দ্য ওয়াল ব্যুরো: এ যেন শত সাজসরঞ্জাম নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে নেমে, ডাহা পরাজয়। গত ১২ ঘণ্টার বৃষ্টি আর তার জেরে শহর কলকাতার যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তাতে তেমনটাই মনে করছেন শহরবাসী। শহরের যে সমস্ত এলাকা জলপ্রবণ, যেমন দক্ষিণের বেহালা বা উত্তরের কলেজ স্ট্রিট-- সে সব এলাকা তো জলের তলায় বটেই, এমনকি যেসব জায়গায় তত জল জমে না সাধারণত, সে সব এলাকাও ভাসিয়ে দিয়েছে একরাতের বৃষ্টি। বাইপাস সংলগ্ন এলাকাও বাকি নেই।
লকডাউনের কারণে রাস্তায় যানবাহন, পথচারী দুই-ই যৎসামান্য। ফলে ব্যস্ত জীবন বিঘ্নিত হয়নি তেমন। তারই মধ্যে জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মী, অফিসারদের কর্মস্থলে যেতে সমস্যা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অফিসে কোভিড বিধি মেনে যে কর্মচারীরা যাচ্ছেন, সমস্যায় পড়তে হয় তাদেরও। তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন শহরের বেশ কিছু এলাকার বাসিন্দা। দুয়ারে হাঁটু জল জমে যাওয়ায় অনেককে সাময়িকভাবে রান্না খাওয়া চৌকিতে সারতে হয়।

গত মাসের শেষের দিকে বিধ্বংসী সাইক্লোন ইয়াস আসার আগে থেকেই শহরের পুরব্যবস্থা নিয়ে বিশেষ সতর্ক ছিল প্রশাসন। জল যাতে না জমে, তা নিয়ে একাধিক বৈঠক, পদক্ষেপ করেছিল পুরসভা। শুধু জল নয়, বিদ্যুৎবিভ্রাট এড়াতেও সিইএসসি এবং পুরসভা যৌথ উদ্যোগে একাধিক পদক্ষেপ করেছিল। গাছের ডাল কাটা হয়েছিল বহু এলাকায়, যাতে তা ভেঙে বিদ্যুতের তার না নষ্ট হয়। ঘটনাচক্রে ইয়াসের তেমন প্রভাব শহর কলকাতায় পড়েনি। সাইক্লোনের পরের দিন ভারী বৃষ্টি হয়েছিল বটে, তাতেও বিশেষ বিপর্যয় ঘনায়নি।
অথচ শহরের পরিস্থিতি বিপর্যস্ত হল বর্ষার শুরুতেই। আজ ন'দিন হল রাজ্যে পা রেখেছে বর্ষা। জোড়া নিম্নচাপের ফলায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আগে থেকেই ছিল। দফায় দফায় একাধিক বার সতর্কও করেছে পুরসভা। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ভেসে গেল শহর। একরাতের ভারী বৃষ্টিতে জলের তলায় চলে গিয়েছে কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ। বেহালা, পার্ক সার্কাস, কলেজ স্ট্রিটে জল থইথই। কোথাও হাঁটুজল আবার কোথাও গোড়ালি ভেজা জলে ডুবেছে রাস্তা।
কলকাতা পুরসভা সূত্রের খবর, প্রস্তুতিতে খামতি ছিল না। কিন্তু এখন জোয়ারের জন্য গঙ্গার সব লকগেট বন্ধ। তাই জল নামতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে। সেক্ষেত্রে আরও বৃষ্টি হলে পরিস্থিতির যে অবনতি হবে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এবং হাওয়া অফিস সেই আশঙ্কার কথাই শুনিয়েছে। বৃষ্টি আরও হবে।

ইতিমধ্যেই শহরে জল জমা রুখতে সদর দফতরের কন্ট্রোল রুমের পাশাপাশি ১৬টি বরো অফিসে কন্ট্রোল রুমও খুলেছে পুরসভা। প্রতিটি বরোর কন্ট্রোল রুমে রয়েছেন এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারেরা। আসন্ন দুর্যোগের কারণে বহু পুরকর্মীর ছুটিও বাতিল করেছে পুরসভা।
শুধু তাই নয়, গত সপ্তাহে এক দুপুরে গঙ্গার জলস্তর দেখতে বাবুঘাটেও যান কলকাতা পুরসভার প্রশাসকমণ্ডলীর চেয়ারম্যান ফিরহাদ হাকিম নিজে। তিনি জানিয়েছিলেন, শহরে জল জমা রুখতে পর্যাপ্ত পাম্পের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যে সমস্ত এলাকায় জল জমে, সেখানে বাড়তি নজরদারি এবং নিকাশি পাম্পিং স্টেশনগুলিতে বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

এখানেই শেষ নয়, জল জমা রুখতে পুরসভার প্রতিটি বিভাগকে সতর্ক থাকতে বলে একটি বিজ্ঞপ্তিও জারি করেছিলেন পুর কমিশনার বিনোদ কুমার। পাশাপশি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা রুখতে প্রতিটি বরোয় পুরসভার দল মোতায়েন করা হয়। থাকতে বলা হয় সিইএসসি-র কর্মীদেরও।
তবে কার্যক্ষেত্রে এই সমস্ত প্রস্তুতিই ডাহা ফেল করেছে দৃশ্যতই। এখনই কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জলমগ্ন। আজ আষাঢ় মাসের তিন তারিখ সবে, রাজ্যে বর্ষা ঢোকার ৯ দিন। আরও অন্তত মাস তিনেক বর্ষার দাপট থাকবে নরমে-গরমে। পরিস্থিতি কি বদলাবে না!

পুরসভার কর্মীদের মতে, লকগেট বন্ধ অবস্থায় এই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত। জোয়ারের পরে পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হতে পারে। তবে আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস সত্যি করে নতুন করে আরও বৃষ্টি হলে, জমা জলের পরিমাণও আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা। পুরসভা সূত্রে দাবি, আজ ভোর ৫:৫৯ মিনিট থেকে গঙ্গাল জলস্তর ছিল প্রায় ৪.২৯ মিটার। ফলে চারটে থেকে আটটা অবধি লকগেট বন্ধ রাখতে হয়।
কলকাতা পুরসভার বোর্ড অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সদস্য তারক সিংয়ের কথায়, "লকগেট বন্ধ থাকার কারণেই এই অবস্থা। ভরা কোটাল চলছে এখন, সঙ্গে টানা বৃষ্টি। তাই লকগেট চাইলেও খোলা যাবে না। খুললে উল্টো বিপর্যয় হবে। যদিও ইতিমধ্যেই আমরা পরীক্ষামূলক ভাবে কয়েক দফায় গেট খুলেছি ও বন্ধ করেছি। এই গেট খোলার মতো পরিস্থিতি হলেই জমাজল মুক্ত হবে শহর। তবে বেশ কিছু এলাকায় পাম্প চালিয়ে জল বের করা হচ্ছে পুরসভার তরফে। গাফিলতি রাখা হয়নি কোনও। কিন্তু কোটালের কারণে পরিস্থিতি সঙ্গীন। প্রকৃতির ওপরে কারও হাত নেই।"

হাওয়া অফিসের পূর্বাভাস বলছে, এখনই বৃষ্টি কমার সম্ভাবনা নেই। উল্টে আগামী ২৪ ঘণ্টায় কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গে আরও বেগ বাড়াবে বৃষ্টি। কলকাতা-সহ হাওড়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বাঁকুড়ায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ লাগাতার বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে খুব একটা স্বস্তির আলো দেখতে পাচ্ছে না শহর কলকাতা।