দিব্যেন্দু ভৌমিক, কোচবিহার: কয়েক দিন হল এক উর্দিধারী পুলিশ আধিকারিকের গান সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইকে ভরে গেছে। প্রচুর শেয়ারও হয়েছে। এখন তাঁর গান একেবারে ভাইরাল হয়ে গেছে। সম্প্রতি তিনি গেয়েছেন জনপ্রিয় বাংলা গান -- "নয়ন সরসী কেন ভরেছে জলে...।"
পিছিয়ে যান ২০১৭ সালে। তখন হাতে নাইন এমএম পিস্তল নিয়ে বলেছিলেন, "আয় মানুষকে মারার আগে আমার মোকাবিলা কর...।" তখন সামনে ছিল একদল সশস্ত্র আন্দোলনকারী। ২০১৭ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বর – সেই দিনগুলো ছিল দার্জিলিং পাহাড়ে রক্ত ঝরা দিন। বাহিনী নিয়ে দার্জিলিং টাউন থানার আইসি সামনে থেকে লড়েছেন সেই সময়। দার্জিলিংয়ে আন্দোলন থেমেছিল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন 'সাহসিকতার সংশাপত্র'। তিনিই এখন কোচবিহারের কোতোয়ালি থানার আইসি সৌম্যজিৎ রায়।
শেষ রাতে কোয়াটার্সে ফিরে বিছানায় শরীরটা একটু এলিয়ে দিয়েই আবার সকালে রাজনগরের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত ছুটে বেড়ান সৌম্যজিৎ। গ্রাম থেকে হাটে। নিজের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর ফেসবুকে দিয়ে রেখেছেন লক ডাউনের প্রথম পর্বেই যাতে বিপদে পড়লে লোকে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন।
কখনও তিনি ছুটে যাচ্ছেন তোর্সা চরের মানুষদের কাছে। ওঁরা আজ কাজ হারা। সদর মহকুমাশাসক সঞ্জয় পালও সারাদিন রাস্তায়। বাড়ি বাড়ি মাছ থেকে ওষুধের হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা করে ফেলেছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে সংগত দিচ্ছেন সৌম্যজিৎ। মদনমোহন ঠাকুর বাড়ির সামনের ভিক্ষুকরা এখন কী খাচ্ছেন সেদিকেও তাঁর নজর। কোন বৃদ্ধা পথে পড়ে রয়েছেন তাও নজর রাখছেন। টোটো বন্ধ। কোনও এক সাংবাদিকের মেসেজ পেয়ে তখনই ব্যবস্থা। রাত যদিও তখন ১২টা বেজে গেছে।
সহকর্মীদের নিয়ে না খেতে পাওয়া মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন। দোকানের সামনে অকারণ ভিড়, রাস্তায় আড্ডা ও বাইকের দাপাদাপিও সামলাচ্ছেন সেই একই সৌম্যজিৎ। তখন অন্য রূপ।
শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ও পঞ্চায়েত এলাকায় তিনি ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন। পুলিশ সুপারের পরামর্শে ইতিমধ্যেই রক্তদান শিবিরের আয়োজন করেছেন থানায়।
সৌম্যজিৎ রায় বলেন, “অনেকে বুঝতেই পারছেন না যে কী ভয়ানক অবস্থা। তাই থানায় না থেকে রাস্তায় থাকি। অন্য আধিকারিক ও পুলিশ কর্মীরাও তাই করছেন। আমি একা আর কি করছি! সব থানাই প্রচুর কাজ করছে।”
এত ব্যস্ততার মাঝে একটু সময় পেলেই তিনি ফেসবুক লাইভে গান করছেন। তারপরে আবার বেরিয়ে পড়ছেন মাইক হাতে। কখনও অনুরোধ করছেন কখনও আবার নির্দেশ দিচ্ছেন লকডাউনের নিয়ম মেনে চলার জন্য। আবার প্রয়োজনে পুলিশকে যাতে লোকে ফোন করেন সেকথাও বলছেন। কোচবিহার সদরের মহকুমাশাসক সঞ্জয় পাল বলেন, "আমাদের অনেকেরই আইসি সাহেবের কাছ থেকে শেখা উচিত। অসম্ভব ভাল পুলিশ অফিসার।"