
শেষ আপডেট: 9 June 2019 10:38
এ বছরও বাচ্চাদের গরমের ছুটিকেই কাজে লাগিয়েছেন অভিরূপ। তাদের নিয়ে বানিয়ে ফেলেছেন 'পাগলা দাশু'। কচিকাঁচাদেরও উৎসাহে কোনও কমতি নেই। বরং প্রিয় দাদার প্যাশনে মেতেছে ওরাও। কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে ময়দানে। চলতি বছর প্রায় ২ মাসের গরমের ছুটি ঘোষণা করেছিল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার। পরে অবশ্য সে ছুটির মেয়াদ খানিকটা কমে যায়। কিন্তু তাতে কী! এলাকার স্কুলগুলিতে গরমের ছুটি পড়ার পরেই পাড়ার কচিকাঁচাদের নিয়ে কিছু নতুন করার কথা ভেবেছিলেন জলপাইগুড়ির অভিরূপ গঙ্গোপাধ্যায়। ব্যস, যেমন ভাবা তেমন কাজ। আর বাচ্চাদের নিয়ে সিনেমা বানাতে সুকুমার রায়ের সৃষ্ট চরিত্র 'পাগলা দাশু'-র থেকে ভালো আর কীই বা হতে পারে।
স্ক্রিপ্ট থেকে ছবির পরিচালনা সবটাই একা হাতে সামলেছেন বাচ্চাদের প্রিয় জিকোদাদা (অভিরূপের ডাকনাম)। কোটি কোটি টাকা খরচ করে নামিদামি চিত্রতারকা দিয়ে নয়, বরং জলপাইগুড়ি কোরানি পাড়ার ১১ জন স্কুল পড়ুয়াকে নিয়েই সিনেমা বানিয়েছেন অভিরূপ। জমিয়ে অভিনয় করছে বাচ্চারাও। আর ছবির বাজেট শুনলে সত্যি চমকে উঠতে হয়। যাতায়াত, বাচ্চাদের খাওয়া-দাওয়া, পিকনিক খরচ সবমিলিয়ে মাত্র দু'হাজার টাকা।
এত কম বাজেটে সিনেমা! কী ভাবে এমন অসাধ্য সাধন করলেন এই তরুণ?
অভিরূপের কথায়, "ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। সিনেমা আমার নেশা-শখ-প্যাশন সব। তাই টাকাটা বিশেষ সমস্যা নয়। ঠিকমতো প্ল্যান করে চললে সবটাই সম্ভব হয়।" শ্যুটিং আপাতত শেষ। ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গিয়েছে ছবির ট্রেলরও। এখন ফাইনাল এডিটিং চলছে জোরকদমে। নিজের ছবি নিয়ে কী বলছেন পরিচালক নিজে? অভিরূপের কথায়, "বাচ্চাদের অসাধারণ অভিনয়ে ফুটে উঠেছে পাগলা দাশু, ব্রজলাল সহ অন্যান্য বিভিন্ন চরিত্র। আশা করছি সবারই ভালো লাগবে। এডিটিং শেষ হলেই আমার ইউটিউব চ্যানেলে রিলিজ হবে ছবি।"
জিকোদাদার ছবিতে অভিনয় করে দারুণ খুশি বাচ্চারাও। দাশুর চরিত্রে অভিনয় করা শিশুশিল্পী দেয়াসীন চক্রবর্তীর কথায়, "আমি জিকোদার সব ছবিতে অভিনয় করি। গত দু'বছর ধরে জিকোদার সঙ্গে কাজ করছি।রামচরণের চরিত্রে অভিনয় করা আর এক শিল্পী সুদর্শন সরকার জানিয়েছে, "আমার নিজের একটি ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে। কিন্তু সেখানে হিন্দি সিনেমাই বানিয়ে বেশি আপলোড করা হয়। পাগলা দাশুতে অভিনয় করতে পেরে খুবই ভালো লাগছে। এটা তো আমাদের ছেলেবেলার নস্ট্যালজিয়া।"
পরিচালক নিজেও জানিয়েছেন, বাচ্চাদের তিনি বরাবরই খুব ভালোবাসেন। তিনি বলেন, "ওদের সঙ্গে সবসময়ই আমার মানসিকতা খুব মিলে যায়। মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পর পাড়ার ছোটদের নিয়ে মোবাইল ফোনে শ্যুটিং করে মাত্র এক দিনে বানিয়েছিলাম নন্টে ফন্টে। কোনও ভাবে সেটা দেখতে পান আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ফিল্ম মেকার অভ্রদ্বীপ ঘটক। তিনি আমার ছবিটির খুব প্রশংসা করেন। এরপর থেকেই বলতে পারেন সাহস একটু বেড়েই যায়। নয় নয় করে ৫টা ছবি বানিয়ে ফেলেছি।"
কিন্তু এত কম খরচে কী সত্যি সিনেমা বানানো সম্ভব?
জবাবে হেসে অভিরূপ বলেন, এখানে কেউই সে ভাবে কোনও কিছুর জন্য বিশাল টাকা চেয়ে বসেন না। লোকেশনের জন্য খরচ প্রায় নেই বললেই চলে। যাতায়াত স্বরূপ ওই ধরুন টোটো ভাড়া আর বাইকের তেল। তবে শ্যুটিং শেষে সব্বাইকে নিয়ে একটা পিকনিক কিন্তু মাস্ট। সব মিলিয়ে খরচ বড়জোর ২ হাজার। ওটা আমি নিজের পকেটমানি বাঁচিয়েই জমিয়ে রাখি।
তবে সরকারের কাছে একটা অনুরোধ রয়েছে অভিরূপের। তাঁর কথায়, "ছবির এডিটিংয়ের জন্য জলপাইগুড়িতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিনামূল্যে কিংবা স্বল্পমূল্যে এডিটিং সেটআপ থাকলে খুবই উপকার হয় আমাদের মতো কম বাজেটে ছবি করা পরিচালকদের। এ ছাড়া যদি রুপকলা কেন্দ্র বা অন্য কোনও সংস্থা আমাদের শহরে তালিমের ব্যবস্থা করে, তাহলে তো খুবই ভালো হয়।"
অভিরূপের এই কাজের ভূয়সী প্রশংসা করছেন অভ্রদ্বীপ ঘটকও। তিনি বলেন, "আজকাল বাচ্চাদের জন্য ছবি তো খুবই কম হয়। সে ক্ষেত্রে অভিরূপের এই প্রয়াস নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। নামিদামি তারকার বদলে, পাড়ার ছোট্ট বাচ্চাদের নিয়ে মোবাইলে শ্যুট করে সিনেমা বানানো তো চাট্টিখানি কথা নয়। ও যে পেরেছে এই জন্যই সকলের উচিত ওকে আরও বেশি করে উৎসাহ দেওয়া।"