অমল সরকার
তিনি মনে করেন, দলের নেতা হওয়া সহজ, জনগণের নেতা হওয়া কঠিন। তিনি আরও মনে করেন, জনগণের নেতা জ্যোতি বসুকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে না দেওয়া ছিল দলের ভুল। মনে করেন, সিঙ্গুর পর্বে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জেদের মুখে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর উচিত ছিল পদত্যাগ করে নতুন করে জনতার রায় নেওয়া। তিনি কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়।
প্রবীণ এই কমিউনিস্ট নেতা তথা সিপিএমের রাজ্য কমিটির এই সদস্য নিজের এই সব উপলব্ধির কথা লিখেছেন। লিখেছেন, রাজ্যে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের শেষের কয়েক বছরে দল ও সরকারের অবক্ষয়ের কথা। বই আকারে যা প্রকাশিত হবে আগামী ৮ জুলাই। ওই দিন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর জন্মদিন। বইয়ের নাম, 'রক্ত পলাশের আকাঙ্ক্ষায়'। বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন দুই চিত্র পরিচালক তরুণ মজুমদার ও কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। প্রায় তিনশো পাতার বইয়ে আশি ছুঁই-ছুঁই রাজ্যের এই প্রাক্তন মন্ত্রী তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সফরকেই মূলত বর্ণনা করেছেন। ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ এসেছে রাজনীতির নানা ঘটনাবলির বর্ণনায় যেটুকু প্রয়োজন সেটুকুই। তাঁর কথায়, ‘এটা গল্প-উপন্যাস-জীবনী কোনওটাই নয়। চারপাশের মানুষের কাহিনি। যা দেখেছি, লিখেছি। নিজের উপলব্ধি।’
ভূমিকায় তরুণ মজুমদার লিখেছেন, 'ইংরেজিতে একটা কথা আছে, যার মানে হল, মাঝেমাঝে বাস্তবে এমন কিছু ঘটে যা গল্প-উপন্যাস বা মনগড়া কল্পনাকেও হার মানিয়ে ছাড়ে। এই সংকলনের লেখাগুলি পড়তে পড়তে আমার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া অনেকটা সেই রকম। এর ছত্রে ছত্রে এমন ঘটনার সমাবেশ প্রচুর। আজ গোধূলি আলোয় বসে আত্মবিশ্লেষণ করতে করতে যদি কখনও মনে হয়, যে আরও অনেক কিছু করাটা জরুরি ছিল; কিন্তু নানা-কারণে হয়ে উঠল না, তার জন্য দায়ী করেন নিজেকে, নয়তো ক্ষণিকের অভিমানে বিদ্ধ করেন প্রাণপ্রিয় সংগঠনকে, সেটা কি খুব দোষের? এ সব তো জীবন্ত মানুষের লক্ষণ। ফসিলরা কি কখনও আত্মসমীক্ষা করে?'
