দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান: ভারতীয় এ দল, সিনিয়র ক্রিকেট দল থেকে শুরু করে ভারতীয় ফুটবল দল, দীর্ঘ ২৫ থেকে ৩০ বছর ফিজিওর কাজ করেছেন দীপ্তি কুমার ঘোষ। কপিল দেব, শচীন তেণ্ডুলকর, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, রাহুল দ্রাবিড় থেকে শুরু করে বাইচুং ভুটিয়া, আই এম বিজয়নদের খুব কাছের মানুষ ছিলেন এই দীপ্তিবাবু। কত বিদেশ সফরে দলের সঙ্গে গিয়েছেন। পেয়েছেন বহু পুরস্কার। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট বা ফুটবল প্রশাসন ভুলে গিয়েছে দীপ্তিবাবুর অবদান। কেউ মনে রাখেনি। কিছু প্লেয়ার ছাড়া কেউ যোগাযোগ রাখেননি তাঁর সঙ্গে। ভারতের ক্রীড়াজগত থেকে যেন মুছেই গিয়েছে একটা বড় অধ্যায়।
পূর্ব বর্ধমানের রসুলপুরের উলারা গ্রামে বাস দীপ্তি কুমার ঘোষের। ১৯৭১ সালে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্পোর্টস অফিসার নিযুক্ত হন তিনি। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি টপকে রাজ্য ও জাতীয় স্তরের ফিজিও হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল বা সিএবিতে স্পোর্টস মেডিসিন নিয়ে কাজ করেছেন। তারপর কখনও ভারতীয় এ ক্রিকেট দল, কখনও সিনিয়র ক্রিকেট দল, কখনও বা ভারতীয় ফুটবল দলে ফিজিওর কাজ করেছেন তিনি। সেরকম উন্নতমানের সরঞ্জাম ছাড়াই প্লেয়ারদের চোট-আঘাত সারিয়ে তুলেছেন। তাঁদের সারাদিনের রুটিন তৈরি করে দিয়েছেন।
ভারতীয় এ দল ও সিনিয়র দলের হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া- সহ একাধিক দেশে গিয়েছে দীপ্তিবাবু। কাজের সুবাদে কপিল দেব থেকে শুরু করে শচীন, সৌরভ, দ্রাবিড়দের খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। দিনরাত এক করে তাঁদের সুস্থ রাখার জন্য ছুটে বেড়াতেন তিনি। কোনও খেলোয়াড় চোট পেলে কী ভাবে তাঁকে দ্রুত সুস্থ করে তোলা যায়, তাঁদের সারাদিনের রুটিন তৈরি থেকে নজরদারি সবই সামলাতেন একার হাতে। আর তাই সবার দাদা হয়ে উঠেছিলেন দীপ্তিবাবু।
ভারতীয় ফুটবল দলে ফিজিও হিসেবে অমল দত্ত, পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়, নইমউদ্দিনদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন দীপ্তি কুমার ঘোষ। আবার বিদেশি কোচ কনস্টানটাইন, মিলোভানদের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি। প্রথম বাঙালি হিসেবে রাশিয়ার কিয়েভ স্টেট ইনস্টিটিউট থেকে অ্যাথলেটিক্স ও ফুটবলের ফিজিও হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন দীপ্তিবাবু। ভারতীয় ফুটবল দলের সঙ্গে সিঙ্গাপুরে এশিয়ান কাপ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ, ঢাকা সাফ গেমস, বাংলাদেশে প্রি ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবল, কলকাতা সাফ গেমস, এশিয়ান গেমস, নেহরু গোল্ড কাপে দায়িত্ব সামলেছেন। আবার অনূর্ধ্ব ১৭ ফুটবল দল নিয়ে পশ্চিম জার্মানি- সহ একাধিক দেশে গেছেন তিনি। ফিজিও হিসেবে মিলেছে বিদেশি সম্মানও।
অবসর নেওয়ার পরে রসুলপুরের উলারা গ্রামের বাড়িতেই থাকেন দীপ্তিবাবু। ৮২ বছর বয়সেও সাইকেল চালিয়ে চষে বেড়ান এলাকা। বাড়িতে বাগান পরিচর্যার পাশাপাশি লেখালেখি করে কাটে সময়। স্মৃতি বলতে এখন শুধু পুরনো দিনের ছবি আর অজস্র মেডেল। সেগুলোর দিকে তাকিয়েও অনেকটা সময় কেটে যায় এই বৃদ্ধের।
দীপ্তিবাবুর কথায়, “খেলোয়াড়দের শরীর-স্বাস্থ্য কী ভাবে সুস্থ রাখা যায় তা নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করেছি। শচীন, সৌরভ, কপিল সবাইকে পরামর্শ দিয়েছি কী ভাবে ফিটনেস বাড়ানো যায়। ইণ্ডিয়া এ টিমের সঙ্গে ইংল্যান্ড সফর করেছিলাম৷ সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন সৌরভ, ম্যানেজার ছিলেন সৈয়দ কিরমানি। সেই সময় আমার কাজ ছিল কোনও খেলোয়াড় চোট পেলে কত তাড়াতাড়ি তাকে সুস্থ করে তোলা যায় সেই চেষ্টা করা৷ ফলে তাঁদের কাছে আমি দাদা হয়ে উঠেছিলাম।”
স্মৃতিতে ভেসে ওঠে ভারতীয় ফুটবল দলে কাটানো মুহূর্তেও কথাও। দীপ্তিবাবু বলেন, “বাইচুং একবার হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পেয়ে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। খুব তাড়াতাড়ি সেই চোট সারিয়ে তুলি। বাইচুং খুব খুশি হয়েছিলেন। অন্যদিকে এশিয়ান গেমসে আমার সঙ্গে কোচের কিছুটা মনোমালিন্য হয়। আসলে কোচ প্রতিদিন অনেক রাত পর্যন্ত খেলোয়াড়দের নিয়ে মিটিং করতেন, যেটা আমার অপছন্দ ছিল। কারণ দিনে প্র্যাকটিস করার পরে রাত জেগে মিটিং শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর। সেই সময় ম্যানেজার ছিলেন চুনী গোস্বামী। তিনি সমস্যা মিটিয়ে দেন। তবে সাফল্যের সঙ্গেই সারাজীবন কাজ করে গেছি।”
ভারতীয় ক্রীড়াজগতে এতদিন যুক্ত থাকা মানুষটার খোঁজ আর ক্রীড়ামহল নেয় না। কিছু ক্রিকেটার ও ফুটবলার অবশ্য যোগাযোগ রেখেছেন। সেটাই স্বান্তনা এই বৃদ্ধের। আগে রাহুল দ্রাবিড় নিয়মিত চিঠি লিখতেন। এখন সেটা অনেক কমে গিয়েছে। মাঝেমধ্যে ফোন করে খোঁজ-খবর নেন সৌরভ, বাইচুং ও বিজয়ন। তারপরেও নিজের গোটা জীবনটা ভারতের ক্রিকেট ও ফুটবলকে দেওয়া দীপ্তিবাবুর মনের কোথাও যেন একটা অবহেলার চাপা দুঃখ রয়েই গিয়েছে। সে দুঃখ নিয়েই সময় কাটাচ্ছেন তিনি।