
শেষ আপডেট: 14 August 2023 13:24
নয়ের দশকে প্রায় প্রতিটি বাণিজ্যিক ছবিতে তিনি ছিলেন জনপ্রিয় মুখ। ছবিতে তাঁর উপস্থিতি মানেই দর্শকের হাসি। তিনি হলেন সবার প্রিয় অভিনেতা ও কমেডিয়ান জনি লিভার (Johnny Lever)। আজ তাঁর জন্মদিন।
জনি লিভার মানেই ফেলে আসা সোনালি অতীত। নাইন্টিজের যে কোনও কমার্শিয়াল ছবি জনি লিভারের উপস্থিতি ছাড়া যেন সম্পূর্ণ হত না। ছবিতে বিভিন্ন নায়ক-নায়িকা আনা হলেও জনি লিভার সব ছবিতে থাকবেনই। কিন্তু গত দু'দশকে চিত্রটা একেবারেই বদলে গেছে। পর্দা থেকে প্রায় উবেই গেছে জনি লিভারের উপস্থিতি। বহু হিট ছবি যাঁকে ছাড়া সম্পূর্ণ হত না, সেই মানুষটাকে আর প্রয়োজন পড়ছে না বলিউডের। দর্শকের কাছে আজও এই কৌতুকাভিনেতার কমেডির বিপুল চাহিদা থাকলেও জনি লিভার দীর্ঘদিন আর কাজের অফার পান না।

১৯৫৭ সালের ১৪ অগস্ট তেলুগু খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম জনির। মুম্বইয়েই বড় হয়ে ওঠা তাঁর। জনির বাবা একটি কারখানায় শ্রমিকের কাজ করতেন। বাবার স্বল্প আয়ে চলত জনিদের সংসার। একেবারেই গরিব পরিবারের ছেলে ছিলেন তিনি। জনির বাবার রোজগার কম হলেও তিনি ভীষণ মদ্যপান করতেন। ফলে জনির স্কুলে পড়াশোনার খরচ তিনি মেটাতেন না। স্কুলে পড়াকালীন সহপাঠীদের ও শিক্ষকদের নকল করে জনি সবাইকে হাসাতেন। কিন্তু স্কুলের ফি দিতে না পারায় মাত্র সপ্তম শ্রেণি অবধি পড়ার পরে জনিকে পড়াশোনায় ইতি টানতে হয়।

হকারি করে কাজের সন্ধানে নেমে পড়তে হয় মাত্র ১৪ বছর বয়সে। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে প্যান্ট বিক্রি করে প্রথম রোজগার শুরু করেছিলেন জনি। দিনের শেষে ২০-২৫ টাকা উপার্জন করতেন। এক দিন বাড়ি ফেরার পথে একটি হলে ঢোকেন জনি। সেখানে তখন দীনেশ হিঙ্গু নামের এক নামী কৌতুকাভিনেতা তারকাদের গলা নকল করে মঞ্চ মাতিয়ে রেখেছিলেন।
দীনেশকে পারফর্ম করতে দেখেই জনি তাঁর জীবনে নতুন দিশা পান। আগের মতোই রাস্তায় প্যান্ট বিক্রি করতে শুরু করেন তিনি। কিন্তু এবার বলিপাড়ার তারকাদের গলা নকল করে প্যান্ট বিক্রি করতে দেখা যায় তাঁকে। এর ফলে রোজগারও বৃদ্ধি পায় জনির। দিনের শেষে ২৫০ টাকা পর্যন্ত আয় করতেন তিনি।