কমলেশ্বর লিখেছেন, 'রক্তপলাশের আকাঙ্ক্ষায় কান্তিবাবুর আত্মকথনের নির্যাসে ভেজা তেমন এক সাহিত্য কর্ম যা যুগান্তরের মুক্তমনা মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দপ করে জ্বলে ওঠার প্রেরণা জোগাবে। সাচ্চা কমিউনিস্ট হতে গেলে আগে একজন সহমর্মী মানবতাবাদী হতে হয় বা মেহেনতি মানুষের জীবনের সঙ্গে সেতুবন্ধনে ব্রতী হতে হয় তাঁকে। কান্তিবাবুর জীবনের সেই দর্শন আর অভিজ্ঞতাই আত্মমগ্নতা ব্যতিরেকে দেশ ও দশের জন্যে উঠে এসেছে বইয়ের পাতায়। লড়াকু মানুষের হাতে এ এক অনিবার্য অস্ত্র - অনন্য সম্পদ।'
সদ্য অনুষ্ঠিত বিধানসভা ভোটে সিপিএম-সহ বাম শিবির একটি আসনও পায়নি। শূন্যহাত তাদের জোটসঙ্গী কংগ্রেসও। স্বাধীনতার পর আর কখনও এমন দশা হয়নি এই দুই শিবিরের। প্রাপ্ত ভোটও তলানিতে ঠেকেছে। এই পরিস্থিতিতে ভিতরে-বাইরে সমালোচনার মুখে পড়েছে দল। কান্তি গঙ্গোপাধ্যায় নিজেও হেরেছেন রায়দিঘিতে। ২০১১-র পরিবর্তনের ভোটে সিপিএম জনবিচ্ছিন্নতাকে সরকারিভাবেই বিপর্যয়ের কারণ হিসাবে তুলে ধরেছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের দশ বছরেও সিপিএমের ঘুরে দাঁড়াতে ব্যর্থতা এবং বিজেপির উত্থান নিয়ে বাম শিবিরে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে তরুণ মজুমদারের ভাষায় কান্তির ‘ক্ষণিকের অভিমানে বিদ্ধ করেন প্রাণপ্রিয় সংগঠনকে, সেটা কি খুব দোষের? এ সব তো জীবন্ত মানুষের লক্ষণ। ফসিলরা কি কখনও আত্মসমীক্ষা করে?’—বক্তব্য পার্টি কতটা গ্রহণ করবে সেটাই দেখার।
প্রকাশিতব্য বইটিতে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নানা ঝড়ঝঞ্ঝার উল্লেখ করলেও কান্তি গঙ্গোপাধ্যায় অপারেশন সানশাইন প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছেন। ১৯৯৬-এ কলকাতা জুড়ে হকার উচ্ছেদ অভিযানে মুখ পুড়েছিল দল ও সরকারের। সেই অভিযানে সামনের সারিতে ছিলেন প্রয়াত মন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী, কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়, নেপালদেব ভট্টাচার্য। তাঁদের উপর দোষ চাপিয়ে দল ও সরকারের ভূমিকাকে আড়াল করার চেষ্টা হয়েছিল তখন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সব ফাঁস হয়ে যায়। বহুচর্চিত ও বিতর্কিত সেই ঘটনার প্রসঙ্গ কেন নেই ‘রক্ত পলাশের আকাঙ্ক্ষায়’, সদুত্তর মেলেনি লেখকের থেকে। বইয়ে নানা ঘটনাকে সময়ানুক্রমে সাজিয়েছেন প্রবীণ এই নেতা। সুন্দরবনের বনেবাদাড়ে এবং প্রতিবন্ধী সম্মিলনী নামে বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের হয়ে কাজ করা নিজের হাতে তৈরি সংগঠন নিয়েই বহু বছর মেতে আছেন তিনি। ব্যস্ততার ফাঁকে লিখেছেন।
কখনও অসিত সেন, কখনও সমীর মুখার্জি
গত শতকের সত্তরের দশকে বাম-রাজনীতি করা ছিল কঠিন এক সংগ্রাম। এলাকাছাড়া হতে হয়েছিল বহু মানুষকে। বিশেষ করে তরুণ ও মাঝবয়সিদের। বাদ যেতেন না মহিলারাও। উদ্বাস্তু পরিবারের সন্তান কান্তি গঙ্গোপাধ্যায় যাদবপুরের অলিতে-গলিতে, মহল্লায় পার্টির কাজ করে কংগ্রেস ও নকশালদের চক্ষুশূল হয়েছিলেন। যাদবপুরের বাইরে গেলেই নাম-পরিচয় আড়াল করতে হত। সেই সময় গোড়ায় নাম নিয়েছিলের অসিত সেন। পরে পার্টির নির্দেশে বহু বছরের জন্য কাজ করতে গিয়েছিলেন জঙ্গলমহলে। সেখানেও নাম-পরিচয় গোপন রেখেই দিন কাটাতে হত। তখন নাম ছিল সমীর মুখার্জি। আদিবাসীদের সঙ্গে মিশে যেতে দ্রুত শিখে ফেলেন সাঁওতালি ভাষা। বৃহস্পতিবার কান্তি বলেন, ওই ভাষায় এখনও কথা বলতে পারি, ভুলিনি।
