দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের পরের সকালেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ফোন করেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও। দিল্লি থেকে টিম এসে বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শন করে গিয়েছে প্রায় ১৫ দিন হয়ে গেল। কিন্তু এখনও দিল্লি থেকে একটি টাকাও রাজ্যে আসেনি বলে দাবি করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এদিন বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা এখনও পর্যন্ত কিছুই পাইনি। আমরা হিসাব দিয়েছি। কেন্দ্রীয় দল এসেছিল কিন্তু কোনও টাকা আমরা পাইনি। আমরা তাদের ক্ষতির পরিমাণ জানিয়েছি।” মুখ্যমন্ত্রী এও বলেন, "একটা ঘটনা ঘটেছে। পাকা ধানে মই এর মতো।
প্রসঙ্গত, আয়লা ঘূর্ণিঝড়েও দক্ষিণবঙ্গে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সেই একই জায়গাতেই ফের আঘাত হেনেছে বুলবুল। চাষবাসের ক্ষতি হয়েছে তাতে, গরিব মানুষের কাঁচা ঘরবাড়িও ভেঙেছে প্রচুর। আয়লার বিপর্যয়ের সময় রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল বাম সরকার। তখন কেন্দ্রে অর্থমন্ত্রী ছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন বাবদ তখন রাজ্য সরকারকে ১ হাজার কোটি টাকা দিয়েছিল মনমোহন সিংহ সরকার। সংসদে বাজেট বক্তৃতায় তা ঘোষণা করেছিলেন প্রণববাবু।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, কেন্দ্র বাংলাকে এক কথায় ১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া তখন আবার তৃণমূলের অনেকেই খুশি ছিলেন না। এমনকি ঘরোয়া আলোচনায় তা বলতেও শুরু করেছিলেন তৃণমূলের অনেক সাংসদ। কেন না তাঁদের ধারনা ছিল, বাম সরকার ঠিকমতো মেরামতি ও পুনর্বাসনের কাজ করতে পারলে রাজনৈতিক ভাবে সুবিধা পেয়ে যাবে সিপিএম।
এখন আবার বুলবুল পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিজেপিও ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়ে বিভিন্ন আশঙ্কার কথা বলতে শুরু করে দিয়েছে। যেমন রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ সম্প্রতি বলেছেন, “ত্রাণের টাকা লুঠ করতে পারে তৃণমূল। ক্ষয়ক্ষতির হিসাব তাই বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে।” ব্যাপারটা এখানেই থেমে ছিল না। ত্রাণ নিয়ে রাজনীতিও শুরু হয়েছে। রাজ্যের সরকার চায় ক্ষতিপূরণের জন্য কেন্দ্র টাকা দিক। কারণ, এক—এ ব্যাপারে কেন্দ্র দায়বদ্ধ। দুই, রাজ্যের অর্থসঙ্কট রয়েছে। কিন্তু তার পাশাপাশি এও ঠিক, তৃণমূল চায় ত্রাণের টাকা দিলেও রাজনৈতিক সুবিধা যেন বিজেপি না পায়। বুলবুল কবলিত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে রাজ্যের দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় ও দেবশ্রী চৌধুরী যেরকম বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন, তাতেই সেই ছবি পরিষ্কার।
এদিন বিধানসভায় সবং-এর তৃণমূল বিধায়ক গীতারানি ভুঁইয়া প্রশ্ন করেন, বুলবুলের ক্ষতির পরিমাণ কত? জবাবে, রাজ্যের ত্রাণ, পুনর্বাসন ও বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের মন্ত্রী জাভেদ আহমেদ খান বলেন, বুলবুলের মোট ক্ষতির পরিমাণ ২৩ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। কিন্তু এখনও দিল্লি থেকে কোনও টাকা আসেনি বলে জানান তিনি।
তার পর তৃণমূল আবার এখন আশঙ্কা করছে, রাজনৈতিক কারণেই ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে দেরি করছে কেন্দ্র। কারণ, বিজেপি চায় তৃণমূল সরকার ব্যর্থ হোক। ক্ষতিপূরণ না পেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপে যাক জনতা।
কেন্দ্র যে বাংলাকে বঞ্চিত করে রেখেছে, এই অভিযোগ তৃণমূল সরকারের নতুন নয়। এদিনও মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আগে অনেক টাকা কেন্দ্রের থেকে আসত। কিন্তু কেন্দ্র এখন সেই টাকা কমিয়ে দিয়েছে। কেন্দ্র ৪০ শতাংশ টাকা কমিয়ে দিয়েছে।” অঙ্গনওয়াড়ি স্কুলের প্রসঙ্গ টেনে মমতা বলেন, “আমরা নিজেরাই টাকা দিয়ে স্কুল চালাই। কিন্তু কোন ভাবেই অঙ্গনওয়াড়ি স্কুল উঠিয়ে দেওয়ার কোন ভাবনা আমাদের নেই।”
বুলবুলের জন্য উত্তরবঙ্গ সফর বাতিল করে দুই চব্বিশ পরগনার ক্ষতিগ্রস্থ এলাকাগুলি আকাশ পথে ঘুরে দেখেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কাকদ্বীপ এবং বসিরহাটে প্রশাসনিক সভা করে মুখ্যমন্ত্রী প্রশাসনের কর্তা ও জনপ্রতিনিধদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, দ্রুত পুনর্গঠনের কাজ করতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী এও বলেছিলেন, আগে থেকে ব্যবস্থা নেওয়ায় বহু মানুষকে আশ্রয় শিবিরে সরিয়ে নেওয়া গিয়েছিল। তাতে বড় প্রাণহানি থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে। এদিন মুখ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, “আয়লার পর আমরা ফ্লাড সেন্টার বাড়িয়েছিলাম। আগামী দিনে তা আরও বাড়ানো হবে।”
গত ১৫ নভেম্বর রাজ্যে এসেছিল কেন্দ্রীয় দল। রাজ্যের তরফে তাদের জানানো হয়, বুলবুলে মোট ক্ষতির পরিমাণ ২৩ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। এই পুরোটাই কেন্দ্রের কাছে দাবি জানিয়েছিল রাজ্য। সরকারের তরফে কেন্দ্রীয় দলকে জানানো হিসেব দিয়ে বলা হয়, দুই চব্বিশ পরগনা, দুই মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রাম জেলায় মোট ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৫ লক্ষ। ফসল নষ্ট হয়েছে ১৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯২৪ হেক্টর জমির। ৫ লক্ষ ১৭হাজার ৫৩৫টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু এখনও আর্থিক সাহায্য আসেনি বলে দিল্লির বিরুদ্ধে এক রকমের অভিযোগই তুললেন মুখ্যমন্ত্রী।