হকারি ছেড়ে এর পর বাবার কাজের সুপারিশে হিন্দুস্থান ইউনিলিভারে চাকরি পান জনি। তাঁর আসল নাম জন প্রকাশ রাও জানুমালা। তাঁর নাম জনি লিভার হয়ে গেছিল কর্মসূত্রে। ফিল্মস্টার হয়ে যাবেন এমন কোনও আশাই তাঁর মধ্যে ছিল না। তাই তিনি চাকরি জীবনই বেছে নিয়েছিলেন। এদিকে পাশাপাশি নিয়মিত কমেডি স্টেজ শো করতেন। সকলকে আনন্দ দিতেন খুব। কোম্পানির শীর্ষ পদে থাকা ব্যক্তিরা খুবই মজা পেতেন তাঁর কমেডি দেখে। এর পরেই জনের নাম পাল্টে হয়ে যায় জনি। হিন্দুস্থান ইউনিলিভারে পারফর্ম করতেন বলে তার সহকর্মীরাই তাঁর নতুন করে নাম রাখেন। জনি লিভার (Johnny Lever)। এই নামই পরে হয়ে গেল জগত বিখ্যাত।

বিভিন্ন কমেডি শো, নানা জলসা করার সুবাদে বিখ্যাত সুরকার কল্যাণজি-আনন্দজির সঙ্গে আলাপ হয় জনির। তাঁদের হাত ধরেই জনির প্রথম কৌতুকাভিনয়ের ক্যাসেট বাজারে রিলিজ করে।
১৯৮০ সালে কল্যাণজির দফতরে দক্ষিণী পরিচালক কে বিজয়ন দেখা করতে আসেন। ‘ইয়ে রিস্তা না টুটে’ ছবির শ্যুটিং নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। কল্যাণজি বিজয়নকে কৌতুকাভিনেতা হিসেবে জনির নাম সুপারিশ করেন। কল্যাণজির সৌজন্যেই প্রথম ফিল্মে অভিনয়ের সুযোগ পান জনি। চলে যান মাদ্রাজ। মাদ্রাজ গিয়ে ‘ইয়ে রিস্তা না টুটে’ ছবির শুটিং করে আসেন জনি। এই ছবিতে রাজ বব্বর, রাজেন্দ্র কুমার, বিনোদ মেহরার সঙ্গে অভিনয় করেন জনি। ছবিটি ১৯৮১ সালে মুক্তি পায়। এরপর আর তাঁকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

তবে জনির প্রথম বিশাল জনপ্রিয়তা এল শাহরুখ-কাজলের 'বাজিগর' ছবিতে কাজ করে। এরপর জনি লিভার সমস্ত বড় বাজেটের ছবিতে জনপ্রিয় কমেডি মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁকে ভেবেই বহু ছবির স্ক্রিপ্ট লেখা হত। ছবির বক্সঅফিসে হিটের নিরিখ নির্ভর করত জনি লিভার কোন কোন ছবিতে থাকছে তার উপর। শাহরুখ খানের কেরিয়ারের শুরু থেকেই তাঁর সব ছবিতেই থাকতেন জনি লিভার। সলমন খান, আমির খান, অক্ষয়কুমার, হৃত্বিক রোশনদের ছবিতেও জনি ছিলেন মধ্যমণি।

