
শেষ আপডেট: 10 May 2019 18:30
তিস্তার সঙ্গে রাজবংশীদের প্রাণের টান। নদী তাই তাদের কাছে 'বুড়ি।' বর্ষায় যখন দুকূল ছাপিয়ে যায়, জমিজমা সব ভাসিয়ে নিয়ে যায় তিস্তা, জানালেন এক রাজবংশী। আবার শুখা মরসুমে ফুটিফাটা মাঠ, জলের জন্য হাহাকার, চাষের সমস্যায় বিপর্যস্ত হয় জীবন-জীবিকা। প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনা থেকে বাঁচতে তাই নদী-পুজো। রাজবংশীদের মতে, এই পুজো শুধু নদীকে তুষ্ট করে তাই নয়, যারা এই পুজোয় অংশ নেয় তাদের পারিবারিক বিবাদও মেটে।
রাজবংশীরা আসলে ভারত ও বাংলাদেশের এক জনগোষ্ঠী। প্রাচীন বসতি ছিল তিব্বত ও মায়ানমারের পাহাড়ি ও মালভূমি এলাকায়। পরে ধীরে ধীরে এরা কোচবিহার, বিহার, মুর্শিদাবাদ, রংপুর, দিনাজপুর ও অসমে ছড়িয়ে পড়ে। উত্তরবঙ্গে কোচবিহারে যে মঙ্গোলীয় জনজাতি বাস করত তাদের সঙ্গেই মিশে যায় এই জনগোষ্ঠীও। পরে কোচ রাজবংশের রাজত্বকালে এরা নিজেদের কোচবংশীয় বা রাজবংশীয় হিসেবে পরিচয় দেয়। জলপাইগুড়িতে বসবাসকারী এই কোচবংশীয়রা বেশিরভাগই আদিবাসী। দোভাষী, মোদাসী ও জালুয়া নামে এদের তিনটে শ্রেণি রয়েছে। হিন্দু পুরাণের নানা আচার এরা নিষ্ঠাভরে পালন করে।
মূল কৃষিপ্রধান বলে রাজবংশীদের পুজোপাঠে নদীর একটা বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তারা মনে করে নদ-নদীর প্লাবন যেমন চাষ ও জনজীবনের ক্ষতি করে, তেমনি নদী পলি বয়ে এনে নতুন জীবনের সূচনাও করে। এই ভাবনা থেকেই নদী-পুজো বা মেচেনী পুজোর শুরু। অনেকে একে কৃষি-পুজোও বলে থাকেন।
সারাদিন নিরামিষ খেয়ে নাচ-গানের মাধ্যমে তিস্তাকে পুজো দেয় রাজবংশীরা। মূলত ধামসা, বাঁশীই বেশি ব্যবহৃত হয় এদের লোক গান থুড়ি মেচেনী গানে। তবে ইদানীংকালে দোতরা, সারিন্দারও অনুপ্রবেশ ঘটেছে তাদের লোকগানে। লুপ্ত হতে বসা ভাওয়াইয়া সুরশৈলীর বিকাশ দেখা যায় এদের লোকগানে।
শনিবার থেকেই রাজবাড়ি চত্বরে ধূমধামের সঙ্গে শুরু হয়ে গেছে মেচেনী মেলা। নর্থ ইস্টার্ন ফাউন্ডেশন ফর সোস্যল সায়েন্সেস রিসার্চ বর্তমানে এই পুজোর খরচের যোগান দেয়। জলপাইগুড়ি ছাড়াও মালবাজার, রাজগঞ্জ, ধূপগুড়ি, মেখলিগঞ্জ ইত্যাদি ব্লক থেকে ৪৬টি দল এখানে অংশগ্রহণ করে।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক নরেন দাসের কথায়, "এই মেলা মিলন মেলা। যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এই উৎসব। সুস্থ ভাবে বাঁচার লক্ষ্যে ও জীবজগতের মঙ্গলের জন্যই রাজবংশীরা এই মেলা করে থাকে। "