
শেষ আপডেট: 28 June 2021 03:58
আছে। ভাইরাস যখন খুব বেশি বদলাতে শুরু করে অর্থাৎ জিনগত বিন্যাসের পরিবর্তন হতে থাকে, তখনই এই ধাক্কাগুলো পর পর আসে। কোভিডের প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউও এইভাবেই এসেছে। এখন তৃতীয় ঢেউ আসার সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। ডাক্তারবাবু বললেন, কোভিডের তৃতীয় ঢেউ যদি আসেও তাহলেও তা খুব বেশি মারাত্মক হবে না। কারণটা কী? ডাক্তারবাবুর মতে, ভাইরাসের যে বদলগুলো হচ্ছে তা কিন্তু খুব একটা সাঙ্ঘাতিক পর্যায়ে হচ্ছে না। এই যে ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট থেকে ডেল্টা প্লাস এল, এর মধ্যে বদলটা সামান্যই হয়েছে। তাই যে নতুন ভাইরাস তৈরি হয়েছে তা খুব বেশি প্রভাব ফেলবে তেমনটা নাও হতে পারে। আরও একটা কারণ হল, দেশে প্রথম যখন সার্স-কভ-২ মহামারী দেখা দিয়েছিল তখন মানুষ তার প্রতিরোধের উপায় জানত না। ভ্যাকসিনও তৈরি হয়নি তখন। কিন্তু এখন নানারকম ভ্যাকসিন তৈরি হয়ে গেছে। সংক্রমণ সারানোর চিকিৎসাপদ্ধতিও আছে। মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও আগের থেকে বেড়েছে। ভ্যাকসিন নিয়েছেন যাঁরা তাঁদের শরীরে ইমিউনিটিও বেড়েছে। তাই তৃতীয় ঢেউ এলেও তা খুব বেশি প্রাণঘাতী হবে বলা যায় না।
মহামারীর সময় এই ওয়েভগুলো কেন আসে? আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (কমিউনিটি মেডিসিন) ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাঃ অনির্বাণ দলুই বললেন, যখন কোনও মহামারী ছড়িয়ে পড়ে তখন একের পর এক এমন ওয়েভ আসতেই থাকে। এটা নির্ভর করে চারটি বিষয়ের ওপরে—এক, ভাইরাস কতটা সংক্রামক এবং কত দ্রুত মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে, দুই, মানুষের ব্যবহার, অর্থাৎ ভাইরাস ঠেকাতে মানুষ কতটা সতর্ক, তিন, ভাইরাস প্রতিরোধী ভ্যাকসিন এবং চার, ভাইরাসের মিউটেশন বা জিনগত বদল। ডাক্তারবাবু বললেন, কোভিডের তৃতীয় ঢেউ আসবেই। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই আসার সম্ভাবনা প্রবল। তবে এই থার্ড ওয়েভ খুব একটা প্রাণঘাতী হবে বলে এখনই কোনও তথ্য মেলেনি। যদি না গোষ্ঠী সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ বহু মানুষের ভিড়, মেলামেশা থেকে সংক্রমণ ছড়ায়। ডাক্তারবাবু বলছেন, চাইলে এই তৃতীয় ঢেউকে রুখে দেওয়া সম্ভব।
তৃতীয় ঢেউ বিশাল কিছু একটা হবে তার কোনও বৈজ্ঞানীক ভিত্তি নেই। এতটাও আতঙ্কের কারণ নেই। সব জায়গায় সমানভাবে হবে না। দ্বিতীয় ঢেউয়ের গতি যে জায়গাগুলোতে কম ছিল সেখানেই থার্ড ওয়েব আসার সম্ভাবনা বেশি। বাচ্চাদের নিয়ে যে টা শোনা যাচ্ছে সেটা একেবারেই ঠিক নয়। বলা হচ্ছে প্রথম ঢেউয়ে বয়স্করা আক্রান্ত হয়েছিল, দ্বিতীয় ঢেউয়ে কম বয়সীরা এবং তৃতীয় ঢেউ এলে বাচ্চারা নাকি বেশি সংক্রমিত হবে। ডাক্তারবাবু বলছেন, এটা একেবারেই ভ্রান্ত প্রচার। কারণ শতকরা হিসেবে দেখলে, প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউতে বাচ্চারা আট বা সাড়ে আট শতাংশের বেশি আক্রান্ত হয়নি। তাই বয়সের হিসেবে শতকরা হিসেবটা খুব বেশি সাঙ্ঘাতিক নয়।
