দ্য ওয়াল ব্যুরো : সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কলকাতা সফর কাল তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতে রাজ্যের বকেয়া টাকার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাতে যে বিশেষ সুবিধা হয়নি তা বিধানসভায় অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রর বাজেট বক্তৃতায় আরও স্পষ্ট হয়ে যায়। আজ প্রধানমন্ত্রীকে বকেয়া টাকা চেয়ে সরাসরি চিঠি লিখলেন মুখ্যমন্ত্রী।
১১ জানুয়ারি রাজভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর মমতা জানিয়েছিলেন, কেন্দ্রের থেকে বিভিন্ন প্রকল্প বাবদ ২৮ হাজার কোটি টাকা প্রাপ্য রয়েছে রাজ্যের। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীকে তিনি যে চিঠি লিখেছেন সেই মোতাবেক বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।
চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে আপনাদের
--কেন্দ্রের দেওয়া টাকার পরিমাণ দিন দিন কমছে। যা পাওয়া যাচ্ছে, তাও আসছে অনেক দেরি করে। এর ফলে নানা জনকল্যাণমূলক কাজ করতে অত্যন্ত সমস্যা হচ্ছে। এক, দুই, তিন করে মোট পাঁচটি পয়েন্টে রাজ্যের সমস্যার কথা লিখেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
প্রথমেই তিনি লিখেছেন, জিএসটি চালু হওয়ার পরে রাজ্যের যে লোকসান হয়েছে, সেই বাবদ কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে রাজ্যের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা ছিল। সেই টাকা পেতে খুবই দেরি হচ্ছে। ২০১৯ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে যে অর্থ বাংলার পাওয়ার কথা ছিল, তা পাওয়া গিয়েছে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে।
দ্বিতীয় পয়েন্টে মমতা লিখেছেন, ২০১৯-২০ সালের আর্থিক বছরে রাজ্যের ১১ হাজার ২১২ কোটি টাকা পাওয়ার কথা ছিল। সেবারের বাজেটে এমনই বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই টাকা বাংলা পায়নি। তাছাড়া কেন্দ্রীয় রাজস্ব থেকে আমাদের প্রাপ্যও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে ২০১৭-১৮ সাল থেকে।
তৃতীয় পয়েন্টে বলা হয়েছে, আর একটি ব্যাপারে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। তা হল বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পে আমাদের প্রাপ্য ৩৬ হাজার কোটি টাকা এখনও পাওয়া যায়নি। কেন্দ্রের সাহায্য ছাড়া ওই প্রকল্পগুলি চালানো যে কী কঠিন ব্যাপার, তা আপনি নিশ্চয় বুঝবেন।
চতুর্থত মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে বিশেষ পশ্চাৎপদ অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য পশ্চিমবঙ্গের ২৩৩০ কোটি ১ লক্ষ টাকা পাওয়ার কথা ছিল। এখনও সেই অর্থ পাওয়া যায়নি। পশ্চাৎপদ এলাকার কোটি কোটি মানুষ যাতে মূলস্রোতে আসতে পারেন, সেজন্য উন্নয়নের কাজ চালানো জরুরি।
সর্বোপরি মুখ্যমন্ত্রী চিঠিতে লিখেছেন, আমরা দেখতে পাচ্ছি, কেন্দ্রীয় সরকার এখন কর বাবদ অর্থ সংগ্রহের বদলে ক্রমশ সেস ও সারচার্জের ওপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ২০১৪-১৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের মোট রাজস্বের ৬.১৭ শতাংশ আসত সেস থেকে। ২০১৯-২০ সালে সেস বাবদ আদায় হয়েছে রাজস্বের ১৮.৪ শতাংশ। রাজ্য সরকার সেস বাবদ আদায় করা অর্থের ভাগ পায় না। এইভাবে কেন্দ্রের থেকে রাজ্যের প্রাপ্য টাকার পরিমাণ কমছে।
চিঠির শেষে মমতা প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে লিখেছেন, আপনি নিশ্চয় জানেন, কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়কেই সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। কেন্দ্রের কাছে রাজ্য সরকারের প্রাপ্য এখন ৫০ হাজার কোটি টাকা। এই কঠিন অবস্থার মধ্যেও ২০১৯-২০ সালে রাজ্যের মোট উৎপাদন বা জিএসডিপি বেড়েছে ১০.৪ শতাংশ। অন্যদিকে সারা দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র পাঁচ শতাংশ হারে। ২০১৯-২০ সালের এপ্রিল থেকে নভেম্বরে রাজ্যে শিল্পোৎপাদন বেড়েছে ৩.১ শতাংশ হারে। সারা দেশে ওই সময় শিল্পে উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ০.৬ শতাংশ। ২০১৯-২০ সালে পরিষেবা ক্ষেত্রে পশিমবঙ্গের বিকাশ হয়েছে ১৬.৪ শতাংশ। ওই সময় সারা দেশে পরিষেবায় বিকাশ হয়েছে মাত্র ৬.৯ শতাংশ।
অর্থাৎ মমতার দাবি, কেন্দ্র প্রাপ্য না দেওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ সারা দেশের তুলনায় উঁচু হারে আর্থিক উন্নতি করেছে।
অনেকের মতে, একুশের ভোটের আগে হতে পারে কৌশলগত ভাবেই রাজ্যের সঙ্গে আর্থিক বঞ্চনা করছে কেন্দ্র। যাতে বাংলায় প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তীব্র হয়। সম্ভবত সেই কারণেই বঞ্চনার অভিযোগে শান দিচ্ছে তৃণমূল। অতীতে বামেরা বরাবরই এই রাজনীতি করেছে।