দ্য ওয়াল ব্যুরো: গত বছর পুজোর পর তখন বাঙালির বিজয়া দশমী সারার পালা চলছে! সেই সময়ে অক্টোবরের এক সন্ধেবেলা একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে তৎকালীন বিজেপি সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছিলেন, "একুশ সালে বাংলায় দুই তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গড়বে বিজেপি।"
ঠিক সাত মাস পর দেশ তথা বাংলায় যখন কোভিড সংক্রমণের ছড়াছড়ি, তখন সেই একই কথা বললেন শাহ। আরও আত্মবিশ্বাসী সুরে। সেই সঙ্গে বিদ্রুপ করে বললেন, "বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাধ পূর্ণ হবে। একুশের ভোটে বাংলায় সরকার গড়বে বিজেপি। মিলিয়ে নেবেন।"
গত সপ্তাহেই নবান্নের সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই অমিত শাহের সঙ্গে ফোনে কী কথা হয়েছে তা বলে দেন। মমতা বলেন, "আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে বলেছিলাম, যদি মনে হয় আমরা (পড়ুন পশ্চিমবঙ্গ সরকার) কোভিড পরিস্থিতি সামলাতে পারছি না তাহলে তাহলে আপনারা সামলান!" সেইসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী এও বলেন, "কিন্তু আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই, কারণ উনি কিন্তু আমায় বলেছিলেন, না না! নির্বাচিত সরকার কী করে ভেঙে দেব!"
সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমটিকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে প্রাক্তন বিজেপি সভাপতি বলেন, "আমি বাংলার সরকার চালাতে পারি না। কারণ আমি একজন সাংসদ। কিন্তু এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি মমতার ইচ্ছে পূরণ হবে। একুশে বিজেপিই একক সংখ্যাধিক্য নিয়ে সরকার গড়তে চলেছে।" রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও তীব্র সমালোচনা করেন বর্তমান ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম ক্ষমতাশালী এই নেতা।
যদিও শাহের এই মন্তব্যের পরেই তৃণমূলের তরফেও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। দলের মুখপাত্র তথা রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও'ব্রায়েন টুইটারে লেখেন, "অমিত শাহকে ধন্যবাদ! কারণ উনি এটা পরিষ্কার করে দিলেন আজকের পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ওঁর দলের অগ্রাধিকার বাংলার ভোট। কোভিড চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা নয়, উমফান বিধ্বস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো নয়, আপনাদের লক্ষ্য শুধু বাংলার ভোট। আপনারা আপনাদের রাজনীতি করে যান, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষের পাশে রয়েছেন।"
ওই সাক্ষাৎকারে অমিত শাহ আরও বলেন, "এই কয়েক বছর আগেও লোকে বিশ্বাস করত না, বাংলায় বিজেপি কিছু করতে পারে। আমি যখন লোকসভা ভোটের এক বছর আগে থেকে বলছিলাম, আমরা বাংলায় ২০টি আসন পাব, অবেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। কিন্তু আমরা বাংলায় ১৮টি লোকসভা আসন জিতেছি। মিলিয়ে নেবেন একুশেও সরকার গড়বে বিজেপি!" তাৎপর্যপূর্ণ হল, গতকালই বিজেপির রাজ্য কমিটির পদাধিকারিদের নাম ঘোষণা হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে লকেট চট্টোপাধ্যায়, নিশীথ প্রামাণিক, জ্যোতির্ময় মাহাত, সৌমিত্র খাঁ, দুলাল বরের মতো একাধিক সাংসদ, বিধায়ককে সংগঠনে গুরুতপূর্ণ জায়গা দিয়েছে গেরুয়া শিবির।
পরিযায়ী শ্রমিকদের ট্রেন নিয়ে রাজ্যের ভূমিকার সমালোচনা করে অমিত শাহ বলেন, "বাংলার লক্ষ লক্ষ শ্রমিক মনে রাখবে, তাঁদের ঘরে ফেরা নিয়ে ছেলেখেলা করেছে মমতা সরকার!" তিনি বলেন, "পরিযায়ী শ্রমিকরা ঘরে ফিরবেন এটাই স্বাভাবিক। আর তাঁদের ট্রেনকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী করোনা এক্সপ্রেস বলে কটাক্ষ করছেন।"
বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ থেকে লোকসভায় কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী কিংবা সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী-- প্রত্যেকেই প্রায় এক সুরে বলেছিলেন, নবান্নের ঢিলেমির জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিযায়ী শ্রমিকদের চূড়ান্ত দুর্দশার মধ্যে.পড়তে হচ্ছে। তাঁদের কথায়, সব রাজ্য যখন ট্রেনের তালিকা পাঠিয়ে রেল ভবনের কাছে তদবির করছে, তখন বাংলার নোডাল অফিসার উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। বঙ্গ বিজেপির বক্তব্য, আগে দায় নিতে চাননি মমতা। এখন চাপে পড়ে একসঙ্গে ট্রেন ঢোকাতে হচ্ছে আর সেই দায় কেন্দ্রের ঘাড়ে চাপাতে চাইছেন মুখ্যমন্ত্রী।
অমিত শাহ ওই সাক্ষাৎকারে বলেছেন, "উত্তরপ্রদেশ ১২০০ ট্রেনে পরিযায়ী শ্রমিকদের ফিরিয়েছে। বিহারে পৌঁছেছে এক হাজার ট্রেন। আর পশ্চিমবঙ্গ দাঁড়িয়ে আছে ১০০-র কোটায়!" তিনি আরও বলেন, "অনেকেই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলে বলছেন, কেন লকডাউনের আগে শ্রমিকদের ফেরানোর বন্দোবস্ত করা হল না? কিন্তু তাঁরা একটা জিনিস বুঝছেন না, লকডাউনের আগে রাজ্যগুলির কাছে কোয়ারেন্টাইন সেন্টার বা কোভিড চিকিৎসার পরিকাঠামো ছিল না। সেটা হলে রাজ্যগুলিকে বিপদের মধ্যে পড়তে হতো। কোনও দায়িত্বশীল কেন্দ্রীয় সরকার জেনেবুঝে রাজ্যকে বিপদের মধ্যে ফেলতে পারে না!"