শঙ্খদীপ দাস
গত কিছুদিন ধরেই বাংলার রাজনৈতিক মহলের আলোচনায় একটা বিষয় ঘুরছে, তা হল কেন্দ্রে মন্ত্রী হতে পারেন রাজ্য বিজেপি নেতা মুকুল রায়। কেউ বা একধাপ এগিয়ে এও আন্দাজ লাগাতে শুরু করেছিলেন, কোন মন্ত্রকের দায়িত্ব পেতে পারেন মুকুলবাবু। তারই মধ্যে আবার দেখা যায়, বাংলায় অমিত শাহর ডেবিউ ভার্চুয়াল সভায় প্রথম বক্তাই একদা তৃণমূলের সেকেন্ডম্যান। এবং সেই সভা শেষ করেই বিকেলে দিল্লি পাড়ি দিয়েছেন তিনি। তার পর গত বুধবার ও শুক্রবার দু’দফায় তাঁর বৈঠক হয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহর সঙ্গে।
লকডাউনের মধ্যেও দু’জনের দেখা তো হল, কিন্তু ফল কী হল?
বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সূত্রে বলা হচ্ছে, এক লাইনে বলা যায়, মুকুলবাবুকে দলে যথাযোগ্য ‘মর্যাদা’ (পড়ুন পদ ও গুরুত্ব) দেওয়ার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন অমিত শাহ। এও ইঙ্গিত দিয়েছেন, উনিশের লোকসভা ভোটের মতোই একুশের নির্বাচনেরও একটা বড় দায়িত্ব তাঁকে নিতে হবে। সে জন্য এখন থেকেই তাঁকে আরও সক্রিয় হতে উৎসাহ দিয়েছেন তিনি।
অমিত শাহর সঙ্গে বৈঠকের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে মুকুলবাবু বলেছেন, “ওঁর সঙ্গে বৈঠক খুবই সন্তোষজনক হয়েছে। বিধানসভা ভোটের ব্যাপারে উনি খুবই ‘সিরিয়াস’ ও ‘সিনসিয়ার’।"
পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, অমিত-মুকুল বৈঠকের ব্যাপারে এ কথাগুলো হয়তো ঠিক। তবে এ সব ওপর ওপর তথ্যের নেপথ্যেও অনেক কথা রয়েছে। তা হল-- মুকুল বাবু বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন প্রায় তিন বছর হতে চলল। এর মধ্যে তাঁকে দলের জাতীয় কর্মসমিতির সদস্য করেছেন মোদী-শাহ। তা ছাড়া লোকসভা ভোটের সময়ে তাঁকে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা দায়িত্ব দিয়েছেন। কিন্তু সংগঠনে বা সরকারের এখনও কোনও পদ পাননি মুকুলবাবু। লোকসভা ভোটের আগে তিনি হাতে ধরে যাঁদের বিজেপিতে নিয়ে এসেছিলেন, সেই খগেন মুর্মু, নিশীথ প্রামাণিক, শান্তনু ঠাকুর, দুলাল বর, সৌমিত্র খাঁ-রা বিজেপিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এঁদের অনেকে সাংসদ হয়েছেন, সংগঠনে পদও পেয়েছেন। কিন্তু বাংলার রাজনীতিতে মুকুলবাবুর ‘যোগাযোগ’ এখানেই সীমিত নয়। কিন্তু পদ ও কর্তৃত্ব না পেলে মুকুলবাবুর সেই ‘যোগাযোগ’ বা ঘনিষ্ঠদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যেই ভোট আসছে। ফলে সেই সব ‘যোগাযোগের’ মধ্যে অস্থিরতাও বাড়ছে। কারণ রাজনীতি ভিন্ন তাঁদের আর করণীয় কিছু নেই। হতে পারে সেই বার্তাটা অমিত শাহদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আগ্রহ ছিল মুকুলবাবুর।
এ ব্যাপারটা যে অমিত শাহদের জানা নেই তা নয়। মুকুলবাবু যাতে দলে যথাযোগ্য মর্যাদা পান সে ব্যাপারে মোদী-অমিত শাহরা প্রকাশ্যে বার্তা দেওয়ার ত্রুটি রাখেননি। কলকাতা সফরে এলে বিমানবন্দরে দাঁড়িয়েই অন্যদের তুলনায় বেশি সময় ধরে মুকুলবাবুর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কথোপকথন ফ্রেমে ধরা রয়েছে। শহিদ মিনারের সভা থেকে অমিত শাহ খোলাখুলিই বলেছেন, লোকসভা ভোটে বাংলায় ১৮টি আসন জেতার নেপথ্যে মুকুলবাবুর অন্যতম ভূমিকা রয়েছে। ক'দিন আগে অমিত শাহর ভার্চুয়াল সভায় মুকুলবাবুকে যে প্রথমে বলতে দেওয়া হয়েছে—তাও দিল্লির নির্দেশেই।
