দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাজনীতির ময়দানে একে অন্যের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন নিয়ম করে। এ বার ভাষা নিয়ে শঠে শ্যাঠ্যং বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহের।
শনিবার হিন্দি দিবস উপলক্ষে ‘এক দেশ-এক ভাষা’র পক্ষে সওয়াল করেছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী। তিনি বলেছেন, “ভারতের ঐক্যকে ধরে রাখতে পারে হিন্দি। বহু ভাষাভাষীর এই দেশে সবথেকে বেশি সংখ্যায় মানুষ হিন্দিতেই কথা বলেন”। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অবশ্য স্বীকার করেছেন যে, “দেশের সব ভাষারই স্বাতন্ত্র্য, বৈচিত্র্য ও গুরুত্ব রয়েছে”। তবে বলেন, বিশ্বের মানচিত্রে ভারতের পরিচিতির জন্য একটা নির্দিষ্ট ভাষার খুবই প্রয়োজন। দেশের কোনও ভাষা যদি ভারতের ঐক্য ও সংহতিকে অটুট রাখতে পারে, তবে তা বহু প্রচলিত হিন্দি ভাষাই”।
কিন্তু এর কিছুক্ষণ পর টুইট করে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন, তাঁর অগ্রাধিকার মাতৃভাষাতেই। টুইটে তিনি লিখেছেন, “হিন্দি দিবসে সবাইকে জানাই শুভেচ্ছা। আমাদের উচিত সব ভাষা ও সংস্কৃতিকে সমানভাবে সম্মান জানানো। আমরা অনেক ভাষাই শিখতে পারি কিন্ত মাতৃভাষাকে কখনোই ভোলা উচিত নয়।”
অন্যদিকে হিন্দি নিয়ে অমিতের ‘আগ্রাসী মনোভাবের’ বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে দক্ষিণ ভারতও। একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতারা ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে বিভিন্ন রাজ্যে একাধিক সংগঠন রাস্তায় নেমে পড়ে হিন্দি ‘চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার’ বিরোধিতায়।
ডিএমকে সভাপতি এমকে স্ট্যালিন বলেন, “এটা ইন্ডিয়া। হিন্ডিয়া নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উচিত তাঁর এই কথা ফিরিয়ে নেওয়া।” তিনি জানিয়েছেন, তাঁর দলের পরের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেই, রাজ্য জুড়ে আন্দোলন গড়ে তুলবেন।
বস্তুত ভাষার প্রশ্নে তামিল রাজনীতি বরাবরই গোঁড়া। এক সময়ে স্ট্যালিনের বাবা তথা প্রয়াত ডিএমকে সর্বাধিনায়ক করুণানিধি তামিলনাড়ুতে ভাষা তথা দ্রাবিড় আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তবে বাংলায় পরিস্থিতি সে রকম নয়। ইদানীং কলকাতায় বাংলা ভাষাভাষী মানুষ সংখ্যালঘু। হিন্দি ভাষাভাষি মানুষই সংখ্যাগুরু। তাই হয়তো বাংলার মুখ্যমন্ত্রী কৌশলে পা ফেলতে চাইছেন। তাই হিন্দি দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েই মাতৃভাষার পক্ষে সওয়াল করেছেন।
মমতা ও স্ট্যালিন ছাড়াও কর্ণাটকের প্রাক্তন দুই মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া এবং এইচ ডি কুমারস্বামীও সরব হয়েছে হিন্দি নিয়ে এমন ‘আগ্রাসী’ মনোভাবের। কুমারস্বামী বলেন, “দেশের ২২টি সরকারি তপফসিলি ভাষার মধ্যে কন্নড়ও রয়েছে। আমি দেখতে চাই আমাদের প্রধানমন্ত্রী কবে কন্নড় দিবস উদযাপন করেন।” একাধিক কন্নড় সংগঠন এ দিন রাস্তায় নেমেছে অমিত শাহের হিন্দি নিয়ে মন্তব্যের বিরুদ্ধে।
চলতি বছরের জুন মাসে, নতুন শিক্ষা নীতি ২০১৯- এর খসড়ার পরে দেশ জুড়ে তীব্র বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে। বিশেষত দক্ষিণ রাজ্যগুলি থেকে চরম প্রতিবাদ আসে। কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, কেরল, তেলেঙ্গানার মতো দক্ষিণী রাজ্যগুলিতে ভাষা একটি স্পর্শকাতর বিষয়। দেশের সমস্ত স্কুলে হিন্দি বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করে কেন্দ্রীয় সরকার। তারপরেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে দক্ষিণের রাজ্য গুলি।
বিজেপি নেতারা অবশ্য বলছেন, নতুন শিক্ষা নীতির খসড়া প্রকাশের সময়েই বলা হয়েছিল, হিন্দি বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে না। শনিবার হিন্দি দিবসেও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী কখনও হিন্দি জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার কথা বলেননি। প্রতিটি ভাষার স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার পাশাপাশি হিন্দি শেখার কথা বলেছেন তিনি। যাতে দেশের ঐক্যের পরিবেশ দৃঢ় হয়।
তবে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিজেপি-র এ সব কথা ভড়ং মাত্র। ওদের উদ্দেশ্য হল, সমাজের বৈচিত্র্য নষ্ট করে হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্তানের পক্ষে মত গড়ে তোলা। আর তার মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা তোলা।
https://twitter.com/AmitShah/status/1172821076344066050