দ্য ওয়াল ব্যুরো: দীর্ঘ ১৫ বছর নিখোঁজ ছিল বাড়ির ছেলে। এক সময় সকলে ভেবেই নিয়েছিলেন 'সে আর নেই'। অনেকটা ফিল্মি কায়দায় 'ঘরের ছেলে ঘরে ফিরল'। মায়ানগরী মুম্বাইয়ের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা 'শ্রদ্ধা ফাউন্ডেশন'এর দৌলতে হারানো ছেলেকে ফিরে পেল ক্যানিং প্রামাণিক পরিবার।
কিন্তু ছেলেকে ফিরে পেতে কেন এত সময় লাগল প্রামাণিকদের? কোথায় ছিল তাঁদের ছেলে? ফিরে আসা ছেলে রামকৃষ্ণ পিতৃহারা হয়েছিলেন অনেকদিন আগেই। তাই খুব কম বয়সেই মা ও ভাইয়ের অভাব মেটাতে সমস্ত দায়িত্ব তাঁকে নিতে হয়। রাজমিস্ত্রী টুকিটাকি কাজ জানতেন। তবে এলাকায় কাজের তেমন সুযোগ ছিল না। তাই অগত্যা তাঁকে পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে রাজমিস্ত্রীর কাজ নিয়ে ক্যানিং থেকে সুদূর কর্ণাটকে পাড়ি দিতে হয়েছিল। কর্ণাটকের ম্যাঙ্গালোরে কাজে গিয়ে আচমকাই ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটে রামকৃষ্ণের সঙ্গে। সেই দুর্ঘটনায় স্মৃতিশক্তির সঙ্গে মানসিকভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন তিনি। সেখানকার মানুষের সাহায্যে দু'একবার তাঁর চিকিৎসা হলেও নিরাশ্রয় রামকৃষ্ণকে পনেরোটা বছর ভবঘুরের জীবন কাটাতে হয়েছে।
ওই সময়ের মধ্যে একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হাত বদল হতে হয়েছে রামকৃষ্ণকে। শেষে মুম্বাইয়ের 'শ্রদ্ধা ফাউন্ডেশন' রামকৃষ্ণের দায়িত্ব নেয়। নিজেদের সঙ্গে রেখে তাঁর স্মৃতিশক্তি ফেরাবার চেষ্টা করে। এক সময় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে রামকৃষ্ণ। নাম ও ঠিকানা হঠাৎই তাঁর মনে পড়ে যায়। তথ্য পেয়ে তাঁর পরিবার সম্পর্কে খোঁজ খবর চালাতে থাকেন 'শ্রদ্ধা'র সদস্যরা।
অন্যদিকে, নিখোঁজ ছেলের সন্ধানে ক্যানিং থেকে ম্যাঙ্গালোরে গিয়ে খোঁজ খবর নিয়েছিল রামকৃষ্ণের পরিবার। কিন্তু ছেলের খোঁজ মেলেনি। হাল ছেড়ে দিয়ে রামকৃষ্ণকে মৃত বলেই মেনে নিয়ে ছিলেন তাঁরা। মা অনিমা প্রামাণিকও ছেলের জন্য গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
কিন্তু ১৫ বছর পর সেই ছেলেই বাড়ি ফিরে এল। তাই বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং থানা নিকারীঘাটা গ্রাম পঞ্চায়েতের দুমকি পূর্ব পাড়ার প্রামাণিক পরিবার। রবিবার শ্রদ্ধা ফাউন্ডেশনের সদস্যরা রামকৃষ্ণকে নিয়ে তাঁর বাড়িতে আসেন। পরিবারের সদস্যদের হাতে তাঁদের ছেলে ফিরিয়ে দেন। ফাউন্ডেশন’র সদস্য নিতীশ শর্মা, লক্ষ্মীপ্রিয়া বিসোয়াল, শৈলেশ শর্মা, গণেশ রণদ্বীপ, নীলা শাহ’দের প্রচেষ্টায় এত বছর পর বাড়ি ফিরল বাড়ির ছেলে। আনন্দে কথাই হারিয়ে ফেলেছেনড় রামকৃষ্ণের কাকা শ্যামল প্রামাণিক।
এদিকে দাদাকে ফিরে পেয়ে ভাই তপন আনন্দ কেঁদেই ফেলেন। তিনি বলেন, '' সুদূর মুম্বাইয়ের 'শ্রদ্ধা’ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আমার হারিয়ে যাওয়া দাদাকে উদ্ধার করে এই ভাবে ফিরিয়ে দিয়ে যাবে ভাবতে পরিনি। 'শ্রদ্ধা' কে অসংখ্য ধন্যবাদ। শ্রদ্ধা শুধু আমার দাদাকে উদ্ধার করে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়ে হাল ছাড়েন নি। তাঁরা দাদার জন্য চার মাসের ওষুধ ও কিনে দিয়ে গেছে। ওষুধ ফুরিয়ে গেলে আবারও ডাকযোগে পাঠাবেন কথা দিয়েছেন। সত্যিই ‘শ্রদ্ধা’ সপরিবারের কাছে চিরকৃতজ্ঞ আমরা।''
সংস্থার অন্যতম সদস্য তথা চিকিৎসক ভারত ভাটোয়ানি, জানিয়েছেন “শ্রদ্ধা সব সময়ই মানুষের সেবায় নিয়োজিত রয়েছে। সেই কাজের মধ্যদিয়ে রামকৃষ্ণ প্রামাণিককে উদ্ধার করে তাঁর পরিবারের হাতে তুলে দিয়েছি। এটা আমাদের কর্তব্য বলে মনে করি।''
তিনি আরও জানান, রামকৃষ্ণের সঙ্গে আরও দুজনকেও তাঁদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে 'শ্রদ্ধা'। রারুইপুরের মীর্জাপুরে সাবিত্রী বেঘর, জীবনতলার মইটন সেখকে উদ্ধার করে তাঁদের পরিবারের হাতে তুলে হয়েছে।