গঙ্গাধর ভট্টাচার্য মার্ডার
আটের দশকের শুরুতে নির্মীয়মাণ ইএম বাইপাসের ধারে এক গোলমালের ঘটনায় খুন হন তিলজলার ওসি গঙ্গাধর ভট্টাচার্য। সেই ঘটনায় নাম জড়ায় সিপিএমের তৎকালীন তরুণতুর্কি নেতা কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের। বিরোধীরা ওসি খুনে তাঁর দিকে আঙুল তোলে। যদিও পুলিশি তদন্তে তার প্রমাণ মেলেনি। কিন্তু রাজনৈতিক আক্রমণ চলতেই থাকে। বইয়ে সেই প্রসঙ্গে কান্তি গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, 'আমার ওই বদনাম সইতে পারেননি স্ত্রী। সেই থেকে তিনি অসুস্থ হন। কিন্তু আমি যে নিরপরাধ তা বুঝেছিলেন গঙ্গাধরবাবুর স্ত্রী। তিনি আমার স্ত্রী-র সঙ্গে দেখা করে এজন্য দুঃখ প্রকাশ করে গিয়েছিলেন। কিন্তু স্ত্রীর অসুস্থতা দূর হয়নি। তিনি প্রয়াত হন ২০০৫-এ।'
এদিন কান্তিবাবু কথায় কথায় জানান, 'শেষ চেষ্টা হিসাবে স্ত্রীকে দিল্লির গঙ্গারাম হাসপাতালে নিয়ে গিয়েও বাঁচাতে পারিনি। দিল্লি নিয়ে যেতে হয়েছিল এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে। আমি তখন মন্ত্রী। খরচ বাবদ ১১ লাখ টাকা সরকার দিয়েছিল। পুরো টাকা সরকারকে ফেরত দিয়ে দিয়েছি।'
মরিচঝাঁপির মিথ্যাচার
অধুনা ছত্তীসগড়ের দণ্ডকারণ্য এলাকা থেকে বাংলায় চলে আসা বাঙালি উদ্বাস্তুরা সুন্দরবনের মরিচঝাঁপি অভিযান করেছিলেন। সেখানেই থেকে যাবেন, ফিরে যাবেন না, জেদ ধরেছিলেন। তাদের হঠাতে পুলিশ পাঠায় তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। সেটা ১৯৭৮-এর ঘটনা। পুলিশ ও সিপিএমের ক্যাডারদের গুলি, বোমায় বহু মানুষ নিহত হন। মৃতদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পর ওই ঘটনা নিয়ে বিচার-বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেন। কান্তি গঙ্গোপাধ্যায় সেই ঘটনার প্রসঙ্গে লিখেছেন, মরিচঝাঁপিতে একজনও তখন মারা যাননি। কুমিরমারিতে দু’জন মারা যান। নিজেদের মধ্যে বিবাদের জেরে।
জ্যোতিবাবু প্রধানমন্ত্রী হলে…
১৯৯৬-এর লোকসভা ভোটে কোনও দলই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ক্ষমতাচ্যুত কংগ্রেস জানিয়ে দেয় তারা সরকার গড়বে না। একক বৃহত্তম দল বিজেপি সরকার গড়ে। প্রধানমন্ত্রী হন অটল বিহারী বাজপেয়ি। কিন্তু ১৩ দিনের মাথায় তাঁর সরকারের পতন ঘটে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে না পারায়। সনিয়া গান্ধী জানিয়ে দেন, একমাত্র জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী করে তৃতীয় ফ্রন্ট সরকার গড়লে কংগ্রেস সমর্থন জোগাবে। রাজি হয় তৃতীয় ফ্রন্টের সব দল।
