দ্য ওয়াল ব্যুরো: আমাদের প্রত্যেকের জীবন জুড়ে আছে মা, দিদা, ঠাকুমা, জেঠিমা, খুড়ি, কাকিমারা ও তাঁদের ভালোবাসা। তাঁরা আমাদের খুব প্রিয়। তাঁদের প্রশ্রয়েই ঠাকুরদা, দাদু, বাবা, জ্যেঠা, খুড়ো,কাকার কড়া শাসন এড়িয়ে আমাদের বেড়ে ওঠা। ঠাকুরদা, দাদু,বাবা, জ্যেঠা, খুড়ো,কাকারা জীবনের খেলাঘর থেকে তাঁদের জীবনসঙ্গীদের তুলনায় তাড়াতাড়ি চলে গেলেও, দিব্যি ঠুকে ঠুকে জীবনের ক্রিজে ব্যাটিং করে চলেন মা, দিদা,ঠাকুমা,জেঠিমা, খুড়ি, কাকিমারা। তাঁদের অফুরান স্নেহ ও ভালবাসা আমাদের মাথার আকাশ হয়ে ঘিরে থাকে আমাদের। আমরা সব সময় চাই তাঁরা দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকুন।
কিন্তু জানেন কি, খোদ ঈশ্বরও তাই চান? তাই স্ত্রষ্টা মহিলাদের জিনে কারিকুরি করে রেখেছেন। এই পৃথিবীতে মহিলারা পুরুষদের থেকে গড়ে চার বছর বেশি বাঁচেন। এমনকি স্ত্রী পশু পাখিরাও, পুরুষ পশু পাখিদের চেয়ে বেশি দিন বাঁচে। কেন মহিলারা পৃথিবীতে বেশিদিন বাঁচেন, তার উত্তর এতদিন বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল না। অতীতে অনুমান করা হতো মহিলারা তাঁদের জীবনযাত্রার জন্যই দীর্ঘায়ু হন।
সম্প্রতি এই রহস্যও ভেদ করল বিজ্ঞান
বিজ্ঞান বলছে, জিনেই লুকিয়ে আছে দীর্ঘায়ু হওয়ার উত্তর। জীববিজ্ঞানীদের সদ্য প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে জানানো হয়েছে, দুটি
X ক্রোমোজোম(
XX) যুক্ত ইঁদুর বা স্ত্রী ইঁদুর বেশিদিন বাঁচে। এবং এই দুটি
X ক্রোমোজোমের দ্বিতীয়
X ক্রোমোজোমেই দীর্ঘ জীবন লাভের বৈশিষ্ট্য গেঁথে দেওয়া আছে। পুরুষদের শরীরে একটি
X ক্রোমোজোম থাকলেও স্ত্রীদের শরীরে থাকা এই দ্বিতীয়
X ক্রোমোজোমটি দীর্ঘায়ু হওয়ার প্রতিযোগিতায় পুরুষদের পিছনে ফেলেছে।
সমস্ত স্তন্যপায়ী প্রাণীদের লিঙ্গ বা নারী ও পুরুষ হয়ে জন্মানো নির্ধারণ করে এক জোড়া
সেক্স ক্রোমোজোম। স্ত্রীদের প্রতি কোষে থাকে দুটো
X বা
X X ক্রোমোজোম এবং পুরুষদের প্রতি কোষে থাকে একটি
X ও একটি
Y ক্রোমোজোম।
পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় জিন ও মস্তিষ্ক সম্বন্ধীয় জিন বহন করে
X ক্রোমোজোম। অন্যদিকে, পৃথিবীতে জীবকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে পুরুষ জীবের
Y ক্রোমোজোমের কোনও ভূমিকা নেই। পুরুষের
Y ক্রোমোজোম পুরুষের গৌণ যৌন লক্ষণ, যেমন পুরুষাঙ্গ, শুক্রাশয়, শক্ত পেশিবহুল চেহারা, দাড়ি গোঁফ, সারা দেহে লোমের আধিক্য, গলার মোটা স্বর ইত্যাদি বৈশ্যিষ্টের জিন বহন করে।
বিজ্ঞানীরা কী পরীক্ষা করেছিলেন?
