রফিকুল জামাদার ও শোভন চক্রবর্তী
সারা শরীর জ্বালাপোড়া করে। দিনের পর দিন দু’চোখের পাতা এক হয় না তাঁর। শরীরে বাসা বেঁধেছে মারণরোগ। সল্টলেকের শ্যামলী আবাসনের ক্যানসার আক্রান্ত মহিলা গত আড়াই মাস ধরে ঘুরছেন এ দফতর থেকে ও দফতর। চাহিদা সামান্য, আবাসনের ঘর বদল। কিন্তু এত ঘোরাঘুরির পরও লাভ হল না। কলকাতার মেয়র তথা পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমকে ফোন করে ক্যানসার আক্রান্ত মহিলাকে শুনতে হল, “দিদিকে বলো-তে ফোন করুন।”
শনিবার দুপুরে ‘টক টু মেয়র’-এ কল করেছিলেন ওই মহিলা। সল্টলেকের শ্যামলী আবাসন বিধাননগর কর্পোরেশনের অন্তর্গত। তা হলে কলকাতার মেয়রকে কেন ফোন করলেন? ক্যানসার আক্রান্তের সঙ্গে যোগাযোগ করতেই বেরিয়ে এল হয়রানির দিনযাপনের কথা।
২০১৬ সালে ক্যানসার ধরা পড়েছে তাঁর। দু’দুটো অস্ত্রোপচারের পর শরীর একেবারে ভেঙে গিয়েছে। চিকিৎসকদের একাধিক নিষেধাজ্ঞা। ডান হাতে চুড়ি পরা যাবে না, মশা যেন না কামড়ায়, সাবানজল যেন না লাগে ইত্যাদি, প্রভৃতি। শ্যামলী আবাসনের একটি ব্লকের নীচতলায় তাঁদের ঘর। পূর্ত দফতরের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়রের স্ত্রী তাই চেয়েছিলেন উপরতলায় একটা ঘর নিতে। যাতে একটু আলো-বাতাস খেলে, মশা-পোকামাকড় না থাকে। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও আরও ক’টাদিন বাঁচতেই ছুটে বেরিয়েছেন খাদ্য ভবন থেকে নগরোন্নয়ন দফতর। এমনকী নবান্নের বারান্দাতেও তিনবার ছুটতে হয়েছে তাঁর স্বামীকে। তবু মিলল না ঘর।
ওই মহিলা বলেন (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক), “আমি আমার স্বামীকে বলি ঘর বদলের জন্য চিঠি-চাপাটি করতে। খাদ্য ভবনে বার কয়েক আমি গেছিলাম। আধিকারিক পার্থপ্রতিম করের কাছে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু সাড়া পাইনি।” এরপর সংবাদমাধ্যমে আমি জানতে পারি ‘টক টু মেয়র-এ ফোন করলে অনেক সমস্যার সমাধান করে দেন ববি হাকিম। ডিসেম্বর মাসে আমি ফোন করি। একবারেই লাইন পেয়ে যাই। মন্ত্রী আমাদের বলেন, নগরোন্নয়ন দফতরে দেখা করতে।” তাঁর কথায়, “আমি যখন ক্যানসারের কথা ববি হাকিমকে ডিসেম্বর মাসে বলেছিলাম, তখন উনি বলেছিলেন আমাকে আসতে হবে না। স্বামীকে পাঠিয়ে দিলেই হবে। কিন্তু আমি ওঁকে বলেছিলাম, স্যর আমি পারব। আমিই যাব আপনার কাছে।”
এরপর প্রথমদিন নগরোন্নয়ন দফতরে গিয়ে মন্ত্রীর দেখা না পেয়ে ফিরে আসতে হয় বলে জানান ওই মহিলা। পরের সপ্তাহে আবার যান। সেদিন দেখা হয়। ক্যানসার আক্রান্তের কথায়, “ওইদিন ফিরহাদ হাকিম আমাদের একটি চিঠি লিখে অরূপ বিশ্বাসের দফতরে পাঠান। ওই চিঠি নিয়ে নবান্নে যান আমার স্বামী। একদিন জমা দিয়ে আসেন। এরপর আরও দু’দিন যান খোঁজ নিতে। তৃতীয় দিন জানা যায় ওই ফাইল গিয়েছে খাদ্য ভবনে।” ওই মহিলা আরও বলেন, “ফিরহাদ হাকিম যখন অরূপ বিশ্বাসকে চিঠি লিখে দিলেন, তখন আমি আমার স্বামীকে রোজ বলতাম, এবার নিশ্চয়ই সমস্যার সমাধান হবে। কারণ ওঁরা তো একই পার্টির মন্ত্রী!” কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি, “খাদ্য ভবনে আরও কয়েকদিন ঘোরার পর বলে দেওয়া হয়, মনে হচ্ছে হবে না।”
অগত্যা এদিন ফের ‘টক টু মেয়র’-এ ফোন করেন ওই মহিলা। যদি বাকি ক’টা দিন একটু আলো-বাতাস খেলে এমন একটা ঘরে থাকা যায়। কিন্তু কলকাতার মেয়র তাঁকে জানিয়ে দেন, “আপনি দিদিকে বলো-তে কল করুন।”
মহিলার করুণ আর্তি, তাঁদের আবাসনে উপরের তলায় অনেক ঘর খালি। জ্বালাপোড়া করা শরীর নিয়ে যদি সেখানে থাকতে পারেন! ফোনে কথা বলতে বলতেই কেঁদে ফেলেন ক্যানসার রোগিনী। বলেন, “আমি কি অনেক কিছু চেয়ে ফেলেছি!” এখন তাঁর বক্তব্য, “দেখি এবার দিদিকে বলব। আশা করব তিনিই আমার সুরাহা করবেন!”
অনেকের মতে, সরকারি দফতরের দড়ি টানাটানিতেই এমন ঘটনা। মুখ্যমন্ত্রী যখন প্রতিটি প্রশাসনিক সভায় বলছেন, মানুষের হয়রানি যাতে না হয় সেটা দেখতে, তখন বাস্তবে তার প্রতিফলন কই? মুখ্যমন্ত্রীকে এমনও বলতে শোনা গিয়েছে, “কিছু কিছু জিনিস মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হয়। অনেক সময়ে নিয়মে সব কিছু থাকে না। কিন্তু নিয়ম তো মানবিকতার ঊর্ধ্বে নয়।” পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, এক্ষেত্রেও যদি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়টা দেখা হত, তা হলে এই মহিলাকে চোখের জল ফেলতে হত না।