কিন্তু বেঁকে বসে জ্যোতিবাবুর পার্টিই। দলের পলিটব্যুরো ও কেন্দ্রীয় কমিটির সিংহভাহ তাতে আপত্তি জানায়। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বিপ্লব দাশগুপ্ত, সুভাষ চক্রবর্তী, শ্যামল চক্রবর্তী, কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়রা দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ছিলেন। পার্টির মিটিংয়ে যোগ দিতে গিয়ে জ্যোতিবাবু উঠেছিলেন দিল্লির বঙ্গভবনে। কান্তিবাবুরা একদল সেখানে চলে যান তাঁর প্রতি সমর্থন জানাতে। বইয়ে কান্তি গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, আমাদের দেখে জ্যোতিবাবু বললেন, 'তোমরা কেন এসেছো আমি জানি। কিন্তু বাংলার পলিটব্যুরো, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যরাও তো আপত্তি তুলল। কী করা যাবে।' প্রসঙ্গত, স্বয়ং জ্যোতিবাবু পার্টির সিদ্ধান্তকে পরে প্রকাশ্যে ঐতিহাসিক ভুল বলেছিলেন।
সিঙ্গুরের ভুল
বামফ্রন্ট সরকারের পতনের কারণ হিসাবে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে জমি নেওয়ার পদ্ধতি, জবরদস্তি প্রতিবাদ দমন ইত্যাদি অন্যতম বলে মনে করা হয়। তখন নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলিতে ১৪ জন আন্দোলনকারী গ্রামবাসীর মৃত্যু হয়েছিল। শুধু তাই-ই নয়, পরে গোটা এলাকাকে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির কবলমুক্ত করতে হামলা-অভিযান চালায় সিপিএমও। সেই অভিযানে বড় ভূমিকা নিয়েছিল কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের জেলা দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা সিপিএম। কিন্তু প্রকাশিতব্য বইয়ে নন্দীগ্রামের প্রসঙ্গে আনেননি। লিখেছেন সিঙ্গুর নিয়ে।
অনিচ্ছুক কৃষকদের জমি ফেরানোর দাবিতে অনশন-অবস্থানরত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আন্দোলনের পথ থেকে সরিয়ে এনে সিঙ্গুরের জমি বিবাদের মীমাংসা করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন তৎকালীন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধী। ২০০৮-এর ৮ সেপ্টেম্বর সবপক্ষকে নিয়ে রাজভবনে কথা বলেছিলেন তিনি। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যপালের মীমাংসা সূত্রকে কৃষক স্বার্থের পরিপন্থী বলে খারিজ করে দেন।
কান্তি গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, 'বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর সেদিন উচিত ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে অনুরোধ করা, যাতে রাজ্যের বেকার যুবকদের স্বার্থে তিনি কারখানাটা করতে দেন।' কান্তির বক্তব্য, ধরেই নেওয়া যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাতেও রাজি হতেন না। তখন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর উচিত ছিল, পদত্যাগ করে মানুষের রায় নেওয়া। তাহলেই স্পষ্ট হয়ে যেত মানুষ শিল্প চায় কি চায় না। শিল্প নিয়ে রাজনীতিতে তখনই ইতি টেনে দেওয়া যেত।
পঞ্চায়েতের মধুভাণ্ড
বামফ্রন্ট সরকারের শেষের কয়েক বছরে প্রশাসন ও পার্টির ভূমিকাকে নির্মমভাবে কাটাছেঁড়া করেছেন বইয়ে। পঞ্চায়েত ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল মানুষের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে। সেই ব্যবস্থা পার্টির একাংশের মাতব্বরির হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল, পঞ্চায়েতের মধুভাণ্ড নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু হয়েছিল। পঞ্চায়েত ভোটে টিকিট পাইয়ে দিয়ে নেতাদের টাকা উপার্জনের মতো অস্বস্তিকর ঘটনাও লিখেছেন তিনি।