শঙ্খদীপ দাস
মঙ্গলবার নজরুল মঞ্চে বক্তৃতা শেষ করে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন গটগট করে স্টেজ থেকে নেমে যাচ্ছেন, তখনই সামনে এসে দাঁড়ান বিধাননগরের মেয়র সব্যসাচী দত্ত। সূত্রের খবর, এত আলোচনা-টানাপোড়েন যাঁকে নিয়ে, তাঁকে দেখেই দাঁড়িয়ে পড়েন দিদি। কিছুটা গলা উঁচিয়েই বলেন, এই তুই তৃণমূলে আছিস কেন? বিজেপি-তে চলে যা!
আশেপাশে দাঁড়ানো নেতারাও তখন সব্যসাচী আর মমতার দিকে তাকিয়ে। জানা গিয়েছে সব্যসাচী নাকি তখন মৃদু স্বরে বলেন, কেন দিদি! মমতা তখন বলেন, বাড়িতে ডেকে মুকুলকে লুচি-আলুরদম খাওয়াচ্ছিস! একসঙ্গে লোকনাথ বাবার উৎসবে যাচ্ছিস!
সব্যসাচী দিদিকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, বাড়িতে মুকুলদা এমনিই চলে এসেছিলেন। আর লোকনাথ বাবার উৎসবটা তিনি জানতেন না মুকুলবাবু যাবেন। সূত্রের খবর, এ কথা শুনে মমতা আরও খানিকটা ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, আমি জানি তুই ওঁর সঙ্গে নিয়মিত যোগযোগ রাখিস। আমারও কাছে সব খবর আছে।
মঙ্গলবার নজরুল মঞ্চের ওই ঘটনা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে সব্যসাচী বলেন, "এমন কোনও ঘটনাই ঘটেনি, তো কীসের প্রতিক্রিয়া? ঘটনা ঘটলে তো প্রতিক্রিয়া হবে!" তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, আপনাদের কে বলল? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন? কোনও ডকুমেন্টেশন রয়েছে?
ভোটের আগে থেকেই সব্যসাচী যেন তৃণমূলের গলায় কাঁটা হয়ে উঠেছেন। এর মধ্যে একাধিক মন্তব্য করেছেন॥ যা দলের পক্ষে একেবারেই স্বস্তিদায়ক নয়। কদিন আগে তো হুঙ্কার ছেড়ে বলেছিলেন, "যদি পারে দল আমাকে তাড়াক!" তৃণমূলের একটি সূত্রের মতে, এ কথা শুনে দিদিও চটে গিয়েছিলেন। গতকালও মমতা বলেছেন, যাঁরা যাওয়ার, তাড়াতাড়ি যান।
প্রশ্ন হল, সব্যসাচীর উপর যদি এতোটাই আস্থা হারিয়ে থাকে তৃণমূল নেতৃত্ব তা হলে কেন অনাস্থা আনা হচ্ছে না? কেন বিধাননগরের মেয়র পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না সব্যসাচীকে?
তৃণমূলের শীর্ষ সূত্রের দাবি, দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে এ নিয়ে টানাপোড়েন আছে। কেউ কেউ এমনও আশঙ্কা করেছেন, অনাস্থা আনতে গিয়ে যদি ভাটপাড়ার মতো দশা হয়। কয়েকদিন আগেও পুরবোর্ডের বৈঠকে যাননি সব্যসাচী। যাননি ২৫ জন কাউন্সিলর। চেয়ারপার্সন কৃষ্ণা চক্রবর্তী ১৬ জন কাউন্সিলর নিয়ে বৈঠক করেন। অনেকেরই আশঙ্কা, অনাস্থা আনলে তা যদি পাশ না হয়, তাহলে আরও মুখ পুড়বে শাসক দলের। তাই সব্যসাচীকে সরানো নিয়ে তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের মধ্যেও দোদুল্যমানতা রয়েছে। ফিরহাদ ঠেলছেন বালুর দিকে, বালু দেখাচ্ছেন দোলাকে, এই চলছে।
অনেকের মতে, গত কয়েকমাস ধরে এই চাপানউতোর চললেও, দিদির মুখোমুখি পড়তে হয়নি সব্যসাচীকে। মাঝে লোকসভার প্রচারে নিউটাউনের সভায় মমতার সঙ্গে দেখা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এত কথা হয়নি। আর ভোট প্রচারের মঞ্চে, এ সব বলাও যায় না। তাই কাল সামনে পেয়েই ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন দিদি।
পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, যা রাগ ছিল দিদির, তা ঝেড়ে কেশে দিয়েছেন। আর কোনও ঢাকাচাপা নেই। সবটাই খোলামেলা। এখন দেখার কী করেন সব্যসাচী। কী হয় বিধাননগরের ভবিষ্যৎ।