দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ সুন্দরবন। ২০০৯ সালের আয়লা, কিংবা পরবর্তী সময়ে ফণী, বুলবুল এমনকি সাম্প্রতিক কালের সুপার সাইক্লোন আমফানের হাত থেকে সুন্দরবনের মানুষদের রক্ষা করেছে এখানকার ম্যানগ্রোভ অরণ্য। নিঃসন্দেহে সমস্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ব্যাপক ঝড়ঝাপ্টা সয়েছেন সুন্দরবনের সাধারণ মানুষ। কিন্তু এই ক্ষয়ক্ষতির থেকেও অনেক বড় বিপদ হতে পারত যদি না ম্যানগ্রোভ অরণ্য থাকত। তবে আজকাল সুন্দরবনের এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছে একদল অসাধু, সুযোগসন্ধানী মানুষ।
আমফানের ক্ষত এখনও তরতাজা সুন্দরবনের প্রায় প্রতিটি কোণায়। ছ'মাস আগের সেই ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডবলীলার চিহ্ন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সমগ্র সুন্দরবন জুড়ে। কিন্তু এই দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থাতেও ক্রমাগত ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করে চলছে মাছের ভেড়ি তৈরির কাজ। এইসব ভেড়িতে মাছ চিংড়ি চাষ করে বেশি মুনাফা হয়। আর সেই অতিরিক্ত মুনাফার লোভেই ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করে সুন্দরবনকে শেষ হওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে এখানকারই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী।
এর মধ্যেই সুন্দরবনের বাসন্তী ব্লকের আনন্দাবাদ গ্রামে বিশাল এলাকা জুড়ে ম্যানগ্রোভ নিধন হয়েছে। উল্লেখ্য, মাতলা নদীর তীরবর্তী আনন্দাবাদ গ্রাম আয়লায় প্লাবিত হয়েছিল। সেই সময় প্রায় ৮ কিলোমিটার জায়গায় ম্যানগ্রোভ লাগানো হয়েছিল। নদীবাঁধ শক্তপোক্ত করা হয়েছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব কিছুটা হলেও রুখে দেওয়ার জন্য গত প্রায় ১১ বছর ধরে এই এলাকার ম্যানগ্রোভ ব্যাপক ভাবে বেড়ে উঠেছিল। বুলবুলের সময় এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যই রক্ষা করেছিল আনন্দাবাদ গ্রামের বাসিন্দাদের।
কিন্তু চলতি বছর মার্চ মাসে শুরু হয় মহামারী করোনা ভাইরাসের দাপট। তারপর সরকার করোনাকে প্রতিহত করার জন্য দীর্ঘ সময় লকডাউন জারি করে। পরিস্থিতির শিকার হয়ে কর্মহীন হন অনেক। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ম্যানগ্রোভ অরণ্যে নজর দিয়েছে বেশ কিছু অসাধু চক্র। কার্যত উদ্যোগ নিয়ে শুরু হয় সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ নিধন। অথচ সুন্দরবনকে বাঁচাতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একশো দিনের শ্রমিকদের কাজের শ্রমিক লাগিয়ে পাঁচ কোটি ম্যানগ্রোভ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। সেই কাজও চলছে দুরন্ত গতিতে। আর তারই পাশাপাশি প্রশাসনের নজর এড়িয়ে চলছে ম্যানগ্রোভ নিধন। কীভাবে এমনটা হতে পারে তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে সমগ্র সুন্দরবন জুড়ে!
ম্যানগ্রোভ ধ্বংসকারীদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন সুন্দরবনের মানুষ। ইচ্ছা থাকলেও প্রাণ ভয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি স্থানীয় বাসিন্দারা। যখন ব্রাত্যবসু বনমন্ত্রী ছিলেন, সেই সময় ঝড়খালির এক অনুষ্ঠানে বনমন্ত্রীর সামনে সোচ্চার হয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন তৎকালীন জয়নগরের সাংসদ প্রতিমা মন্ডল ও গোসাবার বিধায়ক জয়ন্ত নস্কর। তারপর অবশ্য সাময়িক ভাবে অসাধু চক্রের অরণ্য নিধন বন্ধ হয়। কিন্তু ফের অবস্থা যে কে সেই।
গতকাল অর্থাৎ সোমবার দুপুরবেলায় বাসন্তী ব্লকের মাতলা নদীর তীরে কামারডাঙা সর্দারপাড়া এলাকায় ম্যানগ্রোভ অরণ্য কেটে মাছের ভেড়ি তৈরির তোড়জোড় শুরু হয়। গোপন সূত্রে বাসন্তী থানার আইসি আবদুর রব খানের কাছে এই খবর পৌঁছয়। ঘটনার গুরুত্ব বুঝে সঙ্গে সঙ্গেই বাসন্তীর বিডিও সৌগত সাহাকে বিষয়টি জানান আইসি। এরপর আর একটুও সময় নষ্ট না করে বিশাল পুলিশবাহিনী পৌঁছয় ঘটনাস্থলে। সেখানে গিয়ে দেখা যায় মাতলা নদীর তীরে কিছু অসাধু ব্যক্তি বাঁধ দেওয়ার অছিলায় জেসিবি মেশিন দিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ম্যানগ্রোভ অরণ্য ধ্বংস করে মাছের ভেড়ি তৈরি করছে। ঘটনাস্থল থেকে দুর্গাপদ সর্দার, রবীন সর্দার এবং মারুফ মিদ্দা নামের তিন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আটক করা হয়েছে ওই জেসিবি মেশিনটিও। পাশাপাশি বেআইনি বাঁধ ভেঙে দেওয়া হয়। ধৃতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা রুজু করেছে বাসন্তী থানার পুলিশ। আজ ধৃতদের আদালতে তোলা হয়েছে।