পৃথিবীতে দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে ক্রোমোজোমের সম্পর্ক জানতে, গবেষকরা জিনগত দিক থেকে একই জাতের অথচ বিভিন্ন ক্রোমোজোম ও লিঙ্গের ইঁদুরের মধ্যে পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। প্রকৃতিগত ভাবে স্ত্রী ইঁদুরের মধ্যে
X X ক্রোমোজোম থাকেই, বিজ্ঞানীরা কিছু স্ত্রী ইঁদুরের ডিম্বাশয়ে পুরুষদের ক্রোমোজোম জোড়া বা
XY ক্রোমোজোম দুটি স্থাপন করেন। অন্যদিকে, কিছু পুরুষ ইঁদুরের শুক্রাশয়ে স্ত্রীদের ক্রোমোজোম জোড়া বা
X X ক্রোমোজোম দুটি স্থাপন করেন। অর্থাৎ যে দেহে যে ক্রোমোজোম থাকার কথা, সে দেহে বিপরীত জোড়া ক্রোমোজোম প্রতিস্থাপন করেন।
পরীক্ষার জন্য পাওয়া গেল চার ধরনের ক্রোমোজোম যুক্ত ইঁদুর
● স্বাভাবিক স্ত্রী ইঁদুর, যার ডিম্বাশয়ে
XX ক্রোমোজোম আছে
● স্বাভাবিক পুরুষ ইঁদুর, যার শুক্রাশয়ে
XY ক্রোমোজোম আছে
● ব্যতিক্রমী স্ত্রী ইঁদুর, যার ডিম্বাশয়ে
XY ক্রোমোজোম আছে
● ব্যতিক্রমী পুরুষ ইঁদুর, যার শুক্রাশয়ে
XX ক্রোমোজোম আছে
সাধারণত ইঁদুরের জীবন কাল ২১ মাসের। বিজ্ঞানীরা দেখলেন ইঁদুরদের বয়স যখন ২১ মাস, তখন দীর্ঘায়ু হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হলো। গবেষকরা দেখলেন, চার ধরনের ইঁদুরের মধ্যে স্বাভাবিক স্ত্রী ইঁদুর, যার ডিম্বাশয়ে
XX ক্রোমোজোম আছে সেই স্ত্রী ইঁদুরের দল দীর্ঘায়ু হলো। ব্যতিক্রমী পুরুষ ইঁদুর, যার শুক্রাশয়ে
XX ক্রোমোজোম ছিল তারা দীর্ঘায়ু হওয়ার দৌড়ে দ্বিতীয় হলো। স্বাভাবিক পুরুষ ইঁদুর, যার শুক্রাশয়ে
XY ক্রোমোজোম ছিল সেই ইঁদুরের দল, দীর্ঘায়ু হওয়ার দৌড়ে তৃতীয় হলো। ব্যতিক্রমী স্ত্রী ইঁদুর, যার ডিম্বাশয়ে
XY ক্রোমোজোম ছিল, তারা হলো চতুর্থ।
গবেষকরা এই পরীক্ষা থেকে সিদ্ধান্তে এলেন
স্ত্রী ইঁদুরের দ্বিতীয়
X ক্রোমোজোমেই আছে সেই
জিন যা স্ত্রী ইঁদুরকে দীর্ঘায়ু হতে সাহায্য করে। সম্প্রতি, বিখ্যাত '
Aging Cell' ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এই গবেষণা পত্রে, বিশ্বখ্যাত নিউরোলজিস্ট ও গবেষক দলের প্রধান
ডেনা ডুবাল বলেছেন, "
আমাদের গবেষণা বলছে, XX ক্রোমোজোম যুক্ত স্ত্রী ইঁদুরদের ডিম্বাশয়ে উৎপন্ন হওয়া স্ত্রী হরমোনগুলি স্ত্রী প্রাণীদের দীর্ঘায়ু হতে সাহায্য করে। স্ত্রী ইঁদুরটি কী ভাবে বৃদ্ধি লাভ করলে দীর্ঘায়ু হবে সে দিকে প্রভাব ফেলে, নয়তো স্ত্রী ইঁদুরদের জীবনকে বিশেষ কিছু জৈবিক পথে পরিচালিত করে, যা স্ত্রী প্রাণীকে দীর্ঘায়ু করতে সক্ষম। বার্ধক্য প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে যখন পুরুষ শরীরের সব কিছু ভুল ভাবে চলতে শুরু করে, তখন দ্বিতীয় X ক্রোমোজোম স্ত্রীদের জীবন একই ছন্দে চালাতে থাকে। "
গবেষক দলটির জীব বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট ভাবে বলতে পারেননি, কেন দ্বিতীয়
X ক্রোমোজোমটি
স্ত্রী প্রাণীদের দীর্ঘায়ু করে। তাঁরা অনুমান করছেন, পৃথিবীতে স্ত্রী প্রাণীটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য দ্বিতীয়
X ক্রোমোজোমটি স্ত্রী প্রাণীটির দেহের সুরক্ষার দিকে জোর দেয়। জীবনের বিভিন্ন ঝড় ঝাপটা থেকে স্ত্রীদের নিজেদের সুরক্ষিত রাখার কৌশল শিখিয়ে দেয়। আর একটি মতবাদ উঠে আসছে, সেটা হলো পুরুষের শরীরে
Y ক্রোমোজোমের উপস্থিতি পুরুষদের দীর্ঘায়ু হওয়ার পক্ষে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়তো জীব বিজ্ঞানীরা স্ত্রী প্রাণীদের দীর্ঘায়ু হওয়ার সঠিক কারণ নির্দিষ্ট ভাবে বলতে পারবেন। যাই হোক না কেন, ঈশ্বরের পক্ষপাতিত্ব যে বরাবরই স্ত্রী জাতির দিকে, তা হয়তো এবার নাস্তিক বিজ্ঞানীরাও অনুধাবন করতে শুরু করলেন।