জনি লিভার অভিনীত ছবি গুলি হল লাভ ৮৬, জাদুগর, কালা বাজার, আখরি আদালত, খিলাড়ি, চমৎকার, রূপ কি রানি চোর কি রাজা, আনজাম, কর্ণ অর্জুন, রাজা হিন্দুস্তানি, জুদাই, ইয়েস বস, ইশক, কুছ কুছ হোতা হ্যায়, মর্দ, দুলহে রাজা, বারুদ, সির্ফ তুম, মেলা, বাদল, কহো না পেয়ার হ্যায়, ফিজা, জরু কা গুলাম, চোরি চোরি চুপকে চুপকে, লজ্জা, অশোকা, কভি খুশি কভি গম, হামরাজ, কোয়ি মিল গ্যয়া ইত্যাদি।
বাংলা ছবি 'সিঁদুরখেলা'তেও অভিনয় করেছিলেন জনি লিভার। প্রসেনজিৎ, ঋতুপর্ণা, রঞ্জিত মল্লিক ও সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে বাংলা সংলাপে অভিনয় করেছিলেন জনি।
১৯৮৪ সালে সুজাতা লিভারকে বিয়ে করেছিলেন জনি। পুত্রসন্তান জেসি এবং কন্যাসন্তান জেমিকে নিয়ে সুখের সংসার ছিল। ২০০০ সালের পর জনির ছেলে জেসির ক্যানসার ধরা পড়ে। এমনই ক্যানসার ছিল, যা অপারেশন করলে ছেলে সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যেতে পারে। ভীষণ হতাশায় ডুবে যান জনি। অভিনয় জগতকে বিদায় জানিয়ে ছেলের চিকিৎসায় জনি পুরোপুরি মনোযোগ দেন। কিন্তু কোনও সঠিক চিকিৎসক পাচ্ছিলেন না তিনি। হতাশা থেকেই মদের নেশায় ডুবে যেতে থাকেন, নানা চার্চে তিনি ঘুরে বেড়াতেন একটু শান্তির দিশা পেতে। এমনই একদিন চার্চের পাদ্রি জনিকে বলেন নিউ ইয়র্কে নিয়ে গিয়ে তাঁর চেনা ডাক্তারের কাছে ছেলের চিকিৎসা করাতে।

২০০২ সালে নিউ ইয়র্কের হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করানো হয় জেসির। সুস্থ হয়ে ওঠেন জনির পুত্র। এই ঘটনার পর ধর্মে আসক্তি বেড়ে যায় জনির। সারাদিন বাইবেল পাঠ করে সময় কাটাতেন তিনি। কয়েক বছর এ ভাবে থাকার পরে আবার অভিনয়ে ফিরে আসার চেষ্টা করেন জনি।
তবে জনি কামব্যাক করলেও সেটা আর দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। একবার ছেড়ে দেওয়া জায়গা আর ফিরে পাননি তিনি। যাঁর বছরে তিরিশের বেশি ছবি রিলিজ করত, তাঁর ছবির সংখ্যা বছরে দাঁড়ায় মাত্র তিন।

ছবির সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে জনি বলেছেন, 'হিরোরা নিজেরাই কমেডি রোল করতে চায় আজকাল। ছবিতে আমার কমেডি সংলাপের উপস্থিতি তাঁদের হীনমন্যতা বাড়িয়ে দিচ্ছিল। বহু হিরোর সুপারিশে আমার রোল ছোট করে দেওয়া হত। আমার কমেডি সংলাপ কমিয়ে হিরোর মুখে বসিয়ে দেওয়া হত। ছবিতে আমার উপস্থিতি হিরোদের বাজার নাকি কমিয়ে দিচ্ছিল। তাই তাঁরা আমার রোল ছাঁটতে শুরু করে দিল। পরিচালক-প্রযোজকরাও হিরোদের কথাতেই চলতে লাগল। ফলে আমার রোল ছোট থেকে একেবারে শূন্য হয়ে গেল। এখনকার বলিউড ছবিতে কমেডিয়ানদের তাই আর কোনও প্রয়োজন নেই। কমেডি সিন হিরোর সংলাপেই রেখে দেওয়া হয়। বলিউড আমাকে ভুলেই গেল।'

জনি লিভার তাই আজ পর্দায় আর আসেন না। তাঁর ছেলেমেয়েরাও বিনোদন জগতে এসেছেন। জনির সঙ্গে তাঁরা দু-একটি ছবিও করেছেন। কিন্তু জনি লিভারের মতো দাপুটে অভিনেতার হাতে আজ আর কাজ নেই। তিনি আজকাল পরিবারের সঙ্গেই সময় কাটান এবং মাঝেমধ্যে বিদেশে যান কমেডি শো করতে।
পরাগের মতো শিক্ষক কি বাস্তবেও হয়! দিবারাত্র স্ত্রীকে অসম্মান করে বন্ধঘরে বুঝে নেয় শারীরিক হিসেব