মুকুলবাবুকে রাজ্য সংগঠনে কোনও পদ দেওয়া অনিবার্য কারণেই সম্ভব নয়। কারণ, দিলীপ ঘোষ রাজনীতিতে তাঁর তুলনায় বয়সে এবং অভিজ্ঞতায় অনেক নবীন। ফলে তাঁর জন্য বিকল্প স্থান হতে পারে কেন্দ্রীয় সংগঠন বা মন্ত্রিসভা। কিন্তু কোভিড মোকাবিলার জন্য তা বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। হতে পারে সেই বাস্তবতার কথা জানিয়েছেন অমিত শাহ। সেই সঙ্গে অদূর ভবিষ্যতে তাঁর মর্যাদা ও গুরুত্ব বাড়ানোর ব্যাপারে আশ্বস্ত করে উৎসাহিত করতে চেয়েছেন।
মন্ত্রিসভা ও সাংগঠনিক রদবদল
এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে মোদী-অমিত শাহরা যখন এতটাই সহানুভূতিশীল তখন দলে যোগ দেওয়ার আড়াই বছর পরেও কেন কোনও পদ পেলেন না মুকুলবাবু?সর্বভারতীয় বিজেপির একটি সূত্রের মতে, একে এক প্রকার সময়ের ফের বলা যেতে পারে। সংসদের বাজেট অধিবেশন শেষ হতেই সর্বভারতীয় বিজেপির সংগঠন ও মন্ত্রিসভায় রদবদল কার্যত নিশ্চিত ছিল। সেই রদবদলে যে মুকুলবাবুর ভাল কিছু হতে পারে সেই ইঙ্গিত দিলীপ ঘোষদেরও দিয়েছিল কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। কিন্তু কোভি়ড সংক্রমণের কারণে তা অনেকটাই ভেস্তে যায়। দল ও সরকারের অগ্রাধিকারও বদলে গিয়েছে। ফলে জেপি নাড্ডা বিজেপি সভাপতি হওয়ার পর যেমন এখন সাংগঠনিক রদবদল হয়নি, তেমনই কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় রদবদলও বকেয়া রয়েছে। করোনা সংক্রমণের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত তা হওয়া মুশকিল।
তৃণমূলের প্রস্তাব
পরিস্থিতি যখন এমনই তখন রাজ্য রাজনীতির অন্দরমহলে রটে গিয়েছে, মুকুলবাবুকে দলে ফেরানোর জন্য আগ্রহী তৃণমূল কংগ্রেস। সে জন্য তাঁকে ইতিমধ্যেই বার্তা দেওয়া হয়েছে তৃণমূলের উপর মহল থেকে। এই রটে যাওয়া খবরের সত্যতা তৃণমূলের কোনও দায়িত্বশীল নেতা বা মুকুলবাবু স্বীকার করেননি। তবে প্রবাদও তো রয়েছে, যা রটে তার কিছুটা বটে।
পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, এই রটনার মধ্যে যদি কোনও সার থাকে এবং সেই প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে পোড় খাওয়া নেতা যদি পুরনো শিবিরে ফিরে যান তা হলে বিজেপির জন্য ধাক্কা বইকি। ফলে এমন রটনায় মুকুলবাবুর ক্ষতি বিশেষ নেই। কারণ, এর ফলে তিনি যেমন আলোচনায় থাকবেন, তেমনই দিল্লি বিজেপির উপরেও চাপ থাকবে।
এখন প্রশ্ন হল, মুকুলবাবু কি ফের তৃণমূলে ফিরে যেতে পারেন? সেই সম্ভাবনা কতখানি? মুকুলবাবুর ঘনিষ্ঠ এক নেতার কথায়, চোদ্দ সালের ভোটের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে টানা ১১ মাস দূরত্ব রেখে চলেছিলেন মুকুলবাবু। ষোলো সালের ভোটের আগে তৃণমূলই তাঁকে কাছে টানতে তৎপর হয়। ভোটে মুকুলবাবুকে অতিশয় সক্রিয় ভূমিকাতেই দেখা যায়। কিন্তু ষোলোর ভোট মিটতেই দলে ক্রমশ কোণঠাসা হতে শুরু করেন প্রাক্তন রেলমন্ত্রী। এতটাই যে দল ছেড়ে বেরনো ছাড়া তাঁর উপায়ন্তর ছিল না। তা ছাড়া গত দু’বছরে নদিয়ায় বিধায়ক খুন থেকে শুরু করে রাজ্য পুলিশের দায়ের করা কয়েক ডজন মামলায় মুকুলবাবু যে রকম নাস্তানাবুদ হয়েছেন, গত বিশ বছরের রাজ্য রাজনীতিতে তেমনটা কারও সঙ্গে হয়নি। তবে সে সব অতীতকে পাশে সরিয়ে রেখে বলা যায়, যে কথা রটছে তাতে সবথেকে খুশি হয়তো মুকুলবাবু নিজেই।