আরও একটা কারণ হল, বাচ্চাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি। ছোট থেকেই বাচ্চাদের নানারকম টিকা দেওয়া হয়। তাই ইমিউনিটি বেশিই থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে নানা দেশেই সংক্রমণের হার খতিয়ে দেখতে সেরো সার্ভে করা হয়েছে। আমাদের দেশেও হয়েছে। শহর, গ্রাম, প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে সেরো সার্ভে করে দেখা গেছে বাচ্চাদের প্রায় ৫৫-৫৬ শতাংশের শরীরেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। এর মানে হল, বাচ্চাদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়েছে এবং রোগ তার প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। যেহেতু রোগ মারাত্মক আকার নেয়নি এবং বেশিরভাগই উপসর্গহীন বা অ্যাসিম্পটোমেটিক ছিল তাই বোঝা যায়নি। অর্থাৎ এখান থেকেই স্পষ্ট, বাচ্চাদের মধ্যে সংক্রমণজনিত জটিল রোগ ছড়াবার ভয় তেমন নেই। প্রাণ সংশয়ের সম্ভাবনা একেবারেই নেই। ভ্যাকসিন না নিয়েও যদি ৫৬ শতাংশ বাচ্চার শরীরে অ্যান্টিবডি থাকে তাহলে ভ্যাকসিন নেওয়ার পরে রোগ প্রতিরোধ অনেকটাই বাড়বে। তৃতীয় ঢেউ এলেও ভয়ের কারণ থাকবে না।
চিন্তা কি একেবারেই নেই?
ডাঃ সুবর্ণ গোস্বামী বলছেন, যে বাচ্চাদের কোমর্বিডিটি আছে বা শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা আছে তাদের সাবধান থাকতে
হবে। তার জন্য অক্সিজেন স্যাচুরেশন লেভেল পরীক্ষা করা দরকার। জন্মের পর থেকে ২ মাস অবধি বয়সের শিশুর যদি মিনিটে শ্বাসের হার ৬০ বা তার বেশি হয় তাহলে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে, ২ মাস থেকে ২ বছর অবধি শিশুদের মিনিটে শ্বাসের হার ৫০ বা তার বেশি হলে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে, ১ বছর থেকে ৫ বছরের মধ্যে বাচ্চার মিনিটে শ্বাসের হার ৪০ বা তার বেশি হলে সতর্ক হতে হবে, আর ৫ বছরের ওপরে শিশুদের মিনিটে শ্বাসপ্রশ্বাসের হার ৩০ বা তার বেশি হলে তখন হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। আর যদি দেখা যায়, বাচ্চা দুর্বল হয়ে পড়েছে, খিঁচুনি হচ্ছে, শ্বাস নেওয়ার সময় পাঁজরের অংশটা ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে, গোঙানির আওয়াজ হচ্ছে তখন বাবা-মায়েদের সতর্ক হতে হবে। তাছাড়া পেট খারাপ হলে ওআরএস ও জ্বর হলে প্যারাসিটামল—আর কোনওরকম ওষুধ দেওয়ার দরকার নেই। উপসর্গ বুঝলে ডাক্তারের কাছে যান, কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েড একেবারেই খাওয়াবেন না।
বাচ্চাদের জন্য বাবা-মায়ের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে বললেন ডাঃ অনির্বাণ দলুই। তিনি জানালেন, স্কুল খোলার চিন্তাভাবনা হচ্ছে। তাই স্কুলগুলিতে যদি দুটো করে সেশন করা যায় সকালে ও বিকেলে তাহলে ভাল। একবারে অনেক বাচ্চাকে না বসিয়ে দুটো সেশন করে ক্লাস নিলে ভাল হয়। বাবা-মায়েদের ভ্যাকসিন নিয়ে রাখতে হবে অবশ্যই। আর মাস্ক, স্যানিটাইজেশনের দিকে নজর দিতে হবে। কোভিশিল্ড, কোভ্যাক্সিন, স্পুটনিক ভি যে ভ্যাকসিনই হাতের কাছে পাওয়া যাবে নিয়ে নিন। ভ্যাকসিন ভাইরাসের যে কোনও প্রজাতি থেকে সুরক্ষা দেবে।