দ্য ওয়াল ব্যুরো: বয়স প্রায় ১০০ ছুঁইছুঁই বর্ধমানের সুহারী গ্রামের বাসিন্দা শংকরী বালা দেবীর। কিন্তু তাঁর সাহস আর উদ্দীপনা দেখে সকলেই বৃদ্ধাকে বলছেন 'ইয়ং লেডি', 'আয়রন ওম্যান'। শংকরী দেবীর শরীরে বাসা বেঁধেছে মারণ রোগ। স্তনের উপরের অংশের চামড়ায় ধরা পড়েছে ক্যানসার। ডাক্তারি পরিভাষায় রোগের নাম স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে মারণ রোগ। চিকিৎসার অবিলম্বে প্রয়োজন। বৃদ্ধা ঠাকুমাকে নিয়ে তাই কয়েকমাসে ধরে রাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরেছেন নাতি সত্যজিৎ।
কিন্তু বৃদ্ধার বয়স এবং হার্টের কন্ডিশন দেখে অস্ত্রোপচারে রাজি হয়নি কোনও হাসপাতাল। না জবাব শুনতে হয়েছে রাজ্যের নামি মেডিক্যাল কলেজ থেকেও। অপারেশনের রিস্ক নিতে রাজি হয়নি বেসরকারি হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমে। অবশেষে শংকরী দেবী ভর্তি হন সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। যদিও নানা পরীক্ষানিরীক্ষার পর এই হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া বিভাগ জানিয়ে দেয় রোগীর হৃদযন্ত্রের যা অবস্থা তাতে পুরোপুরি অ্যানেসথেসিয়া করে অস্ত্রোপচার কোনওমতেই সম্ভব নয়।
কিন্তু চিকিৎসকদের অভয় দেন প্রায় সেঞ্চুরির দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া শংকরী দেবী। বলেন, অপারেশন হতেই হবে। চিকিৎসা না হয়ে মৃত্যুর চেয়ে বরং অপারেশন টেবিলেই যা হওয়ার হোক। হাসপাতালের চিকিৎসকরাও জানিয়েছেন, ডাক্তারদের সঙ্গে অত্যন্ত ভাল ব্যবহার করতেন শংকরী দেবী। এমনকি তাঁদের শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক রয়েছে কিনা, তাঁরা ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করেছেন কিনা সেই খোঁজও নিতেন মাথায় হাত বুলিয়ে। শতবর্ষের কাছাকাছি পৌঁছনো বৃদ্ধা মায়া-মমতা দিয়ে আপন করে নিয়েছিলেন সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সকলকে। শংকরী দেবীর চনমনে ভাব দেখে তাঁকে ঠাকুমা বলতেই নারাজ সবাই। ডাক্তার-নার্স থেকে শুরু করে সকলেই রীতিমতো তাঁর ফ্যান হয়ে গিয়েছেন এই ক'দিনে।
কিন্তু সেসবের পরে অস্ত্রোপচারের আগে একটু কিন্তু কিন্তু ভাব ছিলই। তবে নাছোড়বান্দা শংকরী দেবী অপারেশন করাবেনই। এমনকি ওটিতে ঢুকেছে নিজে পায়ে হেঁটে। ট্রলি বা হুইল চেয়ারের কোনও বালাই নেই। ভয় করছে কিনা জিজ্ঞেস করায় ডাক্তারদের অভয় দিয়ে বলেছেন, "ভয় কীসের, তোমরা আছো তো।" রোগীর মনোবল দেখেই অস্ত্রোপচার করার সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকরা। লোকাল অ্যানেসথেসিয়া দিয়েই হয়েছে অপারেশন। সোমবার দিব্যি হাসপাতাল থেকে গটগটিয়ে হেঁটে বেরিয়ে গাড়ি চড়ে বাড়ি গিয়েছেন শংকরী দেবী।
সাগর দত্ত হাসপাতালে সার্জেন ডক্টর মানস গুমটা, অধ্যক্ষা ডক্টর হাসি দাশগুপ্ত এবং অন্যান্যরাও উচ্ছ্বসিত শংকরী দেবীকে নিয়ে। প্রায় সকলেই বলছেন এই বয়সে এই উৎসাহ, দেখার বিষয়। ডক্টর গুমটার কথায়, "পুরো কৃতিত্ব আমার টিমের। আমার সহকর্মী অমিতেশ ঝা, আমি এবং টিমের বাকি সকলে মিলেই অস্ত্রোপচারটা সফল করেছি। অবশ্যই শংকরীদেবীর অদম্য সাহস আর মনোবল এই রিস্কটা নেওয়ার জন্য আমাদের সাহস যুগিয়েছে। ওঁকে সুস্থ করে বাড়ি পাঠাতে পেরেছি এটা ভেবেই ভাল লাগছে।" অধ্যক্ষা ডক্টর হাসি দাশগুপ্তর কথায়, "শংকরীেদেবীকে কুর্নিশ না জানিয়ে উপায় নেই। ওঁর মনোবলের জন্যই সফল হয়েছে অস্ত্রোপচার।"
২৪ ঘণ্টা হল অস্ত্রোপচার সেরে বাড়ি ফিরেছেন প্রায় ১০০-তে পৌঁছে যাওয়া শংকরী বালা দেবী। যদিও তাঁকে দেখে মনেই হচ্ছে না কোনও ধকল গিয়েছে শরীরে। এমনকি হাসপাতালে কাপড়ও নাকি নিজেই কেঁচে নিয়েছেন ঠাকুমা, এমনটাই জানিয়েছেন নাথি সত্যজিৎ। তাঁর কথায়, "এ কদিন হাসপাতালে দাপিয়ে বেরিয়েছে ঠাকুমা। সবার সঙ্গে দারুণ ভাব হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তারবাবুরা আমাদের দারুণ সাহায্য করেছেন। সঠিক চিকিৎসা করে অপারেশনের পর ঠাকুমাকে সুস্থ করে বাড়ি আনতে পেরেছি ওঁদেরই জন্য।"