তুষারকান্তি বিশ্বাস, উত্তর দিনাজপুর বয়স তখন বছর আটেক। মায়ের হাত ধরে এসেছিল বৌদির কাছে। তখন সবে সবে ইসলামপুরের মাটিকুন্ডা গ্রামে হোটেল খুলেছেন মমতা বারুই। গ্রামে যা বৌদির হোটেল বলেই পরিচিত। তারপর থেকে সেখানেই। শৈশব, কৈশোর কাটিয়ে এখন ২৪ এর যুবক মহম্মদ সেলিম। স্নেহের সুতোয় বেঁধে কখন যে মমতা বৌদি তাঁর কাছে বৌদিমা হয়ে গিয়েছিলেন টেরই পাননি। এ মাসের গোড়ায় আচমকাই মৃত্যু হয় সেলিমের বৌদি মায়ের। মমতাদেবীর নিজের ছেলে প্রসেনজিৎও সেলিমেরই সমবয়সী। তাঁরই পাশে দাঁড়িয়ে হিন্দু রীতি মেনে শেষকৃত্য করলেন সেলিমও। নিরামিষ খেয়ে পালন করলেন গুরুদশা। শ্রাদ্ধশান্তির পর নিয়ম মেনে শ্মশানবন্ধুদের খাইয়ে আত্মার শান্তি কামনা করলেন মায়ের।
আজ খুশির ঈদে মন খারাপ সেলিমের। প্রতিবছর ঈদের নামাজের পর বৌদিমা যে নিজে হাতে সিমাই রান্না করে খাওয়াতেন তাঁকে। ঈদের আনন্দ সম্পূর্ণ হতো তখন। দোকানে কাজের ফাঁকে সেই সব স্মৃতিই ভিড় করে এসেছে আজ। জানালেন, মুসলমান হয়ে হিন্দু রীতি মেনে বৌদিমায়ের অন্তেষ্টি করায় কথা উঠেছিল সমাজে। কিন্তু দু হাতে সরিয়ে দিয়েছেন সেই বিশ্বাস আর সংস্কারের পাহাড়। তাঁর কথায়, “আমাকে মসজিদে যাওয়া, নমাজ পড়া সবকিছু সময় ধরে করতে বলতেন বৌদিমা। সব ধর্মকে অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েছেন। ওনার কথা যে আমি বুঝতে পেরেছি, সেটাতো আমাকে প্রমাণ করতে হতো।”
ওই এলাকাতেই থাকেন সেলিমের মা সবিনা খাতুন। বললেন, “ও ছোটো থেকে মমতার কাছেই বড় হয়েছে। যে ভালবাসা পেয়েছে তার ঋণশোধ সম্ভব নয়। এটুকু ও নিজের মনের শান্তির জন্য করেছে।” জানালেন প্রথমে একটু আধটু আপত্তি এসেছিল আত্মীয় পরিজনের কাছ থেকে। কিন্তু তাতে নড়ানো যায়নি তাঁর ছেলেকে।
শনিবার সকালের দিকে বন্ধ ছিল বৌদির হোটেল। কারণ নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন সেলিম। বাকি দিন কেটেছে দোকানেই। ব্যস্ততায়। বাস্তব আর স্মৃতির মেলামেশায়। ছুটির দিন হলেও এ দিন টুকটাক দোকানে এসেছেন স্থানীয় মানুষজন। কেউ দরকারে। কেউবা নেহাতই মা ছেলের গড়া এক টুকরো ভারত দর্শনে।
https://www.youtube.com/watch?v=bhjWl3CfZWk