শোভন চক্রবর্তী ও রফিকুল জামাদার
কার্তিক দাস বাউলের গলায় ওই গানটা মনে আছে? ‘ও কি ও, কলঙ্কিনী রাধা...!’ সেই কার্তিক বাউলই আজ যোগ দিলেন তৃণমূলে। তপসিয়ার তৃণমূল ভবনে তাঁর হাতে জোড়াফুলের পতাকা হাতে তুলে দিয়েছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। তারপর তপসিয়া থেকে তাঁর গাড়ি যখন বর্ধমানের পথে তখনই ফোন করা হয় দ্য ওয়াল-এর তরফে। ফোন ধরতেই কানে এল হুটারের শব্দ! শুনে মনে হচ্ছিল, দলে যোগ দিয়েই বোধহয় পাইলট কার পেয়ে গিয়েছেন তিনি! কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরেই বোঝা গেল ওটা অ্যাম্বুলেন্স। আর সাইরেনের শব্দ থেকে তাঁর গাড়ি একটু দূরত্বে যেতেই মাটির কাছাকাছি নেমে এলেন কার্তিক দাস বাউল। দিলেন সব প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর। কোনও প্যাঁচপয়জার নেই।
এত দল থাকতে তৃণমূলে কেন? ‘বোলপুর ব্লুজ’-এর মূল কাণ্ডারী জানিয়ে দিলেন, “দিদিকে ভালবাসি। আজ থেকে নয়। যবে থেকে দিদি দল করছেন তবে থেকে। আমি তৃণমূলেই ছিলাম। দিদির ডাকে কত্ত অনুষ্ঠানে গান গেয়েছি! আজ আনুষ্ঠানিক ভাবে সবটা হল!”
গাড়ি তখন বর্ধমানের দিকে এগোচ্ছে। আর ফোনে কার্তিক বলে গেলেন তাঁর কথা। জানালেন, জাতপাত, ধর্মের রাজনীতি দেখে তাঁর বিরক্তির কথা। বারবার বললেন, “লালনের গান গাই! মানুষের গান গাই!” তবে এও জানালেন, গানের সুবাদে গোটা দেশ ঘুরতে গিয়ে তিনি দেখেছেন, সব রাজ্যেই প্রায় ধর্মের নামে, জাতপাতের নামে রাজনীতি চলছে। এর বিরুদ্ধে গানে গানেই ‘মানব ধর্মের’ কথা তিনি তুলে ধরতে চান। তবে একটি বারের জন্যও কোনও দল বা সংগঠনের নাম নেননি গুসকড়ার ভূমিপুত্র।
অনেকে বলেন, সাংস্কৃতিক জগতের লোকজন রাজনীতিতে এসে ইদানিং খুব একটা মানিয়ে নিতে পারেন না তার অন্যতম কারণ নেতাদের ভাষা সন্ত্রাস। কথার পিঠে কথা বলতে বলতেই কার্তিক বললেন, “আমরা তো আর বুকের উপর পা দিয়ে রাজনীতি করব বা ঠ্যাং ভেঙে দেব জাতীয় মন্তব্য করতে পারব না, আমরা গানটাই করতে পারি। ওটাই করব। ঘুরে ঘুরে। গ্রামে গ্রামে। গানের মাধ্যমেই রাজনীতির কথা বলব।”
কিন্তু কার্তিকবাবু, ‘বুকের পা দিয়ে রাজনীতি’ করার কথা যেমন বিজেপির দিলীপ ঘোষ বলেন, তেমন আপনি যে দলে আজ যোগ দিলেন সেই দলের নেতা অনুব্রত মণ্ডলও কিন্তু পাচন, চড়াম চড়াম, গুড়-বাতাসা, হনু টুপির কথা বলেছেন! সঙ্গে সঙ্গেই লোকগানকে ফিউশন করার শিল্পী বলে দিলেন, “কে কী করল আমার দেখার দরকার নেই! আমি এসব বলতে বা করতে পারব না!”
তারপর একথা, সেকথা হতে হতেই কার্তিকবাবুকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কি একুশের বিধানসভা ভোটে প্রার্থী হচ্ছেন? প্রথমবার প্রশ্নটা শুনতে পেলেন না তিনি। বললেন, “রাস্তায় তো! গাড়ি যাচ্ছে। তাই ভাল করে সব কথা শুনতে পাচ্ছি না!” হয়তো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভেবে নিলেন কী বলবেন। ফের জিজ্ঞেস করা হল, বিধানসভা ভোটে কি প্রার্থী হবেন? বাউলের জবাব, “দিদি জানেন। দিদি চাইলে হব।” পছন্দের আসন? কোথায় দাঁড়াতে চাইবেন? বাউলের কথায় কোনও ভনিতা নেই। পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, “আউশগ্রাম হলে ভাল হয়। গুসকরায় আমার বাড়ি। আমি আশপাশের সব গ্রাম চিনি। সবাই আমায় চেনেন।” ঘটনাচক্রে এই আউশগ্রাম বিধানসভার দায়িত্বে আবার রয়েছেন অনুব্রত মণ্ডল। কারণ এটি বোলপুর লোকসভার মধ্যে পড়ে। কার্তিক দাস স্মরণ করিয়ে দিলেন, বিগবসে (বাংলা) পাঁচ কোটি লোক দেখেছেন তাঁকে। তা ছাড়া সারেগামাপা-এর মঞ্চও আলাদা করে পরিচিতি দিয়েছে। যেন বুঝিয়ে দিতে চাইলেন, জনপ্রিয়তা তাঁর কিছু কম নেই।
যদিও আউশগ্রামের বর্তমান বিধায়ক অভেদানন্দ থান্ডার বলেন, "দল যাকে টিকিট দেবে সেই প্রার্থী হবেন। সবতাই ঠিক করবেন নেত্রী?" তবে কার্তিকের এ হেন ইচ্ছার কথা শুনে গুসকরার অনেকে বলছেন, মনে হয় না বাউলের ইচ্ছাপূরণ হবে। তাঁদের কথায় অভেদানন্দ সামনের বার টিকিট পাবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে এ কথা বাস্তব। তবে এও বাস্তব, অভেদানন্দ টিকিট না পেলে ওই কেন্দ্রের অন্যতম দাবিদার গুসকরা পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান বুদ্ধেন্দু রায়। কারণ তাঁর জনপ্রিয়তা।
তবে কার্তিক এত প্যাঁচ বোঝেন না। বুঝতে চান না এলাকার রাজনীতির জটিল সমীকরণও। এদিন একেবারে শেষে কার্তিক দাসকে জিজ্ঞেস করা হল, দিদি যদি বলেন বিজেপির বিরুদ্ধে একটা গান গাইতে, কোন গানটা গাইবেন? বাউলের জবাব, “আমি কারও বিরুদ্ধে নই। ‘তোমায় হৃদ মাঝারে রাখব ছেড়ে দেব না!’ বিদ্বেষের বিরুদ্ধেই লালনের গান। সেই গানই গাই আমি।”