দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রাচীন মল্লভূমের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে নানা স্থাপত্য। সেই সময়ের রীতিনীতির সাক্ষ্য বহন করছে বহু শত বছর ধরে চলে আসা নানা উৎসব। রথ তার অন্যতম।
ইতিহাস বলে মল্লরাজারা কৃষ্ণপ্রেমে পাগল হয়ে মল্লগড়ে তৈরি করেছিলেন একের পর এক কৃষ্ণমন্দির। এইসব মন্দিরগুলিতে চোখ ধাঁধানো টেরাকোটার অপূর্ব নিদর্শন আজও চোখে পড়ে। প্রাচীন মল্লগড়ে মন্দিরগুলির ইতিহাস যেন আজও কথা বলে। টেরাকোটা ছাড়াও এখানে রয়েছে পঙ্খের কাজ করা মাঁকড় পাথরের মন্দির।
বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে প্রাচীন রথ উৎসব সাড়ে তিনশো বছরের বেশি পুরোনো। ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে বিষ্ণুপুরের মল্লরাজা বীরমল্ল শহরের মাধবগঞ্জে রানি শিরোমণি দেবীর ইচ্ছা অনুযায়ী টেরাকোটার পঞ্চরত্ন মন্দির নির্মাণ করেন। মন্দিরের বিগ্রহ রাধা-মদনগোপাল জিউ। এই মন্দিরের অনুকরণে তৈরি করা হয় পিতলের রথ। মল্লরাজাদের সময়ে এই রথ উৎসবের সূচনা হয়। বর্তমানে এই উৎসব পরিচালনা করেন মাধবগঞ্জ এগারোপাড়া রথ উৎসব কমিটি। মন্দিরের প্রধান বিগ্রহ রাধা-মদনগোপালের বিগ্রহকে বাদ্য যন্ত্র ও কীর্তনের মধ্য দিয়ে নিয়ে আসা হয় রথে। রথের মধ্যে চলে পুজো-অর্চনা ও আরতি। এরপর শুরু হয় রথের রশিতে টান দেওয়ার পর্ব। দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ আসেন রথের দড়িতে টান দিতে। তাঁদের বিশ্বাস এতে পুণ্য হয়। তবে করোনা পরিস্থিতিতে সেই উৎসবে এবার ছেদ পড়ল রথের দড়িতে টান দেওয়ায়।
রীতি মেনে মন্দির থেকে বিগ্রহ কীর্তন সহকারে নিয়ে আসা হয় রথে। সেখানে নানা মাঙ্গলিক ক্রিয়াকর্ম পালন করা হয়। বড় রথ টানা হল না এবছর। ব্যারিকেড করে ছোট রথ ঘোরালেন পূজারীরা।
এখানকার রথে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা সওয়ার হন না। রথে সওয়ার হন রাধা-মদনমোহন জিউ। তাঁদের ঘিরেই বিষ্ণুপুরের রথ উৎসবে উপচে পড়ে ভক্তদের ভিড়। মঙ্গলবার ব্যারিকেড করেও আটকানো গেল না ভক্তদের আবেগ ও উন্মাদনা। রথ উৎসব কমিটির নিষেধ সত্ত্বেও সাতসকালে ঐতিহ্যের রথ দেখতে উপচে পড়ে মানুষের ঢল।
রাজা নেই কিন্তু ঐতিহ্য টিকে রয়েছে মল্লগড়ের মাটিতে। ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখে রথ উৎসব পালন করে চলেছেন মাধবগঞ্জের উৎসব কমিটি। করোনার জন্য সেই আড়ম্বরে এই প্রথমবার ছেদ পড়ল। এখানে রথের রশিতে টান দিতে সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন মানুষজন। এই প্রথম সেই সুযোগ পেলেন না পুণ্যার্থীরা। রথের রশিতে টান দিতে না পারলেও রাধা-মদনগোপাল জিউকে দর্শন করতে চোখে পড়ল আবেগ।