দেব, তথ্য সংস্কৃতিমন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন, বনমন্ত্রী বিনয় বর্মন এবং উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ।
সভা শেষের পর মুখ্যমন্ত্রী যান সার্কিট হাউসে। সূত্রের খবর, সার্কিট হাউসে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে গেট থেকেই মমতার নিরাপত্তারক্ষীরা ফিরিয়ে দেন মন্ত্রী রবি ঘোষ, বিনয় বর্মন এবং কোচবিহার পুরসভার চেয়ারম্যান ভূষণ সিংকে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে গেটের বাইরে থেকেই ফিরে যান তাঁরা।
প্রসঙ্গত গত তিনমাসে প্রায় রোজই কোচবিহারের তৃণমূল থেকেছে সংবাদ শিরোনামে। এর মধ্যেই গোষ্ঠী-মারামারিতে খুন হয়েছেন দলের দুই ছাত্রনেতা। দিনহাটা কলেজের ছাত্রনেতা অলোক নিতাই দাস খুনের পর টিএমসিপি-র জেলা সভাপতিকে সরিয়ে দিতে বাধ্য হয় দল। তারপর আবার আরেক কাণ্ড করে বসেন রবি ঘোষ। হঠাৎ একদিন সকালে এক ছাত্রনেতাকে ছাত্রপরিষদের নতুন জেলা সভাপতি বলে ঘোষণা করে ফেসবুকে পোস্ট করে দেন। যার নামে রয়েছে আরেক ছাত্র নেতা খুনের অভিযোগ। এক ঘণ্টার মধ্যে কালীঘাটের ধমক খেয়ে সেই পোস্ট ফেসবুক থেকে তুলে নেন রবিবাবু। বিবৃতি দিতে হয় দলের মহাসচিব তথা ছাত্রফ্রন্টের ইনচার্জ পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে। এছাড়া মাদার-যুবর কোন্দল তো লেগেই রয়েছে উত্তরবাংলার এই জেলায়। এর মাঝেই আবার অত্যাধুনিক কার্বাইন হাতে তৃণমূলের পঞ্চায়েত সমিতির উপপ্রধানের স্বামীর ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়। প্রায় এক মাস পর কার্বাইন নরেশকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
সামনেই লোকসভা ভোট। মমতার মতো চার দশকের পোড় খাওয়া রাজনীতিক জানেন, যত দলের লোকেরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-মারামারি করবে তত সেই জায়গায় বিজেপি-র থাবা বসাতে সুবিধে হবে। আগামী ডিসেম্বরে যে তিনটি রথযাত্রা বিজেপি সারা রাজ্যে বের করবে তার মধ্যে একটি শুরু হবে এই কোচবিহারের রাসমেলা মাঠ থেকে। সূচনা করবেন সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ। ফলে মমতার কড়া বার্তা, ঠিক ভাবে চলতে হলে চলো, না হলে রাস্